সুরমা শুধু একটি নদীর নাম নয়; এটি সিলেট অঞ্চলের জীবন, সংস্কৃতি, অর্থনীতি ও পরিবেশের অবিচ্ছেদ্য অংশ। অথচ সেই প্রাণের নদী আজ ধীরে ধীরে সংকুচিত হয়ে পড়ছে। সাম্প্রতিক গবেষণায় উঠে এসেছে উদ্বেগজনক তথ্য- গত ৪৩ বছরে সুরমা নদীর গড় প্রস্থ কমেছে প্রায় ৪০ মিটার এবং একই সময়ে নদীতে পলি জমেছে ভাঙনের প্রায় দ্বিগুণ। এই পরিসংখ্যান কেবল একটি নদীর পরিবর্তনের চিত্র নয়, বরং এটি পুরো অঞ্চলের ভবিষ্যৎ পরিবেশগত বিপদের অশনিসংকেত।
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের গবেষণায় স্পষ্ট হয়েছে, নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হওয়া, অতিরিক্ত পলি জমা, অবৈধ দখল, অপরিকল্পিত স্থাপনা এবং নির্বিচারে বালু-পাথর উত্তোলনের কারণে সুরমা তার স্বাভাবিক গতিপথ হারাচ্ছে। নদীর তীর সরে যাচ্ছে, কোথাও ভাঙন বাড়ছে, কোথাও নতুন চর জেগে উঠছে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, নদীটি ক্রমেই আঁকাবাঁকা হয়ে প্রবাহ হারাচ্ছে। এটি ভবিষ্যতে ভয়াবহ বন্যা ও দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতার ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে তুলবে।
সিলেট অঞ্চলের মানুষ অতীতে কয়েকবার ভয়াবহ বন্যার অভিজ্ঞতা পেয়েছে। বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, সুরমার তলদেশে পলি জমা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে। কারণ নদীর নাব্যতা কমে গেলে অতিরিক্ত পানি ধারণের সক্ষমতাও কমে যায়। তখন অল্প সময়ের ভারী বর্ষণেও বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এতে কৃষি, নৌযোগাযোগ, মৎস্যসম্পদ, জীববৈচিত্র্য এবং মানুষের জীবন-জীবিকা মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়বে।
দুঃখজনক হলেও সত্য, নদী রক্ষার ক্ষেত্রে আমাদের উদ্যোগ এখনো বিচ্ছিন্ন ও অপরিকল্পিত। একদিকে নদী দখল করে স্থাপনা গড়ে উঠছে, অন্যদিকে অপরিকল্পিতভাবে বালু-পাথর উত্তোলনের কারণে নদীর স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। স্থানীয়ভাবে সচেতনতার অভাবও পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলছে। নদীকে আমরা প্রাকৃতিক সম্পদ হিসেবে যতটা গুরুত্ব দেওয়ার কথা, বাস্তবে তা দেওয়া হচ্ছে না।
এ অবস্থায় জরুরি ভিত্তিতে সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। প্রথমত, সুরমা নদীর অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। দ্বিতীয়ত, নিয়মিত বৈজ্ঞানিক ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে নদীর তলদেশ থেকে পলি অপসারণ করতে হবে। তৃতীয়ত, অবৈধ বালু-পাথর উত্তোলন বন্ধে কার্যকর নজরদারি ও আইনি ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি নদী সংরক্ষণে স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করে সচেতনতামূলক কার্যক্রম বাড়ানো প্রয়োজন।
আমরা মনে করি, নদী রক্ষা শুধু সরকারের একার দায়িত্ব নয়; এটি নাগরিক দায়িত্বও। সুরমা বাঁচলে সিলেটের পরিবেশ বাঁচবে, কৃষি বাঁচবে, জীববৈচিত্র্য বাঁচবে এবং মানুষের জীবন-জীবিকাও সুরক্ষিত থাকবে। তাই এখনই কার্যকর উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে আমাদের জবাবদিহি করতে হবে। সুরমাকে বাঁচানো মানেই পুরো সিলেট অঞ্চলকে বাঁচানো।