ইঞ্জিনিয়ার মো. মিজানুর রহমান:
বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের প্রাকৃতিক সম্পদের অপার সৌন্দর্যের লীলাভূমি টাঙ্গুয়ার হাওর শুধু একটি জলাভূমি নয়, এটি দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মিঠাপানির বাস্তুতন্ত্র। সুনামগঞ্জের মধ্যনগর ও তাহিরপুর উপজেলার চারটি ইউনিয়নজুড়ে বিস্তৃত প্রায় ৯ হাজার ৭২৭ হেক্টরের এই হাওর আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত রামসার সাইট (Ramsar Site)। একসময় প্রায় ১৪১ প্রজাতির দেশীয় মাছ, ২০০ থেকে ২৫০ প্রজাতির দেশীয় ও পরিযায়ী পাখি এবং অসংখ্য জলজ উদ্ভিদের নিরাপদ আবাস ছিল এই হাওর। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তন, আগাম বন্যা, পাহাড়ি ঢল, পলি ও বালু জমা, দূষণ এবং মানবসৃষ্ট নানা চাপের কারণে আজ টাঙ্গুয়ার হাওরের জীববৈচিত্র্য অস্তিত্ব সংকটে।
সংকুচিত হচ্ছে মৎস্যসম্পদ: টাঙ্গুয়ার হাওর দীর্ঘদিন ধরেই দেশের অন্যতম প্রধান প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজনন ক্ষেত্র বা ‘মাদার ফিশারীজ’ হিসেবে পরিচিত। ভারতের মেঘালয় থেকে নেমে আসা অসংখ্য ঝরনা ও পাহাড়ি ছড়া এ হাওরে মিলিত হয়ে মাছের প্রজননের জন্য আদর্শ পরিবেশ তৈরি করেছে। আইড়, চিতল, বোয়াল, মহাশোল, রানী, বাইম ও গজারসহ বহু দেশীয় মাছের বংশবিস্তার হতো এখানে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে আগাম পাহাড়ি ঢল ও অনিয়মিত বৃষ্টিপাত মাছের প্রাকৃতিক প্রজনন চক্রকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে। প্রবল স্রোতে ডিম ও রেণুপোনা ভেসে যাচ্ছে, আবার কোথাও পলির নিচে চাপা পড়ে নষ্ট হচ্ছে। একই সঙ্গে বিল ও জলাশয়ে বালু জমে গভীরতা কমে যাওয়ায় শুষ্ক মৌসুমে মা মাছের নিরাপদ আশ্রয়ও হারিয়ে যাচ্ছে। গ্রীষ্মকালে পানির তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং কৃষিজমি থেকে ধুয়ে আসা রাসায়নিক সার ও কীটনাশক মৎস্যসম্পদের জন্য নতুন হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নীরব হয়ে যাচ্ছে পাখির অভয়ারণ্য: শীত এলেই সাইবেরিয়া, মঙ্গোলিয়া ও হিমালয় অঞ্চল থেকে হাজার হাজার পরিযায়ী পাখির আগমনে মুখর হয়ে উঠত টাঙ্গুয়ার হাওর। বালিহাঁস, সরালি, ল্যাঞ্জাহাঁস, পাতিকূটের পাশাপাশি বিরল অনেক প্রজাতির পাখির দেখা মিলত এখানে। কিন্তু গত দুই দশকে সেই চিত্র বদলে গেছে। বিভিন্ন জরিপে দেখা গেছে, পরিযায়ী পাখির সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে কমে এসেছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ঘন ঘন ঝড়, দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা এবং পাহাড়ি ঢলে হিজল-করচের বন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় পাখিদের আবাস সংকুচিত হচ্ছে। পাশাপাশি ছোট মাছ, শামুক ও জলজ কীটপতঙ্গ কমে যাওয়ায় খাদ্যসংকটও বাড়ছে। ফলে অনেক পরিযায়ী পাখি এখন তাদের চিরচেনা উড্ডয়ন পথ পরিবর্তন করছে।
বিপন্ন সোয়াম্প ফরেস্ট: টাঙ্গুয়ার হাওরের প্রাণ হলো এর সোয়াম্প ফরেস্ট। হিজল, করচ, শাপলা, শালুক, পদ্ম ও নলখাগড়াসহ অসংখ্য জলজ উদ্ভিদ এ বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য রক্ষা করে। কিন্তু দীর্ঘদিন পানিতে নিমজ্জিত থাকা, পাহাড়ি ঢলের তীব্র স্রোত এবং তলদেশে বালু জমার কারণে এই বনাঞ্চল দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। নতুন গাছ জন্মানোর স্বাভাবিক প্রক্রিয়াও ব্যাহত হচ্ছে। অন্যদিকে কৃষিজমি সম্প্রসারণ এবং জ্বালানির জন্য গাছ কাটার প্রবণতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
হুমকিতে বন্যপ্রাণী: টাঙ্গুয়ার হাওরে মাছ ও পাখির পাশাপাশি মেছোবিড়াল, উদবিড়াল, বেজি, শিয়াল, বিভিন্ন প্রজাতির কচ্ছপ, পানির সাপ ও উভচর প্রাণীরও বসবাস। আকস্মিক বন্যায় এসব প্রাণী নিরাপদ আশ্রয় হারায়। অনেক প্রাণী পানিতে ভেসে মারা যায়, আবার খাদ্যের অভাবে লোকালয়ে চলে এসে মানুষের সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে। বিলগুলো ভরাট হয়ে যাওয়ায় উদবিড়ালের মতো বিরল প্রাণীর আবাসও সংকুচিত হচ্ছে।
এখনই কার্যকর উদ্যোগ জরুরি: টাঙ্গুয়ার হাওরের এই সংকট শুধু জীববৈচিত্র্যের নয়; এটি হাওরপাড়ের লাখো মানুষের জীবন-জীবিকা, খাদ্যনিরাপত্তা এবং পরিবেশগত ভারসাম্যের সঙ্গেও জড়িত। তাই পরিকল্পিতভাবে পলি ও বালু অপসারণ, মা মাছের অভয়ারণ্য ও পাখির নিরাপদ আবাস সংরক্ষণ, সোয়াম্প ফরেস্ট পুনরুদ্ধার, দূষণ নিয়ন্ত্রণ এবং স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করে সমন্বিত ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা ও কার্যকর নীতি বাস্তবায়নের বিকল্প নেই। প্রকৃতির অপরূপ এই জলাভূমি শুধু সুনামগঞ্জের নয়, সমগ্র বাংলাদেশের পরিবেশগত নিরাপত্তার অন্যতম ভিত্তি। টাঙ্গুয়ার হাওরকে রক্ষা করা মানে দেশের জীববৈচিত্র্য, মৎস্যসম্পদ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি অমূল্য প্রাকৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ করা। এখনই কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া না গেলে একদিন হয়তো টাঙ্গুয়ার হাওরের সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্য কেবল ইতিহাসের পাতাতেই সীমাবদ্ধ হয়ে থাকবে।
প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও)
মধ্যনগর।
[email protected]
নিউজটি আপডেট করেছেন : SunamKantha
বিপর্যয়ের মুখে টাঙ্গুয়ার হাওরের জীববৈচিত্র্য
- আপলোড সময় : ০৬-০৮-২০২৬ ০২:৫৭:১০ অপরাহ্ন
- আপডেট সময় : ০৬-০৮-২০২৬ ০৪:১৯:০০ অপরাহ্ন
ছবি: লেখক ইঞ্জিনিয়ার মো. মিজানুর রহমান
কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ

সুনামকন্ঠ ডেস্ক