হাওর বিষয়ক পৃথক মন্ত্রণালয় : আর কত অপেক্ষা?
- আপলোড সময় : ২৮-০৬-২০২৬ ০৯:৪৩:১৭ পূর্বাহ্ন
- আপডেট সময় : ২৮-০৬-২০২৬ ০৯:৪৩:১৭ পূর্বাহ্ন
বিস্তীর্ণ হাওরাঞ্চল শুধু একটি জলাভূমি নয়; এটি দেশের খাদ্য নিরাপত্তা, মৎস্যসম্পদ, জীববৈচিত্র্য এবং গ্রামীণ অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি। প্রতিবছর দেশের খাদ্য ভা-ারে যে বিপুল পরিমাণ ধান যুক্ত হয়, তার একটি বড় অংশ আসে হাওরাঞ্চল থেকে। অথচ এই গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলটি এখনও সমন্বিত ও কার্যকর প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনার অভাবে নানা সংকটে জর্জরিত।
সম্প্রতি সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সুনামগঞ্জ জেলা কমিটির উদ্যোগে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে হাওর বিষয়ক পৃথক মন্ত্রণালয় গঠনের দাবি আবারও জোরালোভাবে উত্থাপিত হয়েছে। এটি নতুন কোনো দাবি নয়। গত দুই দশকে বিভিন্ন সময়ে হাওর গবেষক, পরিবেশবিদ, নাগরিক সংগঠন, জনপ্রতিনিধি এবং হাওরবাসী একই দাবি জানিয়ে আসছেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, আজও সেই দাবি বাস্তবায়নের পথে কার্যকর কোনো অগ্রগতি দৃশ্যমান নয়।
হাওরাঞ্চলের সমস্যা বহুমাত্রিক। আগাম বন্যা, পাহাড়ি ঢল, নদী ও খাল ভরাট, অপরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণ, ফসল রক্ষা বাঁধের দুর্বলতা, জলমহাল ব্যবস্থাপনার জটিলতা, পরিবেশগত অবক্ষয় এবং জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব প্রতিবছর এ অঞ্চলের মানুষের জীবন ও জীবিকাকে হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। এসব সমস্যা মোকাবিলায় বর্তমানে একাধিক মন্ত্রণালয় ও সরকারি সংস্থা কাজ করলেও তাদের মধ্যে প্রয়োজনীয় সমন্বয়ের ঘাটতি রয়েছে। ফলে পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে দীর্ঘসূত্রতা, দায়িত্বহীনতা এবং জবাবদিহিতার সংকট তৈরি হয়।
হাওর উন্নয়ন বোর্ড, পানি উন্নয়ন বোর্ড, মৎস্য অধিদপ্তর, কৃষি বিভাগ, পরিবেশ অধিদপ্তরসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম অনেক সময় একে অপরের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয় না। এর ফলে উন্নয়ন প্রকল্পের কাক্সিক্ষত সুফল জনগণের কাছে পৌঁছায় না। একটি পৃথক হাওর বিষয়ক মন্ত্রণালয় গঠিত হলে এই বিচ্ছিন্ন কার্যক্রমগুলোকে একটি সমন্বিত কাঠামোর আওতায় আনা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে গবেষণা, পরিকল্পনা, বাজেট ব্যবস্থাপনা এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে গতিশীলতা আসবে।
অনেকে মনে করেন, নতুন মন্ত্রণালয় গঠন মানেই অতিরিক্ত প্রশাসনিক ব্যয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, প্রতিবছর হাওরে ফসলহানি, অব্যবস্থাপনা এবং দুর্নীতির কারণে যে বিপুল অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়, তার তুলনায় একটি বিশেষায়িত মন্ত্রণালয়ের ব্যয় কতটুকু? দেশের খাদ্য নিরাপত্তার অন্যতম প্রধান উৎসকে রক্ষা করতে প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে তোলা কোনো বিলাসিতা নয়; বরং এটি সময়ের দাবি।
হাওরকে কেন্দ্র করে জাতীয় পর্যায়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণের বিকল্প নেই। টাঙ্গুয়ার হাওরসহ গুরুত্বপূর্ণ জলাভূমি সংরক্ষণ, বিজ্ঞানভিত্তিক পানি ব্যবস্থাপনা, প্রকৃত জেলেদের অধিকার নিশ্চিতকরণ, জলবায়ু সহনশীল কৃষি ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং স্বাস্থ্য ও যোগাযোগ অবকাঠামোর উন্নয়নে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নে একটি পৃথক মন্ত্রণালয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
সরকারের কাছে আমাদের প্রত্যাশা, হাওরবাসীর দীর্ঘদিনের এই যৌক্তিক দাবিকে আর উপেক্ষা করা হবে না। শুধু প্রতিশ্রুতি বা আলোচনা নয়, এবার প্রয়োজন বাস্তব পদক্ষেপ। কারণ হাওর রক্ষা মানে শুধু একটি অঞ্চলকে রক্ষা করা নয়; এটি দেশের খাদ্য নিরাপত্তা, পরিবেশগত ভারসাম্য এবং ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে সুরক্ষিত করার প্রশ্ন।
প্রকৃতপক্ষে, হাওর বিষয়ক পৃথক মন্ত্রণালয় গঠনের দাবি আজ আর কোনো আঞ্চলিক দাবি নয়; এটি জাতীয় স্বার্থের দাবি। সেই দাবি বাস্তবায়নে সরকারকে দ্রুত ও কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।
নিউজটি আপডেট করেছেন : SunamKantha
কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদকীয়