সুনামগঞ্জের ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট সদর হাসপাতালের চিত্র আজ এক ভয়াবহ বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। একটি জেলা সদর হাসপাতালের ৪৭২টি অনুমোদিত পদের মধ্যে ২১৭টি শূন্য থাকা শুধু প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়, এটি সরাসরি জনস্বাস্থ্যের প্রতি চরম অবহেলার উদাহরণ। চিকিৎসক, নার্স, মেডিকেল টেকনোলজিস্ট ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পদে দীর্ঘদিন ধরে নিয়োগ না হওয়ায় সাধারণ মানুষ ন্যূনতম চিকিৎসাসেবাও পাচ্ছেন না। প্রশ্ন হলো - একটি জেলার প্রধান সরকারি হাসপাতাল যদি এভাবে লোকবল সংকটে ধুঁকে পড়ে, তাহলে জনগণ কোথায় যাবে?
চিকিৎসকের ৭৪টি পদের মধ্যে মাত্র ২৮ জন কর্মরত থাকা কার্যত স্বাস্থ্যসেবাকে অচল করে দেওয়ার শামিল। রোগীদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের অভাবে রোগীদের সিলেটমুখী হতে হচ্ছে। দরিদ্র মানুষ, যারা সরকারি হাসপাতালের ওপর নির্ভরশীল, তারাই সবচেয়ে বেশি ভুক্তভোগী। একদিকে চিকিৎসক সংকট, অন্যদিকে নার্স ও পরিচ্ছন্নতাকর্মীর অভাবে হাসপাতালের পরিবেশও হয়ে উঠেছে অস্বাস্থ্যকর ও মানবেতর। এটি শুধু অব্যবস্থাপনা নয়, এটি মানুষের মৌলিক অধিকার নিয়ে নির্মম উপহাস।
আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, হাসপাতালজুড়ে সক্রিয় দালালচক্র। রোগীদের অসহায়ত্বকে পুঁজি করে একশ্রেণির অসাধু ব্যক্তি হাসপাতালকে যেন বাণিজ্যকেন্দ্রে পরিণত করেছে। রোগী ও স্বজনদের হয়রানি, চিকিৎসকদের সঙ্গে অসদাচরণ - এসব এখন নিত্যদিনের ঘটনা। প্রশাসনের নীরবতা এই দালালচক্রকে আরও বেপরোয়া করে তুলছে। স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার ভেতরে যদি অনিয়ম, বিশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তাহীনতা বাসা বাঁধে, তাহলে জনগণের আস্থা ফিরবে কীভাবে?
দুঃখজনক হলেও সত্য, বছরের পর বছর ধরে শূন্য পদ পূরণের দাবি জানানো হলেও দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ নেই। স্বাস্থ্যখাতের এই ভয়াবহ সংকট যেন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের চোখেই পড়ে না। অথচ হাসপাতাল শুধু একটি ভবন নয়; এটি মানুষের জীবনরক্ষার শেষ আশ্রয়স্থল। সেখানে জনবল না থাকা মানে অসংখ্য মানুষকে অনিশ্চয়তা ও মৃত্যুঝুঁকির দিকে ঠেলে দেওয়া।
আমরা স্পষ্টভাবে বলতে চাই- সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালের লোকবল সংকট আর অবহেলার বিষয় নয়, এটি এখন জরুরি ইস্যু হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। অবিলম্বে শূন্য পদে নিয়োগ, চিকিৎসকদের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, দালালচক্র নির্মূল এবং হাসপাতালের পরিবেশ উন্নয়নে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। অন্যথায় জনগণের ক্ষোভ একসময় বিস্ফোরিত হবে, আর সেই দায় এড়ানোর সুযোগ কারও থাকবে না।