কালনী নদী বাঁচাতে এখনই উদ্যোগ জরুরি

আপলোড সময় : ০২-০৬-২০২৬ ০১:১৭:৪২ পূর্বাহ্ন , আপডেট সময় : ০২-০৬-২০২৬ ০১:১৭:৪২ পূর্বাহ্ন
ভাটিবাংলার জীবন, সংস্কৃতি ও ইতিহাসের সঙ্গে কালনী নদীর সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। বাউল সম্রাট শাহ আবদুল করিম-এর গান, স্মৃতি ও সাহিত্যজুড়ে যে নদী বারবার ফিরে এসেছে, সেই কালনী আজ দূষণের ভয়াবহ থাবায় বিপন্ন। একসময় যে নদী ছিল মানুষের জীবিকা, যোগাযোগ, মৎস্যস¤পদ ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের উৎস, বর্তমানে তা ধীরে ধীরে প্লাস্টিক বর্জ্যের ভাগাড়ে পরিণত হচ্ছে। সাম্প্রতিক গবেষণায় উঠে আসা তথ্য শুধু উদ্বেগজনক নয়, বরং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও সমাজের জন্য একটি স্পষ্ট সতর্কবার্তা। সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের পরিচালিত গবেষণায় দেখা গেছে, কালনী নদীর পানি ব্যবহারকারী নদীপারের প্রায় ৬৫ শতাংশ মানুষ বিভিন্ন ধরনের চর্মরোগে আক্রান্ত। নদীর বিভিন্ন অংশে প্লাস্টিক বর্জ্যের ব্যাপক উপস্থিতি, পানির গুণগত মানের অবনতি এবং স্বাস্থ্যঝুঁকির এই চিত্র অত্যন্ত উদ্বেগজনক। প্লাস্টিক দূষণ যে কেবল পরিবেশগত সমস্যা নয়, এটি জনস্বাস্থ্য সংকটেও রূপ নিচ্ছে- গবেষণার ফলাফল সেই বাস্তবতাই সামনে এনেছে। দুঃখজনক হলেও সত্য, নদীর তীরে গড়ে ওঠা হাট-বাজার, বসতিপূর্ণ এলাকা এবং বিভিন্ন মানবিক কর্মকা- থেকে প্রতিনিয়ত পলিথিন, প্লাস্টিক বোতল ও কঠিন বর্জ্য সরাসরি নদীতে ফেলা হচ্ছে। অপরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং পরিবেশবিষয়ক সচেতনতার অভাব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। নদীতে জমে থাকা এসব প্লাস্টিক ধীরে ধীরে মাইক্রোপ্লাস্টিকে পরিণত হয়ে মাছ ও অন্যান্য জলজ প্রাণীর দেহে প্রবেশ করছে। এর মাধ্যমে দূষণ খাদ্যশৃঙ্খলে প্রবেশ করে মানুষের স্বাস্থ্যকেও হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। আমরা মনে করি, কালনী নদী শুধু একটি নদী নয়; এটি উত্তর-পূর্বাঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবেশগত স¤পদ। নদীটির সঙ্গে জড়িয়ে আছে হাজারো মানুষের জীবিকা, কৃষি, মৎস্যসম্পদ এবং হাওরাঞ্চলের পরিবেশগত ভারসাম্য। নদীর এই অবক্ষয় অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে এর প্রভাব আরও ভয়াবহ হবে। মাছের উৎপাদন কমবে, জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং নদীনির্ভর জনগোষ্ঠীর জীবন-জীবিকা হুমকির মুখে পড়বে। এ অবস্থায় দায় এড়ানোর সুযোগ কারও নেই। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, পরিবেশ অধিদপ্তর, জেলা প্রশাসন, পানি উন্নয়ন বোর্ড এবং সংশ্লিষ্ট সব সংস্থাকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। নদীতীরে কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। বাজার ও জনবসতিপূর্ণ এলাকায় পর্যাপ্ত ডাস্টবিন স্থাপন, বর্জ্য সংগ্রহ ও পুনর্ব্যবহার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে নদীতে বর্জ্য ফেলা বন্ধে কঠোর নজরদারি ও আইন প্রয়োগ প্রয়োজন। জনসচেতনতাও এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রকৃতপ্রস্তাবে নদী রক্ষার দায়িত্ব শুধু সরকারের নয়; স্থানীয় জনগণ, ব্যবসায়ী, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সামাজিক সংগঠনগুলোকেও এগিয়ে আসতে হবে। পরিবেশ রক্ষার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে না পারলে কোনো উদ্যোগই দীর্ঘস্থায়ী হবে না। কালনী নদীকে বাঁচানো মানে শুধু একটি নদীকে রক্ষা করা নয়; এটি একটি অঞ্চল, একটি সংস্কৃতি এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জীবন-নিরাপত্তাকে রক্ষা করা। সময় থাকতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে একদিন হয়তো কালনী শুধু গান ও স্মৃতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ হয়ে যাবে। সেই অনাকাক্সিক্ষত পরিণতি এড়াতে এখনই উদ্যোগ নিতে হবে। নদী বাঁচলে প্রকৃতি বাঁচবে, মানুষ বাঁচবে, বাঁচবে ভাটিবাংলার ঐতিহ্য।

সম্পাদকীয় :

  • সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি : মো. জিয়াউল হক
  • সম্পাদক ও প্রকাশক : বিজন সেন রায়
  • বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : মোক্তারপাড়া রোড, সুনামগঞ্জ-৩০০০।

অফিস :

  • ই-মেইল : [email protected]
  • ওয়েবসাইট : www.sunamkantha.com