হাওরে ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তা

তালিকায় অনিয়ম-স্বজনপ্রীতি, ক্ষোভ কৃষকের

আপলোড সময় : ২৬-০৫-২০২৬ ১০:৩৩:৫২ পূর্বাহ্ন , আপডেট সময় : ২৬-০৫-২০২৬ ১০:৩৪:৫৮ পূর্বাহ্ন
বিশ্বজিত রায়::
একদিন পরেই পবিত্র ঈদুল আজহা। অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলের কারণে সুনামগঞ্জের লক্ষাধিক কৃষকের বোরো ধান নষ্ট হওয়ায় ফিকে হয়ে গেছে ঈদ আনন্দ। টেনেটুনে কেউ খোরাক বাঁচাতে পারলেও বড় ধরনের ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন প্রায় লক্ষাধিক কৃষক। সরকার ক্ষতিগ্রস্তদের চাল ও নগদ অর্থ সহায়তার ঘোষণা দিলেও তা নিয়ে অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতি শুরু হয়েছে। হাওর নিয়ে কাজ করা লোকজন ও কৃষকের অভিযোগ, ক্ষতিগ্রস্ত তালিকায় ঠাঁই পেয়েছে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও নেতাকর্মীদের নিকটাত্মীয়সহ পরিচিতজনের নাম। জমিজমা না করেই শুধু সম্পর্কের খাতিরে তালিকায় নাম উঠেছে বেশির ভাগ মানুষের। স্বজনপ্রীতির কারণে অধিকাংশ ক্ষেত্রে বাদ পড়েছে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকেরা। এ নিয়ে লুকোচুরি আছে স্থানীয় প্রশাসন, কৃষি বিভাগ ও ইউনিয়ন পরিষদের লোকজনের মাঝে। সুনামগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এবার বোরো মৌসুমে ছোট-বড় ১৯৩টি হাওরে ২ লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে ২ লাখ ৩ হাজার ৯৭ হেক্টর জমির ধান কাটা হয়েছে। এ পর্যন্ত ৯০ দশমিক ৮৭ শতাংশ জমির ধান কেটেছে কৃষক। কর্তনের বাকি ৯ দশমিক ১৩ শতাংশ অর্থাৎ ১৬ হাজার ৭৮৬ হেক্টর জমি পানিতে তলিয়ে নষ্ট হয়েছে দাবি কৃষি বিভাগের। কৃষি বিভাগের মতে, জেলায় বোরো চাষী প্রায় ৪ লাখ। এর মধ্যে কার্ডধারী কৃষক ৩ লাখ ৬৫ হাজার ৭৭৭ জন এবং ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষক ২ লাখ ২৩ হাজার ৮০৭ জন রয়েছেন। এদের অধিকাংশই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে দাবি কৃষক ও হাওর আন্দোলনের নেতাদের। তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, সুনামগঞ্জে জলাবদ্ধতায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের তালিকা প্রস্তুত করা হয় ১ লাখ ২৯ হাজার ৫৫৯ জনের। এ তালিকায় সুনামগঞ্জ সদর উপজেলায় ৯ হাজার ২৫৯, শান্তিগঞ্জে ৫ হাজার ৪০৫, দোয়ারাবাজারে ২ হাজার ৭৯, বিশ্বম্ভরপুরে ৫ হাজার ৭৩১, জগন্নাথপুরে ৭ হাজার ২০৫, জামালগঞ্জে ১০ হাজার ২০৬, তাহিরপুরে ১৮ হাজার ৩১৭, ধর্মপাশায় ২৫ হাজার ৪০৯, ছাতকে ২ হাজার ১৮৭, দিরাইয়ে ২৩ হাজার ৫১১ ও শাল্লা উপজেলায় ২০ হাজার ২৫০ জনের নাম ছিল। প্রশাসন সূত্রে জানাযায়, ১ লাখ ২৯ হাজার ৫৫৯ জনের ক্ষতিগ্রস্ত তালিকা থেকে সহায়তার জন্য চূড়ান্ত হয়েছে ৬৪ হাজার ৩৮৪ জন কৃষক। প্রতিজনকে ৩ হাজার টাকা ও ১৫ কেজি করে চাল তিন মাস দেওয়া হবে। বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার ফতেপুর ইউনিয়নের রাধানগর গ্রামের কৃষক রাসেল আহমদ বলেন, প্রায় দুই হাল (২৪ কিয়ার) জমি করছি। কয়েক কিয়ার তলাইছে। কিছু জমি আধাআধি কাটছি, নষ্ট হইছে অনেকতাই। তারপরও আমরা ক্ষতিগ্রস্ত না। যারা মোটরসাইকেল চালায়, বাজারে জমা তুলে, জমিজমা করছে না তারা কৃষক। মেম্বারের সাথে মিল থাকায় তাদের নাম উঠছে তালিকায়। প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত অনেকেই বাদ পড়ছে। মধ্যনগর উপজেলার উত্তর বংশীকুন্ডা ইউনিয়নের রূপনগর গ্রামের কৃষক নরকুল ইসলাম বলেন, টাঙ্গুয়ার হাওরের আশেপাশে যারা জমি করছে তারা ক্ষতিগ্রস্ত হইছে। অনেক গ্রাম আছে টাঙ্গুয়ার হাওরে জমিজমা নাই। এই গ্রামের মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয় নাই, কিন্তু তাদের নাম আছে। মেম্বার-চেয়ারম্যানদের ঘনিষ্ঠজনরা সরকারি-বেসরকারি সব অনুদানই পাইতাছে। কোন কিছুতেই আমরার নাম নাই। সুনামগঞ্জ হাওর বাঁচাও আন্দোলন কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক বিজন সেন রায় বলেন, ক্ষতিগ্রস্তদের বাদ দিয়ে জমিজমা করেনি তাদের নাম যুক্ত হয়েছে সরকারি প্রণোদনার তালিকায়। অনৈতিক প্রভাব বিস্তারের মাধ্যমে এরকমটা করা হচ্ছে। যারা অন্যের জমি বর্গা চাষ করেছে তাদের নাম নেই। আবার যারা জমি করেনি তারা তালিকাভুক্ত। প্রভাবমুক্ত থেকে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের অনুদান দেওয়ার দাবি জানাচ্ছি। তাহিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মেহেদী হাসান মানিক বলেন, তাহিরপুরে ৯ হাজার ১৫৯ জন কৃষক সহায়তা পাবেন। ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিজন ৩ হাজার টাকা ও ১৫ কেজি করে চাল তিন মাস পাবে। আগে ক্যাটাগরি ছিল, এখন এক ক্যাটাগরিতে সবাই পাবেন। আগামীকাল (মঙ্গলবার) থেকে শুরু হবে এ কার্যক্রম। তালিকা প্রণয়নে কোন অভিযোগ নেই। তবে ক্ষতিগ্রস্ত কেউ বাদ পড়লে সেটা বিবেচনা করা হবে। তালিকা প্রণয়নে অনিয়মের অভিযোগ আছে, তবে কেউ লিখিত অভিযোগ করেনি উল্লেখ করে সুনামগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. মতিউর রহমান খান বলেন, আমরা স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সুপারিশক্রমে তালিকা করার নির্দেশনা পেয়েছি। সে অনুযায়ী ১ লাখ ২৯ হাজার ৫৫৯ জনের তালিকা পাঠানো হয়েছে। এর মধ্যে ৬৪ হাজার ৩৮৪ জনের তালিকা অনুমোদিত হয়েছে। কোন কোন উপজেলার দু’একটা করে ইউনিয়নে অনুদান প্রদানের কার্যক্রম শুরু হয়েছে।

সম্পাদকীয় :

  • সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি : মো. জিয়াউল হক
  • সম্পাদক ও প্রকাশক : বিজন সেন রায়
  • বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : মোক্তারপাড়া রোড, সুনামগঞ্জ-৩০০০।

অফিস :

  • ই-মেইল : [email protected]
  • ওয়েবসাইট : www.sunamkantha.com