একটি জাতির ভবিষ্যৎ গড়ে ওঠে শ্রেণিকক্ষে। আর সেই শ্রেণিকক্ষ যদি নির্ধারিত সময়ে তালাবদ্ধ থাকে, শিক্ষকবিহীন থাকে, তবে বুঝতে হবে সেখানে শুধু একটি বিদ্যালয়ের দরজা বন্ধ হয়নি - বন্ধ হয়ে যাচ্ছে একটি প্রজন্মের সম্ভাবনার পথও। মধ্যনগরের তিনটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সংসদ সদস্যের আকস্মিক পরিদর্শনে যে চিত্র উঠে এসেছে, তা কেবল হতাশাজনক নয়; এটি আমাদের প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থার ভয়াবহ দুরবস্থার প্রতিচ্ছবি।
একটি বিদ্যালয়ে ঝুলছে তালা, অন্য দুটি বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীরা উপস্থিত অথচ শিক্ষক নেই - এ দৃশ্য কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। হাওরাঞ্চলের বহু বিদ্যালয়ে বছরের পর বছর ধরে অনিয়ম, দায়িত্বহীনতা ও নজরদারির অভাব যেন এক অলিখিত সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। অভিভাবকেরা অভিযোগ করেন, শিক্ষকরা নিয়মিত বিদ্যালয়ে যান না, সময়মতো যান না। অথচ মাস শেষে বেতন ঠিকই তোলা হয়। প্রশ্ন হলো- এই দায়হীনতার শেষ কোথায়?
শিক্ষকদের পক্ষ থেকে ট্রলারের ইঞ্জিন বিকল হওয়া, পারিবারিক সমস্যা কিংবা যাতায়াত দুর্ভোগের যে ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে, তা মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচ্য হতে পারে। কিন্তু এসব কারণ কোনোভাবেই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার স্থায়ী অজুহাত হতে পারে না। হাওরাঞ্চলের বাস্তবতা নতুন নয়; এখানে চাকরিতে যোগদানের সময়ই শিক্ষকরা জানেন যোগাযোগ ব্যবস্থা কেমন। তাহলে কেন বিকল্প প্রস্তুতি থাকবে না? কেন শিক্ষার্থীদের শিক্ষা প্রতিদিন অনিশ্চয়তার ওপর নির্ভর করবে?
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো- এই অনিয়ম যেন অনেকের কাছেই স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে। বিদ্যালয়ে শিক্ষক অনুপস্থিত, ক্লাস বন্ধ, শিক্ষার্থীরা অবহেলিত -এসব যেন কারও বিবেকে নাড়া দেয় না। অথচ এই শিশুদের অধিকাংশই দরিদ্র পরিবারের সন্তান, যাদের ভাগ্য পরিবর্তনের একমাত্র অবলম্বন শিক্ষা। তাদের সেই অধিকার কেড়ে নেওয়া শুধু প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়, এটি নৈতিক অপরাধও বটে।
উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার পক্ষ থেকে ১২ শিক্ষককে শোকজ করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, কেবল শোকজ আর কাগুজে ব্যবস্থা দিয়ে এই সংকটের সমাধান হবে না। প্রয়োজন কঠোর জবাবদিহিতা, নিয়মিত মনিটরিং এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা। কারণ বারবার একই অনিয়ম ঘটার অর্থ হলো- কেউ না কেউ দায় এড়িয়ে যাচ্ছে।
হাওরাঞ্চল শিক্ষায় পিছিয়ে - এ কথা আমরা বহু বছর ধরে শুনে আসছি। কিন্তু পিছিয়ে থাকার পেছনে শুধু ভৌগোলিক দুর্ভোগ দায়ী নয়; দায়িত্বহীনতা, উদাসীনতা ও দুর্বল তদারকিও সমানভাবে দায়ী। রাষ্ট্র কোটি কোটি টাকা ব্যয় করছে শিক্ষার উন্নয়নে, অথচ বিদ্যালয়ে তালা ঝুলছে - এ বাস্তবতা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
এই ঘটনা সংশ্লিষ্ট প্রশাসন ও শিক্ষা বিভাগের জন্য একটি সতর্কবার্তা হওয়া উচিত। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে দায়িত্বহীনতার অভয়ারণ্য হতে দেওয়া যাবে না। শিক্ষকতা কোনো সাধারণ চাকরি নয়; এটি জাতি গড়ার দায়িত্ব। আর সেই দায়িত্ব পালনে যারা ব্যর্থ হবেন, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণে কোনো ধরনের শিথিলতা দেখানো উচিত নয়। আমরা মনে করি, হাওরের শিশুদের ভবিষ্যৎ নিয়ে আর তামাশা নয়, এবার জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার সময় এসেছে।