একই পরিবারের ৩ জনের প্রাণহানি
বিদ্যুৎস্পৃষ্টে মৃত্যুর দায় এড়ানোর সুযোগ নেই
- আপলোড সময় : ০৯-০৭-২০২৬ ১০:৪৯:৩৮ পূর্বাহ্ন
- আপডেট সময় : ০৯-০৭-২০২৬ ১০:৪৯:৩৮ পূর্বাহ্ন
একটি দুর্ঘটনা কখনও কখনও শুধু তিনটি প্রাণই কেড়ে নেয় না, একটি পরিবারের ভবিষ্যৎ, একটি গ্রামের স্বাভাবিক জীবন এবং সমাজের বিবেককেও নাড়া দিয়ে যায়। বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার অনন্তপুর গ্রামে বিদ্যুৎ¯পৃষ্ট হয়ে একই পরিবারের বাবা, মা ও ছেলের মৃত্যুর ঘটনা তেমনই এক হৃদয়বিদারক ট্র্যাজেডি। একই দিনে তিনজনকে পাশাপাশি দাফন করতে হয়েছে, আর পেছনে রেখে যেতে হয়েছে পাঁচ বছর, দেড় বছর ও মাত্র তিন মাস বয়সী তিনটি এতিম শিশুকে। এই দৃশ্য শুধু একটি পরিবারের নয়, আমাদের সামগ্রিক নিরাপত্তা-ব্যবস্থার দুর্বলতারও নির্মম প্রতিচ্ছবি।
প্রাথমিক তথ্যে জানা গেছে, দোকানঘর মেরামতের সময় বিদ্যুতের মিটার সরাতে গিয়ে দুর্ঘটনাটি ঘটে। বিদ্যুৎ বিভাগ বলছে, কর্তৃপক্ষকে না জানিয়েই মিটার সরানোর চেষ্টা করা হয়েছিল। অন্যদিকে স্থানীয়দের অভিযোগ, ঝুঁকিপূর্ণ বিদ্যুৎ সংযোগ, সচেতনতার অভাব এবং প্রয়োজনীয় তদারকির ঘাটতিও এ ধরনের দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ। বাস্তবতা হলো- দুই পক্ষের বক্তব্যের মাঝখানেই রয়েছে একটি কঠিন সত্য। বিদ্যুৎ নিয়ে সামান্য অসতর্কতাও প্রাণঘাতী হতে পারে। তাই কেবল দায় অস্বীকার বা দায় চাপিয়ে দিয়ে এ ধরনের দুর্ঘটনা প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়।
বাংলাদেশে প্রতিবছর অসংখ্য মানুষ বিদ্যুৎ¯পৃষ্ট হয়ে প্রাণ হারান বা স্থায়ীভাবে পঙ্গুত্ব বরণ করেন। এর বড় একটি অংশ ঘটে গ্রামীণ এলাকায়, যেখানে নিরাপদ বিদ্যুৎ ব্যবহার সম্পর্কে সচেতনতা সীমিত এবং অনেক ক্ষেত্রে পুরোনো বা ঝুঁকিপূর্ণ সংযোগ দীর্ঘদিন অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে থাকে। বিদ্যুৎ সংযোগ, মিটার কিংবা বৈদ্যুতিক স্থাপনা সংক্রান্ত যেকোনো কাজ প্রশিক্ষিত ব্যক্তির মাধ্যমে সম্পন্ন করা যে বাধ্যতামূলক - এই বার্তা এখনো সবার কাছে কার্যকরভাবে পৌঁছাতে পারেনি।
এই ঘটনার পর সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি মানবিক। মুহূর্তের মধ্যে এতিম হয়ে যাওয়া তিনটি শিশুর দায়িত্ব কে নেবে? তাদের শিক্ষা, চিকিৎসা, নিরাপদ বেড়ে ওঠা এবং জীবনের ন্যূনতম নিশ্চয়তা নিশ্চিত করা শুধু স্বজনদের পক্ষে সম্ভব নাও হতে পারে।
স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি, সমাজের বিত্তবান মানুষ এবং সমাজসেবামূলক প্রতিষ্ঠানগুলোর উচিত সমন্বিতভাবে এই পরিবারের পাশে দাঁড়ানো। সরকারি সহায়তা দ্রুত নিশ্চিত করার পাশাপাশি শিশুদের দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেওয়াও জরুরি।
একই সঙ্গে এই দুর্ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে আরও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। ঝুঁকিপূর্ণ বিদ্যুৎ লাইন ও সংযোগ চিহ্নিত করে দ্রুত সংস্কার, গ্রামভিত্তিক নিরাপদ বিদ্যুৎ ব্যবহারবিষয়ক সচেতনতামূলক কর্মসূচি, মিটার বা সংযোগ সংক্রান্ত কাজের আগে বাধ্যতামূলকভাবে বিদ্যুৎ বিভাগের সহযোগিতা নেওয়ার প্রচার এবং নিয়মিত তদারকি জোরদার করা সময়ের দাবি। দুর্গম এলাকাগুলোতে বিশেষ নজর দেওয়াও প্রয়োজন।
একটি দুর্ঘটনার পর শোক প্রকাশ করা সহজ, কিন্তু ভবিষ্যতে এমন দুর্ঘটনা ঠেকাতে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়াই প্রকৃত দায়িত্বশীলতার পরিচয়। অনন্তপুরের এই তিনটি প্রাণ আর ফিরে আসবে না। তবে তাদের মৃত্যু যদি আমাদের আরও সচেতন করে, নিরাপদ বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনায় নতুন উদ্যোগের সূচনা ঘটায় এবং অন্তত আর একটি পরিবারকে এমন অন্ধকার থেকে রক্ষা করতে পারে - তবেই এই শোকের ভেতর থেকে একটি ইতিবাচক শিক্ষা উঠে আসবে। এখন সময় শুধু শোক প্রকাশের নয়; দায়িত্ব পালনের।
নিউজটি আপডেট করেছেন : SunamKantha
কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদকীয়