সুনামগঞ্জ , মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬ , ৬ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
‎আর্জেন্টিনাকে কাঁদিয়ে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন স্পেন পাঁচ মিনিটের বক্তব্যে মুগ্ধ করেছিলেন হুমায়ূন আহমেদ বর্ষায় নজরুল : শিল্পকলা একাডেমিতে প্রাণবন্ত সাংস্কৃতিক সন্ধ্যা মৃত্যুর শীর্ষে সুনামগঞ্জ, ৭ মাসে প্রাণ গেল ৪৫ শিশুর মধ্যনগরে শিশু ধর্ষণের শিকার, গ্রেফতার ১ শান্তিগঞ্জে আর্জেন্টিনা সমর্থকদের বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা ‎জামালগঞ্জে আর্জেন্টিনা সমর্থকদের বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা কারাগারে সাজাপ্রাপ্ত আসামির মৃত্যু সংবাদ সম্মেলনে এমরান হোসেন রুবেলের দাবি রাজনৈতিকভাবে হেয়প্রতিপন্ন করতেই মাদক মামলায় জড়ানো হয়েছে ৫ গুণীজন পেলেন জেলা শিল্পকলা একাডেমি সম্মাননা জুলাই সনদ নিয়ে বিরোধী দল জনগণকে বিভ্রান্ত করছে : মির্জা ফখরুল হেফাজতের উদ্যোগে এক হচ্ছে ৭ ইসলামি দল শান্তিগঞ্জে রুস্তম আলী হত্যাকান্ডের প্রতিবাদে বিক্ষোভ হাওর-নদী হারাচ্ছে পানি ধারণ ক্ষমতা, বাড়ছে অকাল বন্যার শঙ্কা জেলা শিল্পকলা একাডেমির গুণীজন সম্মাননা প্রদান আজ জুলাই শহীদ দিবস পালন সরকার জনগণের সাথে বেইমানি করেছে বর্ণাঢ্য রথযাত্রায় ভক্তদের ঢল ছাতকের জলাশয়ে মিলছে রাক্ষুসে সাকার মাছ! জিয়াউর রহমান হত্যা মামলার দন্ডপ্রাপ্ত সাবেক মেজর ৪৫ বছর পর গ্রেপ্তার

অশ্লীলতা আর গালিগালাজের কাছে সমাজ কি হেরে যাবে?

  • আপলোড সময় : ০৬-০৭-২০২৬ ১০:২২:৫৯ অপরাহ্ন
  • আপডেট সময় : ০৬-০৭-২০২৬ ১০:২২:৫৯ অপরাহ্ন
অশ্লীলতা আর গালিগালাজের কাছে সমাজ কি হেরে যাবে?
আমীন আল রশীদ:: জুলাই অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনাকে নিয়ে সম্প্রতি একটি অশ্লীল শব্দ লিখে নিজের ফেসবুক ওয়ালে শেয়ার করেছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের খ্যাতিমান অধ্যাপক সেলিম রেজা নিউটন - যিনি জুলাই অভ্যুত্থানে সক্রিয় ছিলেন এবং তার আগে সেনা নিয়ন্ত্রিত ওয়ান ইলেভেন সরকারের আমলে প্রতিবাদ করার কারণে কারাভোগ করেছিলেন। এছাড়া বিভিন্ন সময়ে গণতান্ত্রিক আন্দোলন এবং রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন ও অন্যায়ের বিরুদ্ধেও তার সরব উপস্থিতি ছিল। এরকম একজন শিক্ষক যে ভাষায় ফেসবুক পোস্ট দিয়েছেন, সেটি শিক্ষক হিসেবে তার নৈতিকতার প্রশ্নটি যেমন এনেছে, তেমনি জুলাই অভ্যুত্থানের সময় থেকেই প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে কেন গালাগাল, অশ্লীল শব্দ এবং বিষোদ্গারের প্রবণতা বাড়লো, তা নিয়েও প্রশ্ন করার সময় হয়েছে। আশার সংবাদ হলো, অধ্যাপক নিউটনের এই পোস্টের নিচে তার একাধিক শুভাকাক্সক্ষীও তার ভাষার সমালোচনা করেছেন। একই সময়ে অভিনেত্রী মেহের আফরোজ শাওনের একটি ফেসবুক পোস্টও সোশ্যাল মিডিয়ায় তীব্র সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। জুলাই শব্দের সাথে তিনি বাংলায় একটি অশ্লীল শব্দ বুঝাতে ইংরেজি তিনটি বর্ণ লিখে ফেসবুকে পোস্ট করেন - যে শব্দসংক্ষেপটি জুলাই অভ্যুত্থানের সময় ব্যাপকভাবে সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়েছিল। একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এবং একজন খ্যাতিমান অভিনেত্রী - যাদের দুজনেরই সামাজিক মর্যাদা ও গ্রহণযোগ্য রয়েছে; অনেক মানুষ যাদেরকে ‘আইডল’ মনে করেন- ফেসবুকের মতো পাবলিক প্লেসে তাদের ভাষা যদি শালীনতার সীমা অতিক্রম করে, তাহলে বুঝতে হবে সমাজের ভেতরে এক গভীর ক্ষত সৃষ্টি হয়েছে। প্রতিবাদ নানাভাবেই করা যায়। সকলের ভাষা এক নাও হতে পারে। সব মিছিল ও স্লোগানের ভাষাও এক নয়। একাত্তরপূর্ববর্তী বাংলাদেশের স্বাধিকার আন্দোলনের সময়কালের স্লোগানের ভাষা আর স্বাধীন বাংলাদেশে স্লোগানের ভাষা এক নয়। কিন্তু স্লোগানের ভাষায় কখনোই অশ্লীল শব্দ ছিল না। বরং আক্রমণাত্মক স্লোগানের ক্ষেত্রে বড়জোর ‘অমুকের দুই গালে জুতা মারো তালে তালে’ অথবা ‘অমুকের চামড়া তুলে নেবো আমরা’ - এর মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। স্লোগানের সেই ভাষায় বড় ধরনের ছন্দপতন ঘটে জুলাই অভ্যুত্থানের সময়। বাংলা ভাষার সবচেয়ে অশ্লীল দুয়েকটি শব্দ ঢুকে যায় স্লোগানের ভেতরে। যে শব্দগুলো সামাজিক পরিসরে ব্যবহার করাকে একসময় অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হতো। কিন্তু দেখা গেলো, শালীনতার সকল দরজা ভেঙে দিয়ে অভ্যুত্থানের তরুণরা এমন সব শব্দ স্লোগানে এবং দেয়ালের গ্রাফিতিতে লিখতে শুরু করলেন, যাকে তরুণদের রাগের বহিঃপ্রকাশ তথা ফ্যাসিস্ট ও কর্তৃত্ববাদী শাসকের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের নতুন ভাষা হিসেবে যুক্তি দাঁড় করিয়েছেন। কিন্তু যত যুক্তিই দেয়া হোক না কেন, কোনো সভ্য সমাজ অশ্লীলতাকে অনুমোদন দিতে পারে না। মনে রাখতে হবে, মিছিল ও ¯ে¬াগানের সঙ্গে জনরুচির সম্পর্ক রয়েছে। প্রতিটা দেশের মানুষের একটা সামাজিক ও নৈতিক মূল্যবোধ থাকে। ইউরোপে যে পোশাক কিংবা কথা বলার ক্ষেত্রে যে ধরনের স্ল্যাং স্বাভাবিক, বাংলাদেশে সেটি স্বাভাবিক নাও হতে পারে। ইউরোপে-আমেরিকার অনুকরণ করে আমাদের তরুণরা অনেক কিছুই বলার চেষ্টা করেন। ইন্টারনেট ও সোশ্যাল মিডিয়া পুরো পৃথিবীতে আঙুলস্পর্শ দূরত্বে নিয়ে এসেছে। কিন্তু তারপরও প্রতিটা দেশ আলাদা, দেশের ভেতরে প্রতিটা সমাজ আলাদা। মূল্যবোধ, শিক্ষা ও জনরুচি মাথায় না রেখে কিছু বলা ও করার ভেতরে কোনো কৃতিত্ব নেই। বাস্তবতা হলো, অভ্যুত্থানের সময়ে স্লোগান, বক্তৃতা এবং দেয়াল লিখনে যে অশ্লীলতা, গালাগাল ও বিষোদ্গার প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে, সেখান থেকে দেশের মানুষের, বিশেষ করে সোশ্যাল মিডিয়ার মুক্তি মেলেনি। বরং অভ্যুত্থানের প্রায় দুই বছর পরেও পরস্পরকে আক্রমণের ভাষা হিসেবে ওইসব শব্দ ব্যবহৃত হচ্ছে। পরিতাপের বিষয় হলো, এই শব্দগুলো শুধুমাত্র অশিক্ষিক, আধা শিক্ষিত বা রাজনৈতিক কর্মীই নয়, শিক্ষিত সমাজেরও ভেতরেও ঢুকে গেছে। অথচ যারা ফেসবুকের মতো প্ল্যাটফর্মে এসব লিখছেন, তাদের প্রত্যেকেরই পরিবার আছে। তাদের সন্তান আছে। বাবা মা আছে। এইসব অশ্লীলতা তাদেরও চোখ এড়িয়ে যাওয়ার কথা নয়। আরও পরিতাপের বিষয়, যারা জুলাই অভ্যুত্থানের সামনের সারিতে ছিলেন, অভ্যুত্থানের সময় যারা জাতীয় বীরে পরিণত হয়েছিলেন, তাদেরও অনেকে বক্তৃতার সময় এমন সব শব্দ ব্যবহার করেছেন, এমন ভাষা ও ভঙ্গিতে কথা বলেছেন বা এখনও বলেন, যা তাদের ভেতরকার প্রতিহিংসাপরায়ণ চেহারাটিই উন্মোচন করে দেয়। যে বৈষম্যহীন বাংলাদেশ এবং সংস্কার ও পরিবর্তনের প্রত্যাশা নিয়ে সাধারণ মানুষ জুলাই অভ্যুত্থানকে সমর্থন দিয়েছিল, রাস্তায় নেমে এসেছিল, সোশ্যাল মিডিয়ায় পরস্পরকে আক্রমণ করে এইসব অশ্লীলতা ও বিষোদ্গার দেখে তারা নিশ্চয়ই এখন হতাশ বোধ করছেন। আওয়ামী লীগের আমলে সরকারের সমালোচক বা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে যেভাবে রাজাকার, বিএনপি-জামায়াত এমনকি জঙ্গি তকমা দেয়া হয়েছে, একইভাবে এখন সোশ্যাল মিডিয়ায় কারো কোনো বক্তব্য অন্তর্বর্তী সরকার বা তাদের অংশীজনদের সমালোচনামূলক হলে তাকে বলা হচ্ছে স্বৈরাচারের দোসর বা আওয়ামী লীগের দালাল। সামাজিক, রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় যেকোনো বিষয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় কিছু লিখলে বা মন্তব্য করলে সাথে সাথে সেখানে দুটি পক্ষ দাঁড়িয়ে যাচ্ছে। যেকোনো লেখা বা মন্তব্যকে কোনো একটি পক্ষে ঠেলে দেয়া হচ্ছে। অর্থাৎ হয় ওই লেখক বা মন্তব্যকারী জুলাইয়ের পক্ষের না হয় ফ্যাসিস্টের দোসর। তার মানে নির্মোহভাবে কেউ কিছু আর লিখতে পারবেন না। রাজনৈতিক অবস্থানের বাইরে গিয়ে নিতান্তই দেশ ও মানুষের পক্ষে কেউ কোনো মন্তব্য করতে পারবেন না? প্রতিটি বক্তব্যকেই জুলাইয়ের পক্ষে না হয় বিপক্ষে ট্যাগ দিতে হবে? অভ্যুত্থানপূর্ব বাংলাদেশে সরকারের যেকোনো সমালোচনাকে বিএনপি-জামায়াত-রাজাকারের কাজ বলে চিহ্নিত করা হতো। উন্নয়ন প্রকল্পের সমালোচনা করলেও তাকে উন্নয়নবিরোধী, সরকারবিরোধী এমনকি রাষ্ট্রবিরোধী বলে তকমা দেয়া হতো। এখনও সেই একইভাবে ফ্যাসিস্ট, ফ্যাসিস্টের দোসর, সুশীল লীগ ইত্যাদি তকমা দেয়া হয়। এর কারণ হলো এই যে, প্রত্যেকেই চায় পৃথিবীর সকল মানুষ তার মতো করে ভাববে, বলবে ও লিখবে। কিন্তু তা তো হয় না। প্রত্যেকের চিন্তা, মত ও মতবাদ, আদর্শ, ভাষা ও বলার ভঙ্গি আলাদা। এটিই চিরন্তন সত্য এবং মানবজাতির এই বৈচির্ত্যই তাকে অন্য প্রাণিদের সঙ্গে আলাদা করেছে। সুতরাং একই বিষয়ে দশজন মানুষের দেখা, বলা ও লেখার ভঙ্গি যদি দশরকমেরও হয়, সেটিও অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু তার এই বলা ও লেখার কারণে কোনো একটি রাজনৈতিক দলে ঠেলে দেয়াটা বিপজ্জনক। আওয়ামী লীগের আমলে কাউকে রাজাকার বলে গালি দিলে বা তকমা দিলে একজন দলনিরপেক্ষ মানুষের জন্য সেটি যে ধরনের সামাজিক এমনকি রাজনৈতিক বিপদ ডেকে আনতো, একইভাবে এখন কাউকে আওয়ামী লীগ, লীগের দোসর বা ফ্যাসিবাদী বলে তকমা দিলে একইরকমের বিপদের শঙ্কা তৈরি হয়। বিশেষ করে যাদের কোনো রাজনৈতিক পরিচয় নেই। যারা সরাসরি কোনো দলের কর্মী নন। অবস্থাদৃষ্টে অনেক সময় মনে হয়, ফেসবুক বোধ হয় শুধুই এখন গালিগালাজের প্ল্যাটফর্ম। সেইসাথে অতীতের ট্যাগিংয়ের সংস্কৃতি এখন আরও ভয়াবহ। শুধু তাই নয়, কারো ফেসবুক পোস্ট পছন্দ না সম্মিলিতভাবে ওই পোস্ট এমনকি ওই ফেসবুক আইডির বিরুদ্ধে রিপোর্ট করে সেটি রিম্যুভ করে দেয়া হচ্ছে। অর্থাৎ একদিকে অশ্লীলতা, গালাগাল, বিষোদ্গার, অন্যদিকে ভিন্ন বা বিরুদ্ধ মত দমনের জন্য চূড়ান্ত পদক্ষেপ গ্রহণ। একটি রক্তক্ষয়ী অভ্যুত্থানের পরেও কেন সত্যিই একটি নতুন বাংলাদেশের যাত্রা শুরু হলো না, বরং মানুষে মানুষে বিভাজন আরও বাড়লো; কেন সোশ্যাল হারমোনি নষ্ট হয়ে গেলো; কেন ভিন্ন মত ও ভিন্ন চিন্তার মানুষমাত্রই তাকে শত্রুজ্ঞান করে তাকে নির্মূলের সংস্কৃতি গড়ে উঠলো - সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে সমাজের শুভবুদ্ধিস¤পন্ন মানুষদেরকেই। অসভ্যতা, অশ্লীলতা, গালাগাল, বিষোদ্গার এবং নির্মূলের রাজনীতির কাছে দেশ ও দেশের মানুষ পরাজিত হতে পারে না। আমীন আল রশীদ: সাংবাদিক ও লেখক।

নিউজটি আপডেট করেছেন : SunamKantha

কমেন্ট বক্স