আকরাম উদ্দিন ::
দীর্ঘ ৩২ বছরের শিক্ষকতা জীবনের ইতি টানলেন সুনামগঞ্জের সরকারি জুবিলী উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা জাকিয়া সুলতানা। গত বৃহ¯পতিবার (১৪ মে) বিদ্যালয়ে শেষ কার্যদিবস পালন করলেও শুক্রবার ছিল তার চাকরিজীবনের আনুষ্ঠানিক শেষ দিন। বৃহস্পতিবার শিক্ষা, নৈতিকতা ও শিক্ষার্থীদের মানসিক বিকাশ নিয়ে তার দীর্ঘ অভিজ্ঞতার নানা দিক উঠে আসে একান্ত সাক্ষাৎকারে।
জাকিয়া সুলতানার স্বামী সামছুর রহমান রাজধানী ঢাকার একজন সফল ব্যবসায়ী। তার পিতা অবসরপ্রাপ্ত ইঞ্জিনিয়ার ও তৎকালীন আপ্তাবনগর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মরহুম মোহাম্মদ সাজিদ আলী ওরফে সাজিদুর রহমান। তিন সন্তানের জননী জাকিয়া সুলতানা। বড় ছেলে আরাবি শামস উৎসের বয়স ২৬ বছর। এছাড়া দুই মেয়ে শুহরাত শামস ঐশী ও সমৃদ্ধা শামস ঐন্দ্রী বর্তমানে দেশ-বিদেশে লেখাপড়া করছেন। তাদের স্থায়ী নিবাস সুনামগঞ্জ শহরতলির মাইজবাড়ি গ্রামে।
সাক্ষাৎকারে জাকিয়া সুলতানা জানান, ১৯৯৪ সালে সুনামগঞ্জ সরকারি এসসি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। শিক্ষকতা জীবনের শুরু ও শেষ দুটিই সুনামগঞ্জে। এর মধ্যে ঢাকার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে তার পছন্দ ও সক্ষমতার বাইরে চাপিয়ে দিয়ে লেখাপড়ায় মনোনিবেশ করানো যায় না। যে বিষয়ে একজন শিক্ষার্থী ভালো করতে আগ্রহী, সেই বিষয়টিকেই মূল্যায়ন করতে হবে। তাহলেই সে জীবনে ভালো ফলাফল করতে পারবে। তিনি মনে করেন, শিক্ষার্থীর চিন্তা-ভাবনা, মেধা ও আগ্রহকে মূল্যায়ন করেই যুগোপযোগী সিদ্ধান্ত নেয়া প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, শিশু শ্রেণি থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত অধিকাংশ অভিভাবক সন্তানদের পড়াশোনার বিষয়ে সচেতন থাকলেও পরবর্তীতে অনেকেই খোঁজখবর কমিয়ে দেন। বিশেষ করে সহপাঠীদের সঙ্গে চলাফেরা, বন্ধুমহল ও মানসিক পরিবর্তনের বিষয়গুলো গুরুত্ব দিয়ে পর্যবেক্ষণ করা হয় না। তাঁর মতে, এ কারণেই অনেক শিক্ষার্থী অকালে ঝরে পড়ে কিংবা বিপথগামী হয়ে যায়।
জাকিয়া সুলতানা বলেন, আমরা শিক্ষকেরা শিক্ষার্থীদের নৈতিকতার শিক্ষা দেই। কিন্তু পরিবারে যদি সেই চর্চা না থাকে, তাহলে শিক্ষার্থীরা সঠিক পথে এগোতে পারে না। যে পরিবারে লেখাপড়ার খোঁজখবর নেয়া হয় না কিংবা নৈতিক শিক্ষার পরিবেশ থাকে না, সেখানকার অনেক শিক্ষার্থী ঝরে পড়ে।
তিনি মনে করেন, পাঠদানের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের নৈতিক ও মানবিক শিক্ষা দিতে হবে আনন্দময় উপায়ে। তার ভাষায়, প্রত্যেক শিক্ষকের উচিত পাঠ শেষে ২ থেকে ৪ মিনিট শিক্ষণীয় গল্প বলা। বিশেষ করে ধর্মীয় অনুভূতি, ইতিহাস-ঐতিহ্য ও মানবিক মূল্যবোধের গল্প শিক্ষার্থীদের মনোজগতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। একইভাবে পরিবারেও খাবার টেবিলে, অবসর সময়ে কিংবা ঘুমানোর আগে সন্তানদের সঙ্গে গল্প ও উপদেশমূলক আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
জাকিয়া সুলতানা বলেন, তার মা সবসময় পাশে থেকেছেন এবং এখনও আছেন। বাবা কর্মব্যস্ততার কারণে সময় কম দিলেও নিয়মিত খোঁজখবর নিয়েছেন ও অনুপ্রেরণা যুগিয়েছেন।
অবসর জীবনে সমাজের অসহায় মানুষের পাশে থাকতে চান তিনি। তিনি বলেন, আমি সমাজের সব শ্রেণিপেশার মানুষের সুখ-দুঃখের অংশীদার হয়ে বেঁচে থাকতে চাই।
সাক্ষাৎকারের শেষ পর্যায়ে জাকিয়া সুলতানা বলেন, শিক্ষিত সমাজ গড়ে তুলতে শিক্ষক, অভিভাবক ও শিক্ষার্থীর মধ্যে আন্তরিক যোগাযোগ অব্যাহত রাখতে হবে। তাহলেই শিক্ষার্থীদের জীবনে সফলতা আসবেই।