আহত মানুষের চিকিৎসা অধিকার, দয়া নয়
- আপলোড সময় : ০৮-০৮-২০২৬ ০৯:২১:০১ পূর্বাহ্ন
- আপডেট সময় : ০৮-০৮-২০২৬ ০৯:২১:০১ পূর্বাহ্ন
সড়ক দুর্ঘটনা, ছিনতাই কিংবা অন্য কোনো দুর্ঘটনায় আহত একজন মানুষকে বাঁচানোর জন্য প্রথম কয়েকটি মিনিটই অনেক সময় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। অথচ সেই সংকটময় মুহূর্তে নিকটস্থ হাসপাতাল বা ক্লিনিকে গিয়ে যদি চিকিৎসা না মেলে, তাহলে একটি দুর্ঘটনা পরিণত হতে পারে অনিবার্য মৃত্যুর ঘটনায়। দীর্ঘদিনের এই নির্মম বাস্তবতার বিরুদ্ধে হাইকোর্টের সাম্প্রতিক নির্দেশনা তাই নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ ও সময়োপযোগী।
বৃহস্পতিবার হাইকোর্ট দেশের সব সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকে দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তিদের চিকিৎসা নিশ্চিত করতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সচিবকে সার্কুলার জারির নির্দেশ দিয়েছেন। একই সঙ্গে সব ধরনের দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তিদের নিকটস্থ হাসপাতাল ও ক্লিনিকে চিকিৎসা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় বিধি প্রণয়নের নির্দেশনাও এসেছে। এই রায় কেবল একটি মামলার নি®পত্তি নয়; বরং দেশের চিকিৎসাব্যবস্থায় মানবিক দায়বদ্ধতা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা।
প্রশ্ন হলো- একজন আহত মানুষকে চিকিৎসা দিতে হাসপাতাল কেন গড়িমসি করবে? কেন হাসপাতালের দরজায় দাঁড়িয়ে একজন মুমূর্ষু মানুষকে অর্থ, কাগজপত্র, পুলিশি ঝামেলা কিংবা অন্য কোনো অজুহাতে ফিরিয়ে দেওয়া হবে? একটি মানুষের জীবন রক্ষার সঙ্গে এসব বিষয়কে কোনোভাবেই তুলনা করা যায় না।
বাস্তবতা হলো, দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তিকে নিয়ে স্বজনেরা যখন এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে ছোটাছুটি করেন, তখন অনেক ক্ষেত্রেই চিকিৎসা শুরু হওয়ার আগেই মূল্যবান সময় নষ্ট হয়। বিশেষ করে গুরুতর আহত রোগীর ক্ষেত্রে এই বিলম্বই মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। সরকারি হাসপাতালের পাশাপাশি বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোর বিরুদ্ধেও জরুরি রোগী গ্রহণে অনীহা, অর্থের নিশ্চয়তা দাবি কিংবা সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও রোগী অন্যত্র পাঠিয়ে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
সংবিধানের ৩২ অনুচ্ছেদে মানুষের জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতার অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। ফলে দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তিকে জরুরি চিকিৎসা দেওয়া কোনো হাসপাতাল বা ক্লিনিকের অনুগ্রহ নয়; এটি মানুষের জীবন রক্ষার মৌলিক দায়িত্বের অংশ। স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার লাইসেন্স নিয়ে পরিচালিত প্রতিষ্ঠানগুলোকে এই দায়িত্ব থেকে কোনোভাবেই অব্যাহতি দেওয়া যায় না।
হাইকোর্টের নির্দেশনা বাস্তবায়নে এখন সরকারের কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন। শুধু সার্কুলার জারি করলেই হবে না; এর বাস্তব প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। হাসপাতালগুলোতে জরুরি রোগী গ্রহণের বাধ্যবাধকতা, চিকিৎসা দিতে অস্বীকৃতির ক্ষেত্রে জবাবদিহি এবং গুরুতর আহত রোগীর ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক চিকিৎসা শুরুর ব্যবস্থা থাকতে হবে। পাশাপাশি প্রত্যেক হাসপাতাল ও ক্লিনিকে অভিযোগ জানানোর সহজ ব্যবস্থা এবং নিয়মিত তদারকিও নিশ্চিত করা জরুরি।
বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোর ক্ষেত্রেও একটি বিষয় স্পষ্ট করা প্রয়োজন - চিকিৎসাসেবা একটি ব্যবসায়িক কার্যক্রম হতে পারে, কিন্তু জরুরি মুহূর্তে মানুষের জীবন নিয়ে দর-কষাকষির সুযোগ নেই। চিকিৎসার খরচ আদায়ের ব্যবস্থা পরবর্তী পর্যায়ে হতে পারে; কিন্তু জীবন বাঁচানোর প্রাথমিক চিকিৎসা কোনোভাবেই বন্ধ রাখা উচিত নয়।
তবে দায়িত্ব শুধু হাসপাতালের নয়। দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তিকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া, জরুরি চিকিৎসা দেওয়া এবং প্রয়োজনে উপযুক্ত হাসপাতালে স্থানান্তরের জন্য অ্যাম্বুলেন্স ও জরুরি পরিবহন ব্যবস্থাকেও শক্তিশালী করতে হবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও স্থানীয় প্রশাসনেরও এ ক্ষেত্রে সমন্বিত ভূমিকা প্রয়োজন।
হাইকোর্টের এই নির্দেশনাকে আমরা তাই শুধু আদালতের একটি রায় হিসেবে দেখতে চাই না। এটি দেশের চিকিৎসাব্যবস্থাকে আরও মানবিক ও জবাবদিহিমূলক করার একটি সুযোগ। এখন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, অধিদপ্তর এবং সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানকে দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
দুর্ঘটনায় আহত একজন মানুষ প্রথমে একজন মানুষ - তিনি ধনী না দরিদ্র, পরিচিত না অপরিচিত, সরকারি না বেসরকারি হাসপাতালের রোগী - তা চিকিৎসার অধিকারের ক্ষেত্রে কোনো বিবেচ্য বিষয় হতে পারে না। হাসপাতালের দরজা তার জন্য বন্ধ নয়, বরং জীবন বাঁচানোর শেষ আশ্রয় হওয়াই উচিত। আহত মানুষকে চিকিৎসা দেওয়া দয়া নয়; এটি রাষ্ট্র, হাসপাতাল ও চিকিৎসাব্যবস্থার মৌলিক মানবিক ও আইনগত দায়িত্ব।
নিউজটি আপডেট করেছেন : SunamKantha
কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদকীয়