সুনামগঞ্জ , শনিবার, ১৩ জুন ২০২৬ , ২৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
প্রস্তাবিত বাজেট অধিক ঋণনির্ভর, অবাস্তবায়নযোগ্য ও লুটপাটের : জামায়াত সুবিপ্রবি উপাচার্যের অপসারণ দাবিতে ১০ দিনের আল্টিমেটাম কারা নির্যাতিত নেতাকর্মীদের নিয়ে টাঙ্গুয়ার হাওরে এমপি কামরুলের আনন্দ ভ্রমণ কালো টাকা সাদা করার সুযোগ নেই, ভুল বোঝাবুঝি হয়েছে : এনবিআর চেয়ারম্যান হাঁটু সমান কাদা, চলাচলে চরম দুর্ভোগ : পশ্চিম টিলাগাঁও সড়ক সংস্কারের দাবি হাসপাতাল থেকে চুরি হওয়া নবজাতক উদ্ধার, দম্পতি আটক ফ্যামিলি কার্ড কার্যক্রম বাস্তবায়নে দোয়ারাবাজারে গণশুনানি হাওরের জন্য জলবায়ু খাতে ১,২০০ কোটি টাকা, ফিরছে টাঙ্গুয়ার সহব্যবস্থাপনা প্রকল্প শাহজালাল (র.) ও শাহপরাণ (র.) মাজারের আয়ের টাকা কোথায় যায়, হিসেব চাইলো জেলা প্রশাসন হাওরাঞ্চলের জন্য ২,৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ, কোন খাতে কত দাম বাড়তে পারে, কমতে পারে যেসব পণ্য ও সেবার ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট প্রস্তাব ইউরোপগামী পথে মৃত্যু থামছে না, পাঁচ মাসেই প্রাণহানি ১৩০০ ছাড়াল কালো টাকা সাদা করার সুযোগ থাকছে, উৎস নিয়ে প্রশ্ন তোলা যাবে না ন্যায়বিচারের দাবি বাদীর, হয়রানির অভিযোগ এলাকাবাসীর বিশ্বম্ভরপুরে অবৈধ জাল জব্দ, আগুনে পুড়িয়ে ধ্বংস সুবিপ্রবি’র ভিসি অপসারণ ও স্থায়ী ক্যাম্পাস সদর উপজেলায় বাস্তবায়নের দাবি নির্যাতিত ৬ শতাধিক নেতাকর্মী নিয়ে আজ হাওরে আনন্দভ্রমণে যাচ্ছেন এমপি কামরুল আদ্-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিল পুশ-ইন ও সীমান্ত হত্যা ইস্যুতে মাঠে নামছে ১১ দল

খাল খননের ইতিহাস এবং বাংলাদেশ

  • আপলোড সময় : ১৩-০৬-২০২৬ ১২:০৭:২৮ পূর্বাহ্ন
  • আপডেট সময় : ১৩-০৬-২০২৬ ১২:০৮:০১ পূর্বাহ্ন
খাল খননের ইতিহাস এবং বাংলাদেশ
মোহাম্মদ আব্দুল হক::
স্বাধীন বাংলাদেশের রাজনীতিতে বহু রকম উন্নয়ন প্রকল্প বা কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছে এবং সময়ে এসব প্রকল্পের অনেকগুলোই সফল হয়েছে এবং অনেক প্রকল্প জনমানুষের জন্য পরিপূর্ণ সফলতা বয়ে আনতে পারেনি। বিভিন্ন সময় বিভিন্ন সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প পরবর্তীতে রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের সাথে সাথে দেশের ভৌগোলিক ও জলবায়ু বিবেচনায় গুরুত্বপূর্ণ কি-না সেটা যাচাই-বাছাই না-করেই থামিয়ে দেয়া হয়েছে বা আর এগোয়নি। এখানে আলোচনায় বৈশ্বিক জলবায়ু ও বাংলাদেশের ভৌগোলিক বাস্তবতায় খাল খনন কর্মসূচি। তবে খাল খননের গুরুত্ব বুঝতে আমাদেরকে মানব সভ্যতার বিবর্তনের কথা স্মরণ করে অতীত থেকে ঘুরে আসতে হবে। অবশ্যই এই আলোচনা শেষ হবে এতো এতো টাকা খরচ করে বাংলাদেশে খাল খনন আসলে কতোটা জরুরি কিংবা আদৌ এর প্রয়োজন আছে কি-না সে বিষয়টি মাথায় রেখে। যদিও বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে বর্তমান সরকারের যাত্রার শুরু থেকেই রাজনীতির মাঠে খাল খনন সর্বাধিক আলোচিত কর্মসূচিগুলোর একটি, তারপরও এমনটি শুধু বাংলাদেশের জন্য নয়, বরং বিশ্ব রাজনীতির আলোচনার দাবি রাখে। খাল খনন বা কৃত্রিম জলপথ তৈরির ইতিহাস মানব সভ্যতার বিবর্তনের ক্রম ধারাবাহিকতার সাথে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। ইতিহাস খুঁজে পাওয়া যায় - মানুষ প্রাচীনকাল থেকেই ভূ-প্রকৃতির জলপ্রবাহ ঠিক রাখতে খাল পুনঃখনন বা ভূ-প্রকৃতির পরিবর্তন ঘটিয়ে নতুন নতুন খাল খনন করে আসছে কৃষি, যোগাযোগ এবং প্রতিরক্ষার প্রয়োজনে। সংক্ষিপ্ত ইতিহাস : খাল খননের ইতিহাস কয়েক হাজার বছরের পুরোনো। প্রাচীন যুগে মেসোপটেমিয়া ও মিশর: ইতিহাসবিদদের মতে, খ্রিস্টপূর্ব ৪০০০ বছর আগে মেসোপটেমিয়া অর্থাৎ বর্তমান ইরাক এবং মিশরে সেচ কাজের জন্য প্রথম খাল খনন শুরু হয়েছিল। তখন নীল নদের পানি কৃষিজমিতে নেওয়ার জন্য প্রাচীন মিশরীয়রা অত্যন্ত দক্ষতার সাথে এ কাজ করেছিলো। প্রাচীন চীনের দিকে তাকিয়ে দেখি, বিশ্বের দীর্ঘতম প্রাচীন খাল হলো চীনের ‘গ্র্যান্ড ক্যানেল’, যার নির্মাণ কাজ খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতাব্দীতে শুরু হয়েছিলো এবং এটি বেইজিং ও হ্যাংজু শহরকে যুক্ত করেছিলো। একটু এগিয়ে দেখি মধ্যযুগে ইউরোপে বাণিজ্যের প্রসারের সাথে সাথে খালের গুরুত্ব উপলব্ধি করে এবং ১১০০ থেকে ১৩০০ খ্রীষ্টিয় সালে নেদারল্যান্ডস ও ইতালিতে অনেক খাল খনন করা হয়। জানা যায়, ওই সময় জলপথের সমতা রক্ষার জন্য ‘লক গেট’ প্রযুক্তির উদ্ভাবন করা হয়। আরেকটু এগিয়ে পাই আধুনিক যুগে যখন শিল্প বিপ্লবের সময়, তখন খনি থেকে কয়লা এবং অন্যান্য ভারী পণ্য সহজে জলপথে এক স্থান থেকে বিভিন্ন স্থানে পরিবহনের জন্য খালের প্রয়োজন দেখা দেয় এবং তখন ব্যাপকভাবে খাল খনন বৃদ্ধি পায়। বহুল আলোচিত সুয়েজ খাল (১৮৬৯): লোহিত সাগর ও ভূমধ্যসাগরকে যুক্ত করে এই খাল এশিয়া ও ইউরোপের মধ্যকার দূরত্ব হাজার হাজার কিলোমিটার কমিয়ে দিয়েছে। পানামা খাল (১৯১৪): ঐতিহাসিক এই খাল আটলান্টিক ও প্রশান্ত মহাসাগরকে যুক্ত করার ফলে বিশ্ব বাণিজ্যে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এসেছে। এখন দেখা যাক বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে খাল খননের গুরুত্ব কতোটুকু। একটি দেশের অর্থনীতি এবং পরিবেশ রক্ষায় খালের ভূমিকা অপরিসীম। কয়েকটি প্রধান বিষয় তুলে ধরা যায়। প্রথমত কৃষি ও সেচ ব্যবস্থা: এখানে শুষ্ক মৌসুমে জমিতে পানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে খাল প্রধান উৎস হিসেবে ভূমিকা পালন করতে পারে। এ উদ্যোগ যদি সঠিক পরিকল্পনা অনুযায়ী গ্রহণ করা হয়, তবে তা ফসল উৎপাদন বৃদ্ধি এবং খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে। এছাড়া দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে লবণাক্ততা রোধে মিষ্টি পানির প্রবাহ বজায় রাখতে খালের ভূমিকা অপরিসীম। দ্বিতীয়ত পণ্য ও যাত্রী পরিবহন: আমাদের দেশের জলপথ সেটি নদীপথ বা খালপথ হোক, তা সবচেয়ে সাশ্রয়ী পরিবহন মাধ্যম। গবেষকদের গবেষণা থেকে উঠে এসেছে ভারী মালামাল কম খরচে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে নিতে বাংলাদেশে খালের চেয়ে সহজ বিকল্প হয় না। কোথাও দেখা যায় নদীতে দীর্ঘ বাঁক আছে। সেক্ষেত্রে প্রয়োজনে নদীর বাঁক কমিয়ে দূরত্ব কমানোর জন্য বা দুটি নদীর সংযোগ ঘটানোর জন্যও খাল খনন করার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। এতে আঞ্চলিক বাণিজ্যে গতি আসতে পারে। তৃতীয়ত বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও পানি নিষ্কাশন: এখানে নিচু এলাকা বাংলাদেশে বর্ষাকালে অতিরিক্ত বৃষ্টির পানি দ্রুত সরিয়ে নিয়ে ব্যাপক জনপদকে বন্যার হাত থেকে রক্ষা করতে বহু খালকে ড্রেনেজ সিস্টেম হিসেবে কাজে লাগানো যেতে পারে। সিলেট ও সুনামগঞ্জ অঞ্চলের হাওরগুলোর ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য রক্ষায় খাল এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বর্ষায় হাওরের পানি বের করে দেওয়া এবং শুষ্ক মৌসুমে পানি ধরে রেখে মাছের অভয়াশ্রম তৈরির জন্য এসব এলাকায় খাল খনন এবং পুনঃখনন জরুরি। চতুর্থত মৎস্য চাষ: বাংলাদেশের মানুষের খাদ্য তালিকার শীর্ষে মাছ। খালগুলো প্রাকৃতিকভাবে মাছের প্রজনন ক্ষেত্র এবং আবাসস্থল। গ্রাম প্রধান বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতিতে মৎস্য স¤পদের যোগান দিতেও খালের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। পঞ্চমত পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা: খাল ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর ধরে রাখতে সাহায্য করে এবং এতে স্থানীয় জলবায়ু শীতল থাকে। এছাড়া এটি জীববৈচিত্র্য রক্ষায় সহায়ক ভূমিকা পালন করে। ষষ্ঠত পর্যটন ও বিনোদন: বর্তমান বিশ্বে অনেক শহরের সৌন্দর্য বর্ধন ও পর্যটন আকর্ষণ হিসেবে খালকে ব্যবহার করা হচ্ছে, যেমন: ভেনিস বা আমস্টারডাম। এদেশে এদিকে গুরুত্ব দিলে পর্যটন আরও সমৃদ্ধ হবে। উপর্যুক্ত আলোচনায় দেখা যায় খাল খনন বা খাল পুনঃখনন একটি দেশের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তবে প্রয়োজন সঠিক পর্যবেক্ষণ ও সঠিক উদ্যোগ অব্যাহত রাখা। কারণ, খালের সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ এবং পুনঃখনন না-করলে পলি জমে তা ভরাট হয়ে যায়, যার ফলে পানির প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয় এবং তাতে পরিবেশগত বিপর্যয় নেমে আসে। তাই টেকসই উন্নয়নের জন্য খাল খনন এবং খাল সংরক্ষণ করা অত্যন্ত জরুরি। বাংলাদেশে রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপি ও এর প্রতিষ্ঠাতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দর্শনের অন্যতম প্রধান অংশ ছিলো ‘খাল খনন কর্মসূচি’। এটি মূলত বিংশ শতাব্দীর ১৯৮০-এর দশকের শেষভাগে শুরু হওয়া একটি গণমুখী আন্দোলন, যা বাংলাদেশের কৃষি খাতে উৎপাদন বৃদ্ধি এবং গ্রামীণ অর্থনীতি পুনর্গঠনে বিশেষ ভূমিকা রেখেছিলো। ১৯৭৬ খ্রীষ্টিয় সালের ১ নভেম্বর যশোরের শার্শা উপজেলার উলশী গ্রাম থেকে জিয়াউর রহমান এই আন্দোলনের সূচনা করেছিলেন। তৎকালীন বিএনপি’র এই কর্মসূচি কেবল মাটি কাটার কাজ ছিলো না, এটি ছিলো একটি সামগ্রিক অর্থনৈতিক সংস্কারের অংশ। এতে শুষ্ক মৌসুমে ধান চাষ (বোরো) এবং বহুমুখী ফসল উৎপাদনে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসে। দীর্ঘদিন পরে বর্তমানে দেখা গেছে ২০২৬ খ্রীষ্টিয় সালে ক্ষমতায় এসে বিএনপি তাদের রাজনৈতিক ইশতেহারে এই কর্মসূচিকে পুনরায় গুরুত্ব দিয়েছে। ইতিমধ্যে সিলেট বিভাগসহ সারা দেশে খাল খনন কর্মসূচি শুরু করেছেন বর্তমান সরকার। মূলকথা, প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের খাল খনন কর্মসূচি ছিলো বাংলাদেশের প্রথম দিকের একটি সফল স্থানীয় উন্নয়ন মডেল, যা বিদেশি ঋণের পরিবর্তে জনশক্তিকে পুঁজি করে অর্থনৈতিক মুক্তির স্বপ্ন দেখিয়েছিলো। বঙ্গোপসাগরের কোলে মেঘালয় পাহাড়ের পাদদেশে পললভূমি বাংলাদেশ একটি বদ্বীপ অঞ্চল হওয়ার কারণে এখানকার ভৌগোলিক ও জলবায়ুর প্রেক্ষাপটে খাল খনন কেবল এখন শুধু প্রয়োজনীয়ই নয়, বরং অপরিহার্য। এখানে অসংখ্য নদ-নদী বিধৌত এই দেশে জালের মতো ছড়িয়ে থাকা খালগুলো মূলত নদী ও বিলের মধ্যে সংযোগ রক্ষা করে চলেছে এবং বাংলাদেশের ভূ-প্রকৃতিকে প্রাণবন্ত ও সচল রেখে চলেছে। ইতিমধ্যে আমাদের বহু খাল ও বহু নদী অযতেœ ও অবহেলায় ভরাট হয়ে গেছে গ্রাম ও শহরে এবং বহু খাল দখল হয়ে আছে। এতে করে পানি প্রবাহ স্বাভাবিক গতিতে চলতে না-পারায়, প্রতি বছর অল্প বৃষ্টির জলে ও পাহাড়ি ঢলে ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, মৌলভীবাজার, সুনামগঞ্জ জেলা শহরসহ দেশের বিভিন্ন গ্রাম তলিয়ে যায়, ফসল তলিয়ে যায়। মানুষের স্বাভাবিক জীবনের গতিতে ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে নেমে আসে বিপর্যয়। বারবার চক্রাকারে ফিরে ফিরে আসা এসব বিপদ থেকে মুক্তি পেতে হারিয়ে যাওয়া বা দখল হয়ে যাওয়া খাল পুনরুদ্ধার করা ও সঠিক পরিকল্পনায় খাল খনন ও পুনঃখননের গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে কাজ করতে হবে।
[লেখক : মোহাম্মদ আব্দুল হক, কলামিস্ট ও কথাসাহিত্যিক]

নিউজটি আপডেট করেছেন : SunamKantha

কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ
সুবিপ্রবি উপাচার্যের অপসারণ দাবিতে ১০ দিনের আল্টিমেটাম

সুবিপ্রবি উপাচার্যের অপসারণ দাবিতে ১০ দিনের আল্টিমেটাম