সুনামগঞ্জ পৌর শহরের নতুন হাছননগর এলাকার ঐতিহ্যবাহী সোনাখালী নদীর বর্তমান অবস্থা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। একসময় যে নদী ছিল এলাকার মানুষের জীবন-জীবিকা, যাতায়াত ও প্রাকৃতিক ভারসাম্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ, আজ তা কচুরিপানার দখলে মৃতপ্রায়। পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বন্ধ হয়ে নদীটি এখন পরিণত হয়েছে মশা-মাছি, দুর্গন্ধ ও বিষধর সাপের অভয়ারণ্যে। স্থানীয় মানুষের দুর্ভোগ দিন দিন বাড়ছে, অথচ কার্যকর উদ্যোগের অভাব পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলছে।
নদী শুধু একটি জলধারা নয়; এটি একটি অঞ্চলের প্রাণপ্রবাহ। সোনাখালী নদীকে ঘিরে একসময় গড়ে উঠেছিল স্থানীয় অর্থনীতি ও জনজীবনের নানা কার্যক্রম। মাছ ধরা, নৌযান চলাচল, কৃষিকাজ ও শ্রমনির্ভর জীবিকার সঙ্গে নদীটির ছিল নিবিড় সম্পর্ক। কিন্তু দীর্ঘদিনের অবহেলা, নিয়মিত খনন ও পরিষ্কার কার্যক্রমের অভাব, দখল এবং অপরিকল্পিত ব্যবস্থাপনার কারণে নদীটি আজ অস্তিত্ব সংকটে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, নদীর স্থির ও দূষিত পানিতে মশার বিস্তার ঘটছে। এতে ডেঙ্গু ও অন্যান্য রোগের ঝুঁকি বাড়ছে। পাশাপাশি কচুরিপানার ভেতর আশ্রয় নিচ্ছে বিষধর সাপ ও ক্ষতিকর প্রাণী। শিশু ও বয়স্কদের নিরাপত্তা নিয়ে স্থানীয়দের উদ্বেগ অমূলক নয়। এটি এখন শুধু পরিবেশগত সমস্যা নয়, বরং জনস্বাস্থ্য ও জননিরাপত্তার বিষয়েও পরিণত হয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ অনুযায়ী, অতীতে নিয়মিতভাবে নদী পরিষ্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হতো। ফলে নদীটি সচল ছিল এবং জনগণও উপকৃত হতো। কিন্তু বর্তমানে সেই কার্যক্রম বন্ধ থাকায় পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। প্রশাসনের দায়িত্বশীল মহলের উচিত দ্রুত বাস্তবসম্মত উদ্যোগ গ্রহণ করা।
আমরা মনে করি, সোনাখালী নদী রক্ষায় অবিলম্বে সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। প্রথমত, জরুরি ভিত্তিতে কচুরিপানা অপসারণ করে পানির প্রবাহ স্বাভাবিক করতে হবে। দ্বিতীয়ত, নদী খনন ও পুনরুদ্ধারের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। তৃতীয়ত, নদী রক্ষায় স্থানীয় জনগণ, জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। পাশাপাশি পরিবেশ সংরক্ষণে জনসচেতনতাও বাড়ানো জরুরি।
সুনামগঞ্জ হাওরাঞ্চলের প্রকৃতি ও ঐতিহ্যের সঙ্গে নদীর সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। একটি নদী হারিয়ে যাওয়া মানে শুধু একটি জলধারার মৃত্যু নয়, বরং একটি অঞ্চলের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও জীবিকার ক্ষয়। তাই সোনাখালী নদীকে বাঁচানো এখন সময়ের দাবি। প্রশাসনের দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপই পারে নদীটির প্রাণ ফিরিয়ে দিতে এবং স্থানীয় মানুষের দুর্ভোগ লাঘব করতে।