স্টাফ রিপোর্টার:
পবিত্র ঈদুল আজহার আর মাত্র একদিন বাকি। অথচ সুনামগঞ্জের কোরবানির পশুর হাটগুলোতে এখনো জমেনি বেচাকেনা। হাটে পশুর সরবরাহ তুলনামূলক কম, আর ছোট ও মাঝারি আকারের ষাঁড় গরুর দাম চড়া হওয়ায় বিপাকে পড়েছেন মধ্যবিত্ত ক্রেতারা। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এবারের হাওর ডুবি ও বৈশাখী ফসলহানির সরাসরি প্রভাব পড়েছে কোরবানির হাটে।
সোমবার বিকেলে সুনামগঞ্জ শহরের প্রধান পশুর হাট সরকারি জুবিলী উচ্চ বিদ্যালয় মাঠ ঘুরে দেখা যায়, অন্য বছরের তুলনায় এবার পশুর সংখ্যা কম। ক্রেতাদের উপস্থিতি থাকলেও প্রত্যাশিত বেচাকেনা হয়নি। অনেকেই হাট ঘুরে দরদাম করে ফিরে যাচ্ছেন। বিশেষ করে বড় গরুর তুলনায় ছোট ও মাঝারি পশুর চাহিদা বেশি দেখা গেছে।
ক্রেতাদের অভিযোগ, বিক্রেতারা এবার পশুর দাম অতিরিক্ত হাঁকাচ্ছেন। ফলে সাধ্যের মধ্যে পশু কিনতে এক হাট থেকে আরেক হাটে ঘুরছেন তারা। অন্যদিকে খামারি ও ব্যবসায়ীদের দাবি, গো-খাদ্য, শ্রমিকের মজুরি, বিদ্যুৎ বিল ও পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ায় বেশি দামে পশু বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন তারা।
হাটে গরু দেখতে আসা আইনজীবী সুমেল আহমদ বলেন, ৭০-৮০ হাজার টাকায় ছোট গরুও মিলছে না। গত বছর যে গরু ৬০-৭০ হাজার টাকায় পাওয়া গেছে, এবার তার দাম চাওয়া হচ্ছে ৯০ হাজার থেকে এক লাখ টাকা।
সুনামগঞ্জ চেম্বার অব কমার্সের পরিচালক সেলিম আহমদ বলেন, হাওরে ফসলহানির কারণে মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো আর্থিকভাবে চাপে আছে। যারা প্রতি বছর কোরবানি দিতেন, তারাও এবার হিমশিম খাচ্ছেন। হাটে ছোট ও মাঝারি গরুর দাম বেশি, আবার পশুও কম উঠেছে।
সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার সুরমা ইউনিয়নের কৃষ্ণনগর থেকে পাঁচটি ষাঁড় নিয়ে আসা খামারি আবু মিয়া বলেন, আমার সবচেয়ে বড় ষাঁড়ের দাম চাচ্ছি পাঁচ লাখ টাকা। সাড়ে চার লাখ হলে ছেড়ে দেব। এখন সবকিছুর দাম বেড়েছে। তিন-চার বছর গরু লালনপালন করে যদি লাভ না হয়, তাহলে টিকে থাকা কঠিন।
সরকারি জুবিলী উচ্চ বিদ্যালয় পশুর হাটের ইজারাদার আমির হোসেন বলেন, এখনো আশানুরূপ গরু আসেনি। মানুষ সাধারণত শেষ দিকে গরু কিনতে চায়। তাই শেষ মুহূর্তে হাট জমে উঠবে বলে আশা করছি।
এদিকে দিরাই উপজেলার পশুর হাটগুলোতেও একই চিত্র দেখা গেছে। স্থানীয়দের মতে, বৈশাখী ফসলহানির কারণে হাওরপাড়ের মানুষের মধ্যে ঈদের আমেজ কমে গেছে। বড় গরুর বিক্রি কমে ছোট ও মাঝারি পশুর দিকে ঝুঁকছেন ক্রেতারা।
দিরাইয়ের সমাজকর্মী সৈদুর রহমান তালুকদার বলেন, গত বছর ঈদের আগে হাটে মানুষের উপচে পড়া ভিড় ছিল। এবার সেই চিত্র নেই। হাওরপাড়ের ৯০ শতাংশ মানুষের জীবিকা বৈশাখী ধানের ওপর নির্ভরশীল। ফসল হারিয়ে কৃষকরা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন।
চাপতি হাওরপাড়ের কৃষক জাকির হোসেন বলেন, দুই হাল জমির মধ্যে মাত্র পাঁচ-ছয় কেয়ার ধান কাটতে পেরেছি। বাকিটা পানিতে তলিয়ে গেছে। কোরবানি তো দূরের কথা, ঋণ শোধ আর সংসার চালানো নিয়েই এখন চিন্তায় আছি।
হাটে আসা বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ জানান, যেসব পরিবারে প্রবাসী সদস্য রয়েছেন এবং তারা কোরবানির জন্য টাকা পাঠিয়েছেন, মূলত তারাই এবার স্বাচ্ছন্দ্যে পশু কিনতে পারছেন। কৃষিনির্ভর পরিবারগুলোর বড় একটি অংশ কোরবানি দেওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তায় রয়েছেন।
জেলা প্রাণিস¤পদ অফিস সূত্রে জানা গেছে, সুনামগঞ্জের ১২ উপজেলায় ২৬টি স্থায়ী পশুর হাট রয়েছে। ঈদ উপলক্ষে আরও ৩৪টি অস্থায়ী হাট বসেছে। জেলার কৃষক ও খামারিদের মাধ্যমে প্রায় ৫৩ হাজার পশু কোরবানির জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে। চাহিদা পূরণের পরও প্রায় তিন হাজার পশু উদ্বৃত্ত থাকবে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট দপ্তর।
জেলা প্রাণিস¤পদ কর্মকর্তা ডা. রফিকুল ইসলাম বলেন, জেলায় কোরবানির পশুর কোনো ঘাটতি নেই। স্থায়ী ও অস্থায়ী হাটে বেচাকেনা শুরু হয়েছে। আমরা সার্বক্ষণিক বাজার মনিটরিং করছি, যাতে অসুস্থ বা অস্বাভাবিক পশু হাটে না ওঠে।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (মিডিয়া) রাকিবুল হাসান রাসেল বলেন, পশুর হাটে আইনশৃঙ্খলা স্বাভাবিক রাখা, জালনোট প্রতিরোধ এবং চুরি-ছিনতাইসহ অপরাধ দমনে গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করা হয়েছে।