শহীদনূর আহমেদ::
কোনো ধরনের প্রণোদনা বা বিকল্প সহায়তা ছাড়াই হাওরাঞ্চলে এক মাসের জন্য মাছ আহরণে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। মাছের প্রজনন মৌসুম বিবেচনায় গত ২৮ মে থেকে আগামী ২৬ জুন পর্যন্ত জেলার হাওর, নদ-নদী ও প্রাকৃতিক জলাশয়ে সব ধরনের মাছ ধরা নিষিদ্ধ করেছে মৎস্য বিভাগ। তবে চলতি বোরো মৌসুমে অতিবৃষ্টিতে ফসল হারানোর পর এই নিষেধাজ্ঞা জেলেদের জীবিকায় নতুন সংকট তৈরি করেছে। পেটের দায়ে অনেকেই বাধ্য হয়ে নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে হাওরে মাছ ধরতে যাচ্ছেন। “মাছ আর ধান, হাওরাঞ্চলের প্রাণ” - এই প্রবাদে দীর্ঘদিন ধরে পরিচিত হাওরের রাজধানী খ্যাত সুনামগঞ্জ। কৃষিনির্ভর এ জনপদের মানুষের জন্য মাছ ধরা শুধু পেশা নয়, বর্ষা মৌসুমে এটি গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প জীবিকার উৎসও। নিবন্ধিত জেলেদের পাশাপাশি কৃষক, দিনমজুর ও অন্যান্য পেশার মানুষও বর্ষাকালে মাছ ধরে পরিবারের চাহিদা পূরণ করেন। কিন্তু এবারের বোরো মৌসুমে অতিবৃষ্টি ও আগাম বন্যার কারণে অনেক কৃষক ফসল হারিয়েছেন। ফলে মাছ আহরণই হয়ে উঠেছে তাদের একমাত্র ভরসা। এ অবস্থায় মাছের প্রজনন ও দেশীয় প্রজাতির সংরক্ষণের লক্ষ্যে মাসব্যাপী নিষেধাজ্ঞা জারি করে মৎস্য অধিদপ্তর। নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নে হাওরাঞ্চলে মাইকিং, প্রচারণা এবং ভ্রাম্যমাণ অভিযানের মাধ্যমে আইন প্রয়োগ করা হচ্ছে। তবে কোনো ধরনের প্রণোদনা বা খাদ্য সহায়তা না থাকায় ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেছেন জেলেরা। সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার লক্ষণশ্রী ইউনিয়নের ইসলামপুর গ্রামের কাওসার আলম ভূইয়া বলেন, বোরো মৌসুমে আমরা ধান হারাইছি। এখন জাল বাইয়া বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে সংসার চালাইতাম। মাছ না ধরলে চলমু কীভাবে? সরকার যদি সাহায্য করত, তাহলে মাছ ধরা থেকে বিরত থাকতে পারতাম। কোনো উপায় নাই, মাছ ধরতেই হইব। জেলেরা জানান, ফসলহানির পর হাওরের মাছই তাদের জীবিকার প্রধান অবলম্বন। সরকারি সহায়তা ছাড়া নিষেধাজ্ঞা মেনে চলা তাদের পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না। তাই জীবিকার তাগিদেই অনেকে মাছ ধরতে বাধ্য হচ্ছেন। আরেক জেলে আবুল কালাম বলেন, ইলিশ ধরা বন্ধ করলে সরকার চাল-ডাল দেয়। কিন্তু হাওরে মাছ ধরা বন্ধ করা হইছে, অথচ কোনো সহায়তা নাই। মাছ ধরা বন্ধ রাখলে আমরা বাঁচমু কীভাবে? পেটের দায়ে হাওরে যাইতেই হইব। হাওরাঞ্চলের মানুষের দাবি, মাছের প্রজনন রক্ষায় নিষেধাজ্ঞা প্রয়োজন হলেও এ সময়ে জেলেদের জন্য খাদ্য সহায়তা বা প্রণোদনার ব্যবস্থা করা জরুরি। অন্যথায় জীবিকার তাগিদে অনেকেই নিষেধাজ্ঞা অমান্য করতে বাধ্য হবেন, যা একদিকে আইন প্রয়োগকে কঠিন করবে, অন্যদিকে সংরক্ষণ কার্যক্রমের লক্ষ্যও ব্যাহত হতে পারে। পরিবেশ ও হাওর উন্নয়ন সংস্থার সভাপতি কাসমির রেজা বলেন, হাওরে একমাস মাছ ধরা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানাই। কিন্তু এই এক মাস জেলেরা খাবে কি? উপকূলের মতো হাওরের জেলেদের এই এক মাস আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হোক। জেলা মৎস্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, সুনামগঞ্জে প্রায় ৯০ হাজার নিবন্ধিত জেলেসহ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার মানুষ মাছ আহরণের সঙ্গে জড়িত। এ ছাড়া বর্ষা মৌসুমে কৃষিসহ বিভিন্ন পেশার মানুষও মাছ ধরে থাকেন।
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা ড. আল মিনান নূর বলেন, হাওরে শুধু জেলেরা নয়, বিভিন্ন পেশার মানুষ মাছ ধরেন। কেউ জীবিকার জন্য, কেউ পারিবারিক চাহিদা পূরণের জন্য মাছ আহরণ করেন। দেশীয় মাছের উৎপাদন বৃদ্ধি ও প্রজনন নিশ্চিত করতে আমরা প্রচারণা চালাচ্ছি এবং নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছি। তবে প্রণোদনা না থাকায় নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করতে কিছুটা বেগ পেতে হচ্ছে। নিবন্ধিত জেলেদের জন্য সরকারি সহায়তার বিষয়ে মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। তবে এ ব্যাপারে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত পাওয়া যায়নি।
নিউজটি আপডেট করেছেন : SunamKantha
প্রণোদনা ছাড়াই হাওরে মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞা, বিপাকে লক্ষাধিক জেলে
- আপলোড সময় : ১০-০৬-২০২৬ ১০:৩৯:১৭ অপরাহ্ন
- আপডেট সময় : ১০-০৬-২০২৬ ১০:৪০:০৭ অপরাহ্ন
কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ

স্টাফ রিপোর্টার, দৈনিক সুনামকণ্ঠ