স্বাস্থ্যসেবা মানুষের মৌলিক অধিকার। একটি জেলা সদর হাসপাতাল কেবল চিকিৎসার কেন্দ্র নয়, এটি মানুষের শেষ আশ্রয়স্থলও বটে। সেখানে যদি ন্যূনতম নিরাপত্তা নিশ্চিত না থাকে, তবে তা শুধু অব্যবস্থাপনার পরিচয় নয়, বরং জনজীবনের জন্য বড় ধরনের হুমকিও। গত বৃহস্পতিবার দুপুরে সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালের লিফট বিকল হয়ে শিশুসহ প্রায় ১২ জন মানুষের ২৫ মিনিট আটকে থাকার ঘটনা অত্যন্ত উদ্বেগজনক এবং অমানবিক বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি।
আটতলা বিশিষ্ট হাসপাতালে প্রতিদিন শত শত রোগী, বয়স্ক মানুষ, গর্ভবতী নারী ও শিশুকে লিফট ব্যবহার করতে হয়। এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় দীর্ঘদিন ধরে লিফটের মোটর ও ইনভার্টারে সমস্যা থাকা, ভেতরের ফ্যান চুরি হয়ে যাওয়া এবং তবুও তা সচল না করা দায়িত্বে অবহেলার শামিল। সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হলো- লিফট আটকে গেলে ভেতরের আলো নিভে যাওয়া এবং বাতাস চলাচলের কোনো ব্যবস্থা না থাকা। এতে যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা কিংবা প্রাণহানির আশঙ্কা তৈরি হতে পারে।
এ ঘটনা নতুন নয়। দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে লিফট বিকল, রক্ষণাবেক্ষণের অভাব ও নিরাপত্তা সংকটের খবর প্রায়ই সামনে আসে। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সাময়িক মেরামত বা জোড়াতালি দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া হয়। দীর্ঘমেয়াদি সমাধান আর হয় না। ফলে রোগী ও স্বজনদের জীবন ঝুঁকির মধ্যেই থেকে যায়।
সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালের ঘটনাটি স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, হাসপাতালের অবকাঠামো ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের দুর্বলতা রয়েছে। একটি হাসপাতালের লিফট শুধু যান্ত্রিক সুবিধা নয়; এটি জরুরি চিকিৎসাসেবার অংশ। গুরুতর অসুস্থ রোগীকে দ্রুত একতলা থেকে আরেকতলায় নেওয়ার ক্ষেত্রে লিফটের বিকল্প নেই। সেখানে যদি লিফটই আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তবে স্বাস্থ্যসেবার মান নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
আমরা মনে করি, এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত হওয়া জরুরি। কেন দীর্ঘদিন ধরে সমস্যাগুলো সমাধান হয়নি, কেন নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়নি এবং দায়িত্বে কারা অবহেলা করেছেন - তা খতিয়ে দেখতে হবে। একই সঙ্গে অবিলম্বে হাসপাতালের দুটি লিফটের পূর্ণাঙ্গ কারিগরি পরীক্ষা ও আধুনিকায়নের উদ্যোগ নিতে হবে। লিফটের ভেতরে জরুরি অ্যালার্ম, পর্যাপ্ত বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা, বিকল্প বিদ্যুৎ সংযোগ এবং সার্বক্ষণিক প্রশিক্ষিত অপারেটর নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।
স্বাস্থ্যখাতে অব্যবস্থাপনা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। মানুষের জীবন নিয়ে অবহেলার সুযোগ নেই। সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালের লিফট-দুর্ঘটনার এই ঘটনা যেন আরেকটি বড় দুর্ঘটনার পূর্বাভাস হয়ে না দাঁড়ায় - সেই দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকেই নিতে হবে।