বর্তমান বিশ্বে যে জাতি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে যত বেশি অগ্রসর, সে জাতি তত বেশি উন্নত, সমৃদ্ধ ও আত্মনির্ভর। চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের এই যুগে কেবল প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থার ওপর নির্ভর করে টিকে থাকা সম্ভব নয়; প্রয়োজন বিজ্ঞানমনস্ক, উদ্ভাবনী ও প্রযুক্তিনির্ভর মানবস¤পদ গড়ে তোলা। সুনামগঞ্জে আয়োজিত ৪৭তম বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সপ্তাহ ও বিজ্ঞান মেলা সেই প্রয়োজনীয় বার্তাই নতুন করে সামনে এনেছে।
‘উদ্ভাবন নির্ভর বাংলাদেশ গঠনে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি’ - এই প্রতিপাদ্য শুধু একটি আনুষ্ঠানিক স্লোগান নয়, বরং সময়ের দাবি। বিজ্ঞান মানুষকে যুক্তিবাদী করে, কুসংস্কারমুক্ত করে এবং সত্য অনুসন্ধানের সাহস জোগায়। অন্যদিকে প্রযুক্তি মানুষের জীবনকে সহজ, দ্রুত ও আধুনিক করে তুলেছে। কৃষি থেকে চিকিৎসা, শিক্ষা থেকে যোগাযোগ - সবখানেই প্রযুক্তির ছোঁয়া আজ অপরিহার্য।
সুনামগঞ্জের মতো হাওরাঞ্চলেও বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির বিস্তার এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জলবায়ু পরিবর্তন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, কৃষি সংকট কিংবা কর্মসংস্থানের মতো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রযুক্তিনির্ভর উদ্ভাবনী চিন্তার বিকল্প নেই। স্থানীয় শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে বিজ্ঞান মেলায় ৩৫টি স্টল স্থাপন নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত। এসব আয়োজন তরুণদের মধ্যে সৃজনশীলতা, গবেষণার আগ্রহ এবং নতুন কিছু আবিষ্কারের মানসিকতা তৈরি করে।
তবে বাস্তবতা হলো, এখনও দেশের অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিজ্ঞান শিক্ষার পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা নেই। আধুনিক ল্যাব, দক্ষ শিক্ষক ও প্রযুক্তিগত অবকাঠামোর ঘাটতি শিক্ষার্থীদের পিছিয়ে দিচ্ছে। শহরের তুলনায় গ্রামাঞ্চলের শিক্ষার্থীরা আরও বেশি বঞ্চিত। তাই কেবল বিজ্ঞান মেলার আয়োজন করলেই হবে না; বিজ্ঞান শিক্ষাকে যুগোপযোগী ও বাস্তবমুখী করতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।
নতুন প্রজন্মকে বিজ্ঞানমনস্ক করে তুলতে পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্র - সবার সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন। শিশুদের প্রশ্ন করতে উৎসাহিত করতে হবে, গবেষণার পরিবেশ তৈরি করতে হবে এবং প্রযুক্তির ইতিবাচক ব্যবহার শেখাতে হবে। একই সঙ্গে সামাজিক কুসংস্কার, গুজব ও অন্ধবিশ্বাস থেকে তরুণ সমাজকে দূরে রাখতে বিজ্ঞানভিত্তিক চিন্তার চর্চা বাড়ানো জরুরি।
বাংলাদেশ আজ ডিজিটাল অগ্রযাত্রার পথে এগিয়ে যাচ্ছে। এই অগ্রযাত্রাকে টেকসই করতে হলে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিখাতকে আরও বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ আগামী দিনের বিশ্ব প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে প্রয়োজন দক্ষ, উদ্ভাবনী ও প্রযুক্তিবান্ধব তরুণ প্রজন্ম। তাই বিজ্ঞানমনস্ক নতুন প্রজন্ম গড়াই হোক আগামী বাংলাদেশের প্রধান অঙ্গীকার।