দুই দশক আগে ভয়াবহ বিস্ফোরণের স্মৃতি বহন করা টেংরাটিলা আবারও জাতীয় আলোচনায়। দীর্ঘ আইনি জটিলতা ও ক্ষতিপূরণ প্রক্রিয়ার পর সরকার সেখানে নতুন করে গ্যাস অনুসন্ধানের নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বাংলাদেশের জন্য এটি নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। তবে টেংরাটিলার ইতিহাস কেবল সম্ভাবনার নয়, এটি অব্যবস্থাপনা, বিদেশি কো¤পানির দায়হীনতা এবং পরিবেশ বিপর্যয়েরও নির্মম স্মারক। ফলে নতুন অনুসন্ধান কার্যক্রমকে শুধু অর্থনৈতিক প্রকল্প হিসেবে নয়, বরং রাষ্ট্রের সক্ষমতা ও জবাবদিহির একটি বড় পরীক্ষাও হিসেবে দেখতে হবে।
২০০৫ সালে নাইকো রিসোর্সেসের খনন কার্যক্রম চলাকালে টেংরাটিলায় পরপর দুই দফা ক্লোআউটের ঘটনায় বিপুল পরিমাণ গ্যাস পুড়ে যায়, পরিবেশ ধ্বংস হয় এবং স্থানীয় মানুষ দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির মুখে পড়ে। প্রায় ২১ বছর পর আবার সেখানে কূপ খননের পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক সালিশি আদালতের রায়ে বাংলাদেশ ক্ষতিপূরণ পাওয়ার পথ সুগম হয়েছে। এটি দেশের জন্য ইতিবাচক দিক হলেও অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়াই এখন সবচেয়ে বড় প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, টেংরাটিলা ও বৃহত্তর ছাতক গ্যাসক্ষেত্রে এখনো উল্লেখযোগ্য গ্যাস মজুত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। দেশে যখন জ্বালানি আমদানিনির্ভরতা বাড়ছে এবং বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ তৈরি হচ্ছে, তখন নিজস্ব গ্যাসস¤পদ অনুসন্ধান ও উত্তোলন সময়োপযোগী পদক্ষেপ। বিশেষ করে বাপেক্সের মতো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে অনুসন্ধান পরিচালনার সিদ্ধান্ত জাতীয় সক্ষমতা বৃদ্ধির দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ। তবে এই উদ্যোগ বাস্তবায়নে সর্বোচ্চ সতর্কতা অপরিহার্য। টেংরাটিলা একটি ঝুঁকিপূর্ণ ভূগঠন। অতীতের বিস্ফোরণ দেখিয়েছে, সামান্য অবহেলা কত বড় বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। তাই আধুনিক প্রযুক্তি, আন্তর্জাতিক মানের নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং দক্ষ জনবল ছাড়া কোনোভাবেই কূপ খননের কাজ শুরু করা উচিত নয়। একই সঙ্গে পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন (ইআইএ) স্বচ্ছভাবে স¤পন্ন করতে হবে এবং স্থানীয় জনগণকে স¤পৃক্ত করতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি। অতীতে জ্বালানি খাতে নানা চুক্তি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তাই টেংরাটিলার নতুন অনুসন্ধান প্রকল্পে ব্যয়, চুক্তি, মুনাফা বণ্টন এবং নিরাপত্তা পরিকল্পনা স¤পর্কে জনগণকে পরিষ্কার তথ্য দিতে হবে। কোনোভাবেই যেন এটি আরেকটি বিতর্কিত প্রকল্পে পরিণত না হয়।
আমরা জানি, বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানের বিকল্প নেই। কিন্তু উন্নয়ন যদি পরিবেশ ও মানুষের নিরাপত্তাকে উপেক্ষা করে হয়, তবে সেই উন্নয়ন টেকসই হয় না। টেংরাটিলার নতুন উদ্যোগ তাই কেবল গ্যাস অনুসন্ধানের প্রকল্প নয়- এটি দায়িত্বশীল রাষ্ট্র পরিচালনারও একটি বড় পরীক্ষা। সরকার, বাপেক্স এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে সেই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হবে।