হাওর-নদী বাঁচাতে দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন
- আপলোড সময় : ১৯-০৭-২০২৬ ১০:০২:০৩ পূর্বাহ্ন
- আপডেট সময় : ১৯-০৭-২০২৬ ১০:০২:০৩ পূর্বাহ্ন
হাওরাঞ্চল বাংলাদেশের খাদ্যনিরাপত্তা, জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশগত ভারসাম্যের অন্যতম প্রধান ভিত্তি। দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এই জলাভূমি শুধু বোরো ধানের ভা-ারই নয়, এটি লাখো মানুষের জীবিকা, মৎস্যস¤পদ, নৌযোগাযোগ এবং প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু দুঃখজনকভাবে একের পর এক নদী, খাল ও বিল ভরাট হয়ে যাওয়ায় হাওর তার স্বাভাবিক পানি ধারণক্ষমতা হারাচ্ছে। এর ফলে সামান্য ভারী বৃষ্টি কিংবা উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলেই সৃষ্টি হচ্ছে আকস্মিক বন্যা, যা প্রতিবছর কৃষক, জেলে ও সাধারণ মানুষের জীবনে নতুন দুর্ভোগ ডেকে আনছে।
নদী ও খালের নাব্যতা হ্রাস আজ হাওরাঞ্চলের সবচেয়ে বড় পরিবেশগত সংকটগুলোর একটি। পলি জমা, অবৈধ দখল, অপরিকল্পিত সড়ক ও স্থাপনা নির্মাণ, দূষণ এবং নির্বিচারে বালু-পাথর উত্তোলনের কারণে নদীগুলোর স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। একই সঙ্গে উজানে বন উজাড় ও পাহাড় কেটে খনিজ উত্তোলনের ফলে বিপুল পরিমাণ পলি বাংলাদেশের নদ-নদীতে এসে জমা হচ্ছে। ফলে একদিকে নদীর গভীরতা কমছে, অন্যদিকে হাওরের বিস্তীর্ণ এলাকায় পানি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে ফসল ও জনপদের ক্ষতি করছে।
২০২২ সালের ভয়াবহ বন্যা আমাদের সামনে কঠিন বাস্তবতা তুলে ধরেছিল। একই ধরনের আশঙ্কা বার বার তৈরি হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরেই সতর্ক করে আসছেন, নদী ও খাল পুনঃখনন, পানি প্রবাহের স্বাভাবিক পথ পুনরুদ্ধার এবং জলাভূমি সংরক্ষণ ছাড়া এই সংকট থেকে উত্তরণের কোনো বিকল্প নেই। সরকার বিভিন্ন সময়ে নদী খননের উদ্যোগ নিলেও তার সুফল প্রত্যাশিত মাত্রায় পৌঁছেনি। পরিকল্পনা গ্রহণের পাশাপাশি তার সঠিক বাস্তবায়ন, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ এবং বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণ নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
হাওরের সঙ্গে সংযুক্ত খালগুলো পুনরুদ্ধার করাও সময়ের দাবি। শুধু বড় নদী খনন করলেই হবে না; ছোট ছোট খাল, বিল ও জলপথ সচল না থাকলে অতিরিক্ত পানি দ্রুত নিষ্কাশনের সুযোগ থাকবে না। একই সঙ্গে নদী দখল, অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ এবং অনিয়ন্ত্রিত বালু উত্তোলনের বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ করতে হবে। উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণের ক্ষেত্রেও পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন বাধ্যতামূলক করতে হবে, যাতে কোনো প্রকল্প হাওরের স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ ব্যাহত না করে।
প্রকৃতপ্রস্তাবে, হাওর কেবল একটি ভৌগোলিক অঞ্চল নয়; এটি বাংলাদেশের পরিবেশ, অর্থনীতি ও সংস্কৃতির অমূল্য স¤পদ। এই স¤পদ রক্ষায় সরকারের পাশাপাশি স্থানীয় প্রশাসন, গবেষক, পরিবেশবিদ, জনপ্রতিনিধি এবং সাধারণ মানুষের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। উজান-ভাটির সমন্বিত নদী ব্যবস্থাপনা, আন্তঃসীমান্ত নদী নিয়ে কার্যকর কূটনৈতিক উদ্যোগ, নিয়মিত ড্রেজিং, জলাভূমি সংরক্ষণ এবং টেকসই উন্নয়ন পরিকল্পনাই পারে ভবিষ্যতের অকাল বন্যার ঝুঁকি কমাতে।
হাওরের নদী ও খাল হারিয়ে গেলে শুধু পানি ধারণক্ষমতাই কমবে না; হারিয়ে যাবে জীববৈচিত্র্য, কৃষির উৎপাদনশীলতা এবং লাখো মানুষের জীবন-জীবিকার নিরাপত্তা। তাই সময় থাকতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া এখন আর কোনো বিকল্প নয়, বরং জাতীয় প্রয়োজন।
নিউজটি আপডেট করেছেন : SunamKantha
কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদকীয়