বাংলাদেশের সংবিধানে স্বাস্থ্যসেবাকে মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতায় দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষ এখনও ন্যূনতম চিকিৎসাসেবা থেকেও বঞ্চিত। বিশেষ করে হাওরাঞ্চল সুনামগঞ্জ জেলার স্বাস্থ্যখাতের বর্তমান চিত্র গভীর উদ্বেগজনক। জেলার স্বাস্থ্য বিভাগে অনুমোদিত ৮০৯ পদের মধ্যে ৪৩৬টি পদ শূন্য থাকা কেবল প্রশাসনিক দুর্বলতার পরিচয় নয়, এটি জনস্বাস্থ্যের জন্য এক বড় ধরনের সংকটের ইঙ্গিত বহন করে।
চিকিৎসক, নার্স, মেডিকেল টেকনোলজিস্ট ও ফার্মাসিস্টের ব্যাপক ঘাটতির কারণে জেলার ১১টি উপজেলায় স্বাস্থ্যসেবা কার্যত ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে। কোনো কোনো উপজেলায় অর্ধেকেরও বেশি চিকিৎসকের পদ শূন্য। দিরাই, ধর্মপাশা, শাল্লা, তাহিরপুর কিংবা বিশ্বম্ভরপুরের মতো দুর্গম হাওরাঞ্চলে এই সংকট আরও প্রকট। রোগীরা হাসপাতালে গিয়ে শুনছেন- ডাক্তার নেই, ওষুধ নেই, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করার লোক নেই। ফলে বাধ্য হয়ে অনেকেই ব্যয়বহুল বেসরকারি চিকিৎসার দিকে ঝুঁকছেন, আর দরিদ্র জনগোষ্ঠী চিকিৎসাবঞ্চিতই থেকে যাচ্ছে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এই সংকট নতুন নয়। দীর্ঘদিন ধরে জনবল সংকট চললেও কার্যকর ও স্থায়ী সমাধানের উদ্যোগ দৃশ্যমান নয়। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে স্থানীয় প্রশাসন বারবার বিষয়টি তুলে ধরলেও বাস্তব অগ্রগতি খুবই সীমিত। অথচ হাওরাঞ্চলের ভৌগোলিক বাস্তবতা বিবেচনায় এখানে স্বাস্থ্যসেবাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজন ছিল।
সুনামগঞ্জের মতো প্রত্যন্ত অঞ্চলে চিকিৎসকরা দীর্ঘদিন থাকতে চান না - এ বাস্তবতা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। যোগাযোগব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা, উন্নত নাগরিক সুবিধার অভাব, সন্তানদের শিক্ষা ও নিরাপদ আবাসনের সংকট - এসব কারণে অনেক চিকিৎসক বদলির চেষ্টা করেন বা অনুপস্থিত থাকেন। তাই শুধু নিয়োগ দিলেই হবে না; চিকিৎসকদের কর্মস্থলে ধরে রাখার মতো পরিবেশও নিশ্চিত করতে হবে। দুর্গম এলাকায় কর্মরতদের জন্য বিশেষ প্রণোদনা, আবাসন সুবিধা ও পদোন্নতিতে অগ্রাধিকার দেওয়া যেতে পারে।
একই সঙ্গে বিদ্যমান কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়মিত উপস্থিতি নিশ্চিত করাও জরুরি। অনেক ক্ষেত্রে নিয়োগপ্রাপ্ত জনবল কর্মস্থলে না থাকায় সংকট আরও তীব্র হয়। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে কার্যকর তদারকি, জবাবদিহি এবং ডিজিটাল উপস্থিতি মনিটরিং ব্যবস্থা চালু করা সময়ের দাবি।
স্বাস্থ্যখাতের সংকট কেবল একটি জেলার সমস্যা নয়; এটি সামগ্রিক উন্নয়ন ও মানবিক মর্যাদার প্রশ্ন। একজন কৃষক, দিনমজুর কিংবা হাওরপাড়ের সাধারণ মানুষ অসুস্থ হলে যদি ন্যূনতম চিকিৎসাও না পান, তবে উন্নয়নের বড় বড় পরিসংখ্যান তাদের জীবনে কোনো অর্থ বহন করে না।
অতএব, সুনামগঞ্জের স্বাস্থ্যখাতের এই ভয়াবহ জনবল সংকট নিরসনে জরুরি ভিত্তিতে পদক্ষেপ নিতে হবে। শূন্য পদে দ্রুত নিয়োগ, প্রয়োজনীয় ওষুধ ও যন্ত্রপাতি সরবরাহ, স্বাস্থ্যকর্মীদের কর্মস্থলে উপস্থিতি নিশ্চিত করা এবং হাওরাঞ্চলের জন্য বিশেষ স্বাস্থ্যনীতি গ্রহণ এখন সময়ের অপরিহার্য দাবি। অন্যথায় স্বাস্থ্যসেবার এই দুরবস্থা ভবিষ্যতে আরও ভয়াবহ মানবিক সংকটে রূপ নিতে পারে।