কোনো জঙ্গি সংগঠনকে শিকড় গাড়ার সুযোগ দেওয়া যাবে না
- আপলোড সময় : ১৬-০৮-২০২৬ ০৯:৪০:০৭ পূর্বাহ্ন
- আপডেট সময় : ১৬-০৮-২০২৬ ০৯:৪০:০৭ পূর্বাহ্ন
বাংলাদেশে আল-কায়েদা ইন দ্য ইন্ডিয়ান সাবকন্টিনেন্ট - একিউআইএসের সক্রিয় সেল বা নেটওয়ার্ক প্রতিষ্ঠার চেষ্টার বিষয়ে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের উদ্বেগ নিঃসন্দেহে গভীরভাবে ভাবার মতো বিষয়। জাতিসংঘের ইসলামিক স্টেট ও আল-কায়েদাসংক্রান্ত অ্যানালিটিক্যাল সাপোর্ট অ্যান্ড স্যাংশনস মনিটরিং টিমের ৩৮তম প্রতিবেদনে উঠে আসা এই তথ্যকে কেবল আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা প্রতিবেদনের একটি সাধারণ পর্যবেক্ষণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা, সামাজিক স্থিতিশীলতা এবং তরুণ প্রজন্মের ভবিষ্যতের জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা।
আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠনগুলোর কৌশল গত কয়েক বছরে অনেকটাই বদলে গেছে। একসময় বড় আকারের সাংগঠনিক কাঠামো গড়ে তুলে কর্মকা- পরিচালনার প্রবণতা থাকলেও এখন ছোট, বিচ্ছিন্ন ও বিকেন্দ্রীভূত সেলের মাধ্যমে কার্যক্রম চালানোর প্রবণতা বেড়েছে। এসব সেলের মাধ্যমে সদস্য সংগ্রহ, মতাদর্শিক প্রচার, অর্থ ও রসদ সংগ্রহ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী হামলার প্রস্তুতি নেওয়া তুলনামূলক সহজ। ফলে কোনো দেশে বড় ধরনের জঙ্গি সংগঠনের দৃশ্যমান উপস্থিতি না থাকলেও গোপনে তাদের নেটওয়ার্ক বিস্তারের আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে অতীত অভিজ্ঞতাও আমাদের সতর্ক করে। এ দেশে জঙ্গিবাদ নির্মূলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। বিভিন্ন জঙ্গি সংগঠনের বিরুদ্ধে অভিযান চালানো হয়েছে, অনেক নেটওয়ার্ক ভেঙে দেওয়া হয়েছে এবং বহু সদস্যকে আইনের আওতায় আনা হয়েছে। কিন্তু জঙ্গিবাদ কেবল আইনশৃঙ্খলার সমস্যা নয়; এটি একটি মতাদর্শিক ও সামাজিক সমস্যা। তাই একটি সংগঠনের দৃশ্যমান কাঠামো ভেঙে দিলেই হুমকি পুরোপুরি শেষ হয়ে যায় না।
জাতিসংঘের প্রতিবেদনে ছোট ও বিকেন্দ্রীভূত সেল এবং লজিস্টিক ও অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার যে প্রবণতার কথা বলা হয়েছে, সেটি বিশেষভাবে গুরুত্ব পাওয়ার দাবি রাখে। বাংলাদেশে অনলাইন যোগাযোগমাধ্যমের ব্যাপক বিস্তার, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া পরিচয়ে যোগাযোগ এবং তরুণদের একটি অংশের মধ্যে হতাশা ও বিচ্ছিন্নতাকে কাজে লাগানোর সুযোগ জঙ্গিগোষ্ঠীগুলো নিতে পারে। ফলে শুধু সীমান্ত কিংবা সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের ওপর নজরদারি করলেই হবে না; অনলাইন উগ্রবাদী প্রচারণা ও অর্থায়নের পথও কার্যকরভাবে বন্ধ করতে হবে।
এ ক্ষেত্রে গোয়েন্দা তথ্যের আদান-প্রদান আরও জোরদার করা জরুরি। প্রতিবেশী দেশগুলোসহ আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় বাড়াতে হবে। সন্দেহজনক অর্থ লেনদেন, অবৈধ অর্থায়ন, অস্ত্র ও বিস্ফোরক সরবরাহের পথ এবং জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট যোগাযোগ শনাক্ত করতে সক্ষমতা বাড়াতে হবে। তবে নিরাপত্তার নামে যেন নিরীহ মানুষ হয়রানির শিকার না হন, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। জঙ্গিবাদ দমনের কার্যক্রম হতে হবে তথ্যনির্ভর, পেশাদার ও আইনের কঠোর কাঠামোর মধ্যে।
আরেকটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ- জঙ্গিবাদ প্রতিরোধে শুধু অভিযান দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি সাফল্য পাওয়া সম্ভব নয়। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় প্রশাসন, গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজকে সম্পৃক্ত করে উগ্রবাদবিরোধী সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। তরুণদের জন্য শিক্ষা, কর্মসংস্থান, সাংস্কৃতিক কর্মকা- ও সুস্থ বিনোদনের সুযোগ বাড়াতে হবে। ধর্মের নামে বিভ্রান্তিকর ও সহিংস মতাদর্শ ছড়ানোর বিরুদ্ধে যুক্তিনির্ভর সচেতনতা তৈরি করতে হবে।
আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের পরিস্থিতিও বাংলাদেশের জন্য সতর্কতামূলক। দক্ষিণ এশিয়ার কোনো দেশে জঙ্গি সংগঠনের শক্তিশালী অবস্থান তৈরি হলে তার প্রভাব সীমান্ত অতিক্রম করে পুরো অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়তে পারে। বিশেষ করে প্রযুক্তির সহজলভ্যতার এই সময়ে একটি দেশের জঙ্গি নেটওয়ার্ক অন্য দেশের উগ্রবাদী গোষ্ঠীর সঙ্গে দ্রুত যোগাযোগ স্থাপন করতে পারে।
তাই জাতিসংঘের এই প্রতিবেদনকে আতঙ্ক ছড়ানোর কারণ না বানিয়ে আগাম সতর্কতার সুযোগ হিসেবে দেখা উচিত। বাংলাদেশে আল-কায়েদা বা অন্য কোনো জঙ্গি সংগঠনকে শিকড় গাড়ার সুযোগ দেওয়া যাবে না। অতীতের অভিজ্ঞতা, আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা তথ্য এবং বর্তমান প্রযুক্তিগত বাস্তবতাকে সমন্বয় করে এখনই প্রতিরোধব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করতে হবে।
সবচেয়ে বড় কথা, জঙ্গিবাদ দমনে রাষ্ট্রকে যেমন কঠোর হতে হবে, তেমনি সমাজকেও সচেতন হতে হবে। কারণ একটি সন্ত্রাসী সেল গড়ে ওঠার আগেই যদি তার আদর্শিক, আর্থিক ও সাংগঠনিক ভিত্তি শনাক্ত করে ভেঙে দেওয়া যায়, তবেই বড় ধরনের বিপর্যয় এড়ানো সম্ভব। জাতিসংঘের এই সতর্কবার্তা তাই বাংলাদেশের জন্য আতঙ্কের নয় - বরং সময় থাকতে আরও সতর্ক, আরও প্রস্তুত এবং আরও দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান।
নিউজটি আপডেট করেছেন : SunamKantha
কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদকীয়