বিশেষ প্রতিনিধি::
তাহিরপুর উপজেলার যাদুকাটা নদীতে নানাভাবে অবৈধভাবে বালু লুট থামছেইনা। ইউনূস সরকারের সময়ে মব করে বালু লুট হয়েছে প্রকাশ্যে। তখন প্রশাসন ছিল নীরব। গত বছরের শেষ দিকে মব করে বালু লুট হলে এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছবি ও ভিডিও ভাইরাল এবং মিডিয়ায় সংবাদ প্রকাশিত হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বাধ্য হয়ে তড়িঘড়ি করে মামলা করে। তবে মামলায় পাড় কাটা ও বালু লুটে যারা জড়িত তাদের অধিকাংশই বাদ যায় এমন অভিযোগ আছে। আবার নিরপরাধ ও বালু লুটের বিরুদ্ধে আন্দোলনকারীদেরও আসামি করা হয়। এসময় পরিবেশ অধিদপ্তর আলাদাভাবে মামলা করার পাশাপাশি যাদুকাটা-১ ইজারাদারের লোকও মামলা করেছিল। অবশেষে পরিবেশ অধিদপ্তরের মামলায় সোমবার আদালতে ২৭ জনের বিরুদ্ধে চার্জশীট দেওয়া হয়েছে। তবে চার্জশিট নিয়ে প্রশ্ন ওঠেছে। মামলার এজাহারভুক্ত ৩৭ জনের মধ্যে ১৬ জনকে বাদ দিয়ে অজ্ঞাতনামা ২০ জন থেকে ৬ জনকে আসামি হিসেবে যুক্ত করা হয়েছে। মামলার চার্জশিট, বালু লুটের বিরুদ্ধে আন্দোলনকারী জনতা, স্থানীয় পরিবেশবিদরা জানান, ইউনূস সরকারের সময়ে ৫ আগস্টের পর যাদুকাটা নদীতে অতীতের রেকর্ড ভঙ্গ করে অবাধে লুট হয় সিলিকা বালু। ড্রেজার লাগিয়ে, নদীর তীর কেটে বালু উত্তোলন করা হয় রাতদিন। সর্বশেষ ২০২৫ সালের ৬ থেকে ১১ অক্টোবর যাদুকাটা নদীর লাউড়েরগড় এলাকায় মব করে বালু লুটের ঘটনা ঘটে। ইউনূস সরকারের সময়ে প্রশাসনিক শিথিলতায় যাদুকাটা নদী ও আশপাশের এলাকা থেকে অবৈধভাবে ৫০০ কোটি টাকার সিলিকন বালু হয় বলে মনে করেন স্থানীয়রা। এই লুটে নদী তীরবর্তী পাড়ের বাসিন্দা, প্রভাবশালী রাজনীতিবিদসহ বিভিন্ন পেশার প্রভাবশালী লোকজনও জড়িত ছিলেন। দীর্ঘদিন ধরে পাড় কেটে বালু লুটের ঘটনায় নদীর গতিপথ বদলে গেছে। ভাঙছে নদীতীরবর্তী গ্রাম। দেশের বৃহত্তম শিমুল বাগান হুমকির মুখেসহ এলাকার প্রকৃতি ও পরিবেশ। এনিয়ে পরিবেশবিদরা মানববন্ধন, বিক্ষোভ সমাবেশসহ নানা ফোরামে প্রতিবাদ করলেও বালুখেকোদের থামানো যাচ্ছেনা। গত বছরের ১৫ অক্টোবর যাদুকাটা নদী বালুমহালের ইজারা সীমানার বাইরে নদীর পাড় কেটে বালু লুট করে নদীর আকার পরিবর্তন, পরিবেশ ও প্রতিবেশের ক্ষতি করে বালু লুট করার ঘটনায় ৩৭ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেন সুনামগঞ্জ পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মো. মোহাইমিনুল হক। মামলায় ৩৭ জনের নামোল্লেখ করে অজ্ঞাতনামা আরো ২০ জনের কথা উল্লেখ করা হয়। পরিবেশ অধিদপ্তরের মামলায় বিএনপি ও আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী কয়েকজন নেতার নামও ছিল। একই সময় তাহিরপুর থানায় ৫১ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেছিলেন ইজারাদারের লোক মোশারফ তালুকদার। এদিকে প্রায় ৮ মাস পর পরিবেশ অধিদপ্তরের মামলায় ২৭ জনের নামোল্লেখ করে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও পরিবেশ অধিদপ্তরের সুনামগঞ্জ জেলা কার্যালয়ের পরিদর্শক সাইফুল ইসলাম সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে অভিযোগপত্র জমা দিয়েছেন। চার্জশিটে এজাহার নামীয় ১৬ জনকে বাদ দেওয়া হয়েছে। তবে আওয়ামী লীগ নেতা ও সাবেক উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান আফতাব উদ্দিনকে আসামি করা হয়েছে। চার্জশিটে অজ্ঞাতনামা ৬ জনকে যুক্ত করা হয়েছে। চার্জশিটে তাহিরপুর উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও বাদাঘাট ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের যুগ্ম আহ্বায়ক আফতাব উদ্দিন, বাদাঘাট ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি খাজা মাইনুদ্দিন, মোশাহিদ আলম ওরফে রানু মেম্বার, জামাল মিয়া, বিল্লাল মিয়া ও বোরহান উদ্দিনের নাম রয়েছে। গত সপ্তাহেও রানু মেম্বার ও হাসান আলী ড্রেজারে অবৈধভাবে বালু লুট করেছেন বলে অভিযোগ আছে। তারা দীর্ঘদিন ধরে লাউড়েরগড়, ঘাগটিয়া পাক্কার মাথা, শিমুল বাগান, জালরটেক, বিন্নাকুলি, সোহালা, জামাইল্লারচর, অদ্বৈত মন্দির, যাদুকাটা সেতুর নিচ থেকে বালু লুট করেছে রাতদিন। সুনামগঞ্জ জেলা বারকি শ্রমিক সংঘের উপদেষ্টা সাইফুল আলম সদরুল বলেন, চার্জশিট রাজনৈতিক প্রভাবিত। অভিযুক্ত অনেক ছাড় পেয়েছেন। রাজনৈতিক প্রশ্রয়ের কারণে লুটপাটকারীরা পার পাওয়ায় এ ধরনের ঘটনা বাড়ছে। তিনি বলেন, ইউনূস সরকারের সময়ে যাদুকাটা নদীতে প্রকাশ্যে দিনে রাতে বালু লুট হয়েছে। এসময় অন্তত ৫শ কোটি টাকার বালু হয়েছে। এই লুটের বালু থেকে ইজারাদার রয়েলিটি আদাল করেছেন। তাহিরপুররের বিএনপি নেতা ও সমাজকর্মী মো. আবুল হোসেন বলেন, বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে অরক্ষিত ছিল যাদুকাটা নদী। তখন রাতে দিনে ইজারা বহির্ভূত এলাকা থেকে অন্তত ৫০০ কোটি টাকার বালু লুট হয়েছে। ওই সময়ে আগের ইজারার চেয়ে তিনগুণ ইজারামূল্যে নদী ইজারা দেওয়া হয়েছিল। এখানে বিপুল খনিজ সম্পদ ছিল বলেই ইজারামূল্য বেড়েছে। তবে মামলার যে চার্জশিট দেওয়া হয়েছে তাতে আসামিদের শাস্তি হওয়ার সুযোগ নেই। যাদুকাটা রক্ষা করতে হলে স্থানীয়দেরই সচেতন হতে হবে। সুনামগঞ্জ পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক ও মামলার বাদী মো. মোহাইমিনুল হক বলেন, আমরা সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করেছি। তদন্তে যাদের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে তাদের রাখা হয়েছে। যাদের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায়নি এমন ১৬ জন এজাহারভুক্তকে আসামি করা হয়েছে। আবার অজ্ঞাতনামা থেকে আরো ৬ জনকে আসামি করা হয়েছে। সব মিলিয়ে ২৭ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট দেওয়া হয়েছে। সুনামগঞ্জ-১ আসনের এমপি কামরুজ্জামান কামরুল বলেন, যাদুকাটা-মাহরামসহ যেসব নদী থেকে খনিজ বালু লুট হচ্ছে তার সঙ্গে নদী তীরবর্তী ভূমির কিছু মালিক জড়িত। এছাড়াও আমাদের দলের কিছু নেতাকর্মী, প্রশাসনের কিছু লোক জড়িত। গত দুদিন আগে এলাকায় গনসমাবেশ করে ঘোষণা দিয়ে এসেছি যারা ড্রেজার চালাবে ও বা অবৈধভাবে বালু লুট করবে তারা আমার আতœীয় বা দলের প্রভাবশালী হলেও তাদেরকে আটক করে রাখবে। আমি ইজারা বহির্ভূত এলাকায় নৌকা প্রবেশ নিষিদ্ধ করতে প্রশাসনকে নির্দেশ দিয়েছি এবং বালু লুটকারী পরিবেশ বিধ্বংসীকারীদেরও তালিকা করে আইনী ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছি। এর আগে যাদুকাটার বালু লুট ঠেকাতে আমি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বরাবর কোস্টগার্ড দেওয়ার দাবি জানিয়েছি।
নিউজটি আপডেট করেছেন : SunamKantha
ইউনূস আমলে যাদুকাটায় মব করে ৫০০ কোটি টাকার বালু লুট
অবশেষে বালু লুটকান্ডে এক মামলায় চার্জশিট
- আপলোড সময় : ০৮-০৭-২০২৬ ১১:২৯:৪৮ পূর্বাহ্ন
- আপডেট সময় : ০৮-০৭-২০২৬ ১১:৩০:৪০ পূর্বাহ্ন
ছবি: গত বছর ইউনুস সরকারের আমলে মব করে বালু লুটের সময়।
কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ

বিশেষ প্রতিনিধি