অধ্যাপক ড. মৃদুলকান্তি চক্রবর্তীর মৃত্যুবার্ষিকী আজ
- আপলোড সময় : ১৪-০৮-২০২৬ ১১:৫০:৪২ অপরাহ্ন
- আপডেট সময় : ১৪-০৮-২০২৬ ১১:৫০:৪২ অপরাহ্ন
স্টাফ রিপোর্টার ::
বাংলা সংগীতের গবেষণা, চর্চা ও শিক্ষায় অসামান্য অবদান রাখা সংগীতশিল্পী, সংগীত গবেষক ও শিক্ষক অধ্যাপক ড. মৃদুলকান্তি চক্রবর্তীর ১৫তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ। ২০১১ সালের ১৫ আগস্ট তিনি মৃত্যুবরণ করেন। সংগীতশিক্ষা, গবেষণা, পরিবেশনা এবং শিক্ষকতার মাধ্যমে বাংলা সংগীতের অঙ্গনে তিনি যে অবদান রেখে গেছেন, তা আজও স্মরণ করেন সংগীতপ্রেমী ও শিক্ষার্থীরা।
মৃদুলকান্তি চক্রবর্তী ১৯৫৫ সালে সুনামগঞ্জে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা মনোরঞ্জন চক্রবর্তী বাঁশি বাজাতেন এবং মা দীপালী চক্রবর্তী সেতার বাজাতেন। সাত ভাইবোনের মধ্যে তিনি ছিলেন তৃতীয়। বড় ভাই মৃণালকান্তি চক্রবর্তী ছিলেন তবলা বাদনে পারদর্শী। ফলে ছোটবেলা থেকেই পারিবারিক পরিবেশে সংগীতচর্চার আবহে বেড়ে ওঠেন তিনি। বড় বোন রতœা চক্রবর্তীর কাছেই তাঁর সংগীতশিক্ষার হাতেখড়ি।
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় বড় বোন রতœা চক্রবর্তীর সঙ্গে ভারতের মেঘালয়ের শিলং, বালাট ও মাইলাম শরণার্থী শিবিরে গান পরিবেশন করে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে মানুষের মধ্যে উৎসাহ সৃষ্টি করেন তিনি। মুকুন্দ দাস, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও কাজী নজরুল ইসলামের গান গেয়ে শরণার্থী ও মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মানুষদের অনুপ্রাণিত করতেন। এ সময় ‘বাংলাদেশ বুলেটিন’ পত্রিকা বিক্রি করে পাওয়া অর্থ তৎকালীন ন্যাপ নেতা প্রয়াত পীর হাবিবুর রহমানের কাছে জমা দিতেন।
স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে সিলেট বেতার কেন্দ্রে নিয়মিত রবীন্দ্রসংগীত পরিবেশন শুরু করেন মৃদুলকান্তি। পরে বাংলাদেশ সরকারের মনোনীত বৃত্তি নিয়ে ভারতের শান্তিনিকেতনে যান এবং বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগীত বিভাগে ভর্তি হন। ১৯৭৭ সালে বিশ্বভারতীর ছাত্র হিসেবে সর্বভারতীয় যুব উৎসবে অংশ নিয়ে প্রতিযোগিতায় প্রথম স্থান অর্জন করেন।
১৯৮০ সালে বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বি.মিউজ এবং একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এম.মিউজ ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি। ১৯৯৪ সালে বিশ্বভারতী থেকেই পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন। তাঁর গবেষণার বিষয় ছিল ‘বাংলা সংগীতের ধারা ও লোকসংগীতের সুরে রবীন্দ্রসংগীত’ - অষ্টম থেকে বিংশ শতাব্দী পর্যন্ত বাংলা সংগীতের বিবর্তন ও লোকসংগীতের সুরধারায় রবীন্দ্রসংগীতের প্রভাব নিয়ে ছিল তাঁর এই গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা।
শান্তিনিকেতনে অবস্থানকালে তিনি ভারতীয় সংগীতের বহু গুণীজনের সংস্পর্শে আসেন এবং তাঁদের কাছে প্রাচীন বাংলা গান, রবীন্দ্রসংগীত ও রাগসংগীতে তালিম নেন। মন্মথনাথ রায়, অশেষ বন্দ্যোপাধ্যায়, মোহন সিং খাঙ্গুরা, কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়, নীলিমা সেন, গোরা সর্বাধিকারী, মঞ্জু বন্দ্যোপাধ্যায়, ভি.ভি. ওয়াঝলওয়ার ও দেবেন দাস বাউলের মতো গুণীজনের সান্নিধ্য তাঁর সংগীতজীবনকে সমৃদ্ধ করে।
শান্তিনিকেতন থেকে দেশে ফিরে তিনি বাংলাদেশ টেলিভিশনের নিয়মিত সংগীতশিল্পী হিসেবে যুক্ত হন। পরবর্তীতে তাঁর হাত ধরেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সংগীত বিভাগ চালু হয়। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগীত বিভাগে অধ্যাপনায় নিয়োজিত ছিলেন। একই সঙ্গে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি, জাতীয় গণমাধ্যম ইনস্টিটিউট ও ফরেন সার্ভিস একাডেমিসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে সংগীত বিষয়ে পাঠদান ও প্রশিক্ষণ দিয়েছেন।
দেশ-বিদেশে সংগীত বিষয়ক বক্তৃতা, পরিবেশনা, সেমিনার ও লেকচার-ডেমোনস্ট্রেশনে অংশ নিয়েছেন অধ্যাপক মৃদুলকান্তি। ভারত, ইংল্যান্ড, জার্মানি, যুক্তরাষ্ট্র ও মরক্কোর বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে সংগীত বিষয়ে সেমিনার ও লেকচার-ডেমোনস্ট্রেশন প্রদান করেন তিনি।
গবেষণা ও লেখালেখিতেও তাঁর অবদান উল্লেখযোগ্য। তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থগুলোর মধ্যে রয়েছে- ‘হাসনরাজা ও তাঁর গানের তরী’, ‘বাংলা গানের ধারা’, ‘গানের ঝরণাতলায়’, ‘লোকসংগীত’, ‘সংগীত সংলাপ’, ‘হাজার বছরের বাংলা গান’ এবং ‘বাউলকবি লালন ও তাঁর গান’। সংগীতের পাশাপাশি হারিয়ে যাওয়া লোকগান ও লোকসুর সংরক্ষণেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেছেন।
অধ্যাপক ড. মৃদুলকান্তি চক্রবর্তীর প্রয়াণ বাংলা সংগীতাঙ্গনের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি। শিল্পী হিসেবে পরিবেশনা, গবেষক হিসেবে অনুসন্ধান এবং শিক্ষক হিসেবে প্রজন্ম গড়ে তোলার মধ্য দিয়ে তিনি বহুমাত্রিক ভূমিকা পালন করেছেন। সংগীত গবেষণা ও শিক্ষায় তাঁর অবদান আজও স্মরণীয় হয়ে আছে।
নিউজটি আপডেট করেছেন : SunamKantha
কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ

স্টাফ রিপোর্টার, দৈনিক সুনামকণ্ঠ