সঞ্চিতা চৌধুরী::>
দিপালী চক্রবর্তী এমন একটি নাম, যার সঙ্গে জড়িয়ে আছে নারীমুক্তির মধ্য দিয়ে পরিবার-সমাজ পরিবর্তনের পথনির্দেশ। তিনি চাইতেন নারীর ক্ষমতায়ন ও আত্মনির্ভরশীলতা, যা নিজের জীবন দিয়ে উদাহরণ সৃষ্টি করে গেছেন। জীবনের শেষদিন পর্যন্ত তিনি এই ধারাবাহিকতা থেকে বিচ্যুত হননি। এই মানুষটি তাঁর কাজ ও চিন্তার অপূর্ব সমন্বয় ঘটিয়েছেন নিজের জীবনে। যা মানুষ হিসেবে সমাজ পরিবারকে গড়ে তোলার জন্য অপরিহার্য। তিনি ছিলেন প্রথমে গৃহিণী। পরিবারকে গুছিয়ে রান্না-বান্না করে স্বামী, ছয় সন্তানকে সযতনে মানুষ করে তাদেরকে সুপ্রতিষ্ঠিত করে গড়ে তুলেছিলেন। লেখা-পড়া, গান-বাজনা প্রতিটি বিষয়েই ছেলে-মেয়েদেরকে তৈরি করে তুলে নিজেকে সামাজিক কাজ-কর্মে নিয়োজিত করেছিলেন।
তিনি ছিলেন একজন নিবেদিত প্রাণ সংগঠক। আমার মনে আছে, স্বাধীনতা সংগ্রামের পরে সরকার থেকে গরিব জনসাধারণের সাহায্যের জন্য ডেগ-ডেকচিসহ বিভিন্ন জিনিসপত্র পাঠানো হয়েছিল। সেগুলো নিয়ে দিদি, রাখাল দা ও আমাকে সঙ্গে নিয়ে পলাশে প্রয়াত অবনী চক্রবর্তীর বাড়িতে গিয়ে গ্রামের মানুষের মাঝে বিলিবণ্টন করেছেন। দিপালী চক্রবর্তী খুব সহজ-সরল এবং একজন ব্যক্তিত্বশীল নারী ছিলেন। দিদি ছিলেন আমাদের মামাতো বোন। প্রয়াত স্বনামধন্য এডভোকেট বরদা বাবু ছিলেন দিদির জেঠু। এই সূত্রে আমরা বড়মামার বাসায় যাতায়াত করতাম। দিদিও মামার বাসায় আসতেন। আমরা খুবই আনন্দ-ফুর্তি করতাম। যদিও আমি তখন ছোট ছিলাম। আমার বড়বোন যখন সুনামগঞ্জ কলেজে পড়তে আসে তখন দিদিই তাকে তাঁর বাসায় থেকে কলেজে পড়তে বলেন। আমার বড়বোন সংহিতা চৌধুরী যখন দিদির বাসায় থেকে পড়াশোনা করতো, তখন লক্ষ করতো দিদির পড়াশোনার আগ্রহটা খুব বেশি। আমার বোন দিদির উৎসাহ দেখে দিদিকে (দিপালী চক্রবর্তী) বলল- তুমি পরীক্ষাটা দিয়ে দাও। কিন্তু তিনি একটু ইতস্তত করতেন, কারণ ছেলে-মেয়ে দু’জন তখন কলেজে পড়তো। তা সত্ত্বেও দিদিকে আমার বড়বোন (সংহিতা চৌধুরী) বুঝিয়ে কলেজে ভর্তি করিয়েছেন। দিদির অদম্য চেষ্টায় তিনি কৃতকার্য হন।
দিপালী চক্রবর্তী সত্যিই একজন আদর্শের প্রতীক ছিলেন। কলেজে পড়াকালীন তিনি ছাত্র রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। তিনি ছাত্র ইউনিয়নের একজন নিষ্ঠাবান কর্মী ছিলেন। তিনি একজন সাহসী নেত্রী ছিলেন। একবার ছাত্র ইউনিয়নের অগ্নিকন্যা মতিয়া চৌধুরী সম্ভবত শাল্লা যাবার প্রোগ্রাম ছিল। তিনি সুনামগঞ্জ মিনু ভাইয়ের বাসাতে এসে দিদিসহ অন্যান্যদেরকে সঙ্গে নিয়ে প্রোগ্রামে যাবেন। কিন্তু হঠাৎ করেই অন্য একটা কাজের জন্য অগ্নিকন্যা মতিয়া চৌধুরী আসতে পারলেন না। যারা প্রোগ্রাম করবে তারাও সব গোছগাছ করে প্রস্তুত। এবার কি হবে? সবাই চিন্তিত। তখনই দিদি অন্যান্যদেরকে আশ্বস্ত করে বললেন- “তোমরা ভেবো না, আমি একটি সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আমিই মতিয়া চৌধুরী হয়ে প্রোগ্রাম সফল করে আসবো।” যে কথা সেই কাজ। পরদিন মতিয়া চৌধুরীর মতো সে প্রোগ্রাম সফল করে আসেন দিপালী চক্রবর্তী। বক্তৃতায় তিনি অত্যন্ত দক্ষতা ও যোগ্যতার পরিচয় দিয়েছিলেন সেদিন। সবাই দিদির উচ্চ প্রশংসা করতে লাগল। দিপালী চক্রবর্তী বিশ্বাস করতেন সকলের ঐক্যবদ্ধ ও ঐকান্তিক প্রচেষ্টা থাকলে সব কাজেই সফলতা অর্জন করা যায়।
তিনি বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি হিসেবে কাজ করে গেছেন। তিনি যে একজন অসীম সাহসী নেত্রী ছিলেন, তাঁর এই কথাগুলো না লিখলেই নয়। তিনি শোষিত-লাঞ্ছিত-বঞ্চিত মানুষের ও অবহেলিত নারী সমাজের শোষণমুক্তি তথা মানবমুক্তির আদর্শ গ্রহণ করেছিলেন। একবার তিনি খুবই অসুস্থ। তখনই খবর এসেছে রৌয়াইল গ্রামে একটি মেয়েকে এসিড নিক্ষেপ করা হয়েছে। এসিড দগ্ধ মেয়ের পিতার তার মেয়ের বিচারপ্রার্থী। দিদি সিদ্ধান্ত নিলেন ঐ গ্রামে তিনি যাবেন। উনার ছেলেরা নিষেধ করছে, আমরাও নিষেধ করছি কিন্তু তিনি যাবেনই। কেউ তাঁকে দমাতে পারেনি। শেষ পর্যন্ত তিনি গেলেন এবং সার্বিক পরিস্থিতি দেখে পত্রিকাতে সমস্ত ঘটনা ব্যাখ্যা করে আমার দেশ পত্রিকার সাংবাদিককে দিলেন। এমনভাবে আরও অনেক নারী নির্যাতনের ঘটনা প্রতিরোধ করেছেন। অসহায় নারীর পাশে দাঁড়িয়ে অসীম সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছেন। তিনি নারীর অধিকার, নারী-পুরুষের বৈষম্য দূর করে সমতা প্রতিষ্ঠার জন্য আন্দোলন চালিয়ে গেছেন।
প্রতিটি কাজে তিনি আন্তরিক ছিলেন। তাঁর কর্মময় জীবনের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাই।
দিপালী চক্রবর্তী এমন একটি নাম, যার সঙ্গে জড়িয়ে আছে নারীমুক্তির মধ্য দিয়ে পরিবার-সমাজ পরিবর্তনের পথনির্দেশ। তিনি চাইতেন নারীর ক্ষমতায়ন ও আত্মনির্ভরশীলতা, যা নিজের জীবন দিয়ে উদাহরণ সৃষ্টি করে গেছেন। জীবনের শেষদিন পর্যন্ত তিনি এই ধারাবাহিকতা থেকে বিচ্যুত হননি। এই মানুষটি তাঁর কাজ ও চিন্তার অপূর্ব সমন্বয় ঘটিয়েছেন নিজের জীবনে। যা মানুষ হিসেবে সমাজ পরিবারকে গড়ে তোলার জন্য অপরিহার্য। তিনি ছিলেন প্রথমে গৃহিণী। পরিবারকে গুছিয়ে রান্না-বান্না করে স্বামী, ছয় সন্তানকে সযতনে মানুষ করে তাদেরকে সুপ্রতিষ্ঠিত করে গড়ে তুলেছিলেন। লেখা-পড়া, গান-বাজনা প্রতিটি বিষয়েই ছেলে-মেয়েদেরকে তৈরি করে তুলে নিজেকে সামাজিক কাজ-কর্মে নিয়োজিত করেছিলেন।
তিনি ছিলেন একজন নিবেদিত প্রাণ সংগঠক। আমার মনে আছে, স্বাধীনতা সংগ্রামের পরে সরকার থেকে গরিব জনসাধারণের সাহায্যের জন্য ডেগ-ডেকচিসহ বিভিন্ন জিনিসপত্র পাঠানো হয়েছিল। সেগুলো নিয়ে দিদি, রাখাল দা ও আমাকে সঙ্গে নিয়ে পলাশে প্রয়াত অবনী চক্রবর্তীর বাড়িতে গিয়ে গ্রামের মানুষের মাঝে বিলিবণ্টন করেছেন। দিপালী চক্রবর্তী খুব সহজ-সরল এবং একজন ব্যক্তিত্বশীল নারী ছিলেন। দিদি ছিলেন আমাদের মামাতো বোন। প্রয়াত স্বনামধন্য এডভোকেট বরদা বাবু ছিলেন দিদির জেঠু। এই সূত্রে আমরা বড়মামার বাসায় যাতায়াত করতাম। দিদিও মামার বাসায় আসতেন। আমরা খুবই আনন্দ-ফুর্তি করতাম। যদিও আমি তখন ছোট ছিলাম। আমার বড়বোন যখন সুনামগঞ্জ কলেজে পড়তে আসে তখন দিদিই তাকে তাঁর বাসায় থেকে কলেজে পড়তে বলেন। আমার বড়বোন সংহিতা চৌধুরী যখন দিদির বাসায় থেকে পড়াশোনা করতো, তখন লক্ষ করতো দিদির পড়াশোনার আগ্রহটা খুব বেশি। আমার বোন দিদির উৎসাহ দেখে দিদিকে (দিপালী চক্রবর্তী) বলল- তুমি পরীক্ষাটা দিয়ে দাও। কিন্তু তিনি একটু ইতস্তত করতেন, কারণ ছেলে-মেয়ে দু’জন তখন কলেজে পড়তো। তা সত্ত্বেও দিদিকে আমার বড়বোন (সংহিতা চৌধুরী) বুঝিয়ে কলেজে ভর্তি করিয়েছেন। দিদির অদম্য চেষ্টায় তিনি কৃতকার্য হন।
দিপালী চক্রবর্তী সত্যিই একজন আদর্শের প্রতীক ছিলেন। কলেজে পড়াকালীন তিনি ছাত্র রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। তিনি ছাত্র ইউনিয়নের একজন নিষ্ঠাবান কর্মী ছিলেন। তিনি একজন সাহসী নেত্রী ছিলেন। একবার ছাত্র ইউনিয়নের অগ্নিকন্যা মতিয়া চৌধুরী সম্ভবত শাল্লা যাবার প্রোগ্রাম ছিল। তিনি সুনামগঞ্জ মিনু ভাইয়ের বাসাতে এসে দিদিসহ অন্যান্যদেরকে সঙ্গে নিয়ে প্রোগ্রামে যাবেন। কিন্তু হঠাৎ করেই অন্য একটা কাজের জন্য অগ্নিকন্যা মতিয়া চৌধুরী আসতে পারলেন না। যারা প্রোগ্রাম করবে তারাও সব গোছগাছ করে প্রস্তুত। এবার কি হবে? সবাই চিন্তিত। তখনই দিদি অন্যান্যদেরকে আশ্বস্ত করে বললেন- “তোমরা ভেবো না, আমি একটি সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আমিই মতিয়া চৌধুরী হয়ে প্রোগ্রাম সফল করে আসবো।” যে কথা সেই কাজ। পরদিন মতিয়া চৌধুরীর মতো সে প্রোগ্রাম সফল করে আসেন দিপালী চক্রবর্তী। বক্তৃতায় তিনি অত্যন্ত দক্ষতা ও যোগ্যতার পরিচয় দিয়েছিলেন সেদিন। সবাই দিদির উচ্চ প্রশংসা করতে লাগল। দিপালী চক্রবর্তী বিশ্বাস করতেন সকলের ঐক্যবদ্ধ ও ঐকান্তিক প্রচেষ্টা থাকলে সব কাজেই সফলতা অর্জন করা যায়।
তিনি বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি হিসেবে কাজ করে গেছেন। তিনি যে একজন অসীম সাহসী নেত্রী ছিলেন, তাঁর এই কথাগুলো না লিখলেই নয়। তিনি শোষিত-লাঞ্ছিত-বঞ্চিত মানুষের ও অবহেলিত নারী সমাজের শোষণমুক্তি তথা মানবমুক্তির আদর্শ গ্রহণ করেছিলেন। একবার তিনি খুবই অসুস্থ। তখনই খবর এসেছে রৌয়াইল গ্রামে একটি মেয়েকে এসিড নিক্ষেপ করা হয়েছে। এসিড দগ্ধ মেয়ের পিতার তার মেয়ের বিচারপ্রার্থী। দিদি সিদ্ধান্ত নিলেন ঐ গ্রামে তিনি যাবেন। উনার ছেলেরা নিষেধ করছে, আমরাও নিষেধ করছি কিন্তু তিনি যাবেনই। কেউ তাঁকে দমাতে পারেনি। শেষ পর্যন্ত তিনি গেলেন এবং সার্বিক পরিস্থিতি দেখে পত্রিকাতে সমস্ত ঘটনা ব্যাখ্যা করে আমার দেশ পত্রিকার সাংবাদিককে দিলেন। এমনভাবে আরও অনেক নারী নির্যাতনের ঘটনা প্রতিরোধ করেছেন। অসহায় নারীর পাশে দাঁড়িয়ে অসীম সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছেন। তিনি নারীর অধিকার, নারী-পুরুষের বৈষম্য দূর করে সমতা প্রতিষ্ঠার জন্য আন্দোলন চালিয়ে গেছেন।
প্রতিটি কাজে তিনি আন্তরিক ছিলেন। তাঁর কর্মময় জীবনের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাই।