স্টাফ রিপোর্টার ::
রোদ উঠেছে, শুকোচ্ছে হাওরের ভেজা মাটি। কিন্তু সেই রোদও সুনামগঞ্জের কৃষকের মুখে হাসি ফেরাতে পারেনি। বরং ফসলহীন মাঠের দিকে তাকিয়ে আরও গভীর হচ্ছে তাদের হতাশা। কারণ, বছরের একমাত্র ভরসা বোরো ধান পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ার পর এখন সামনে শুধু ঋণের বোঝা আর অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ। হাওরের বিভিন্ন এলাকায় ধান কাটার মৌসুম প্রায় শেষ। কোথাও কোথাও কৃষকেরা নষ্ট হয়ে যাওয়া ধানের সামান্য অবশিষ্ট অংশ রোদে শুকিয়ে ঘরে তোলার চেষ্টা করছেন। তবে অধিকাংশ কৃষকের জন্য সেটিও সম্ভব হয়নি। ফসল হারিয়ে এখন সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা - কীভাবে শোধ হবে লাখ লাখ টাকার ঋণ। সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার মোল্লাপাড়া ইউনিয়নের দেখার হাওরে গিয়ে দেখা যায়, হাছনপছন্দ গ্রামের কৃষক ইনসান আলী এবার প্রায় আট একর জমিতে বোরো আবাদ করেছিলেন। ভালো ফলনের আশায় ধারদেনা করে চাষ করেছিলেন তিনি। কিন্তু এক রাতের পানিতেই সব শেষ হয়ে যায়। কথা বলতে গিয়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে ইনসান আলী বলেন, “জমি করতে গিয়ে মানুষের কাছ থেকে সাড়ে পাঁচ লাখ টাকা ধার নিছি। ভাবছিলাম ধান বিক্রি করে সব শোধ করমু। এখন নিজের জমির ধানই পাই নাই। পাওনাদারের চাপ বাড়তাছে। বড় ছেলেকে নিয়ে অন্য শহরে কামে যাইতে হইতে পারে।” একই চিত্র পাশের গ্রামের কৃষক সাহেব আলীর জীবনেও। প্রায় সাড়ে তিন লাখ টাকা বিনিয়োগ করেছিলেন তিনি। কিন্তু ফসলহানির পর এখন পরিবার চালানোই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কয়েক দিন আগে অতিরিক্ত দুশ্চিন্তায় মাঠেই অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি। স্থানীয় কৃষিকাজে জড়িতদের ভাষ্য, শুধু গুয়ারছুড়া, রৌয়ারপাড় ও হাছনপছন্দ এলাকায় অন্তত ২০ জন বর্গাচাষি ঋণ করে চাষাবাদ করে এখন চরম বিপদে পড়েছেন। তাদের অনেকেই অন্যের জমি নিয়ে আবাদ করেছিলেন। ফলে ফসল না হলেও জমির খরচ ও ঋণের দায় থেকেই যাচ্ছে। সংকট আরও গভীর করেছে এনজিওর কিস্তির চাপ। কৃষকদের অভিযোগ, ফসলহানির মধ্যেও বিভিন্ন ঋণদান সংস্থার কর্মীরা নিয়মিত কিস্তি আদায়ে বাড়ি বাড়ি যাচ্ছেন। এতে মানসিকভাবে আরও ভেঙে পড়ছেন তারা। এ ব্যাপারে এলাকায় কিস্তি আদায়ে আসা এক এনজিওকর্মী একা বেগম বলেন, “এই এলাকায় আমাদের প্রায় ছয় কোটি টাকা ঋণ দেওয়া আছে। কিস্তি বন্ধের বিষয়ে এখনো কেউ অফিসে আনুষ্ঠানিকভাবে জানায়নি। কারও সমস্যা থাকলে অফিসে যোগাযোগ করতে হবে।” এদিকে জেলার মধ্যনগর উপজেলার বাসিন্দা এবং হাওরের বাঁচাও আন্দোলনের নেতা চিত্তরঞ্জন তালুকদার বলেন, “ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের দ্রুত সহায়তা না দিলে অনেক পরিবার এলাকা ছেড়ে যেতে বাধ্য হবে। কৃষকের হাতে এখন কোনো টাকা নেই। সরকারকে জরুরি ভিত্তিতে খাদ্য ও আর্থিক সহায়তা দিতে হবে।” অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মতিউর রহমান খান জানান, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা প্রস্তুতের কাজ চলছে। ইতোমধ্যে প্রায় ৯৮ হাজার কৃষকের তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। যাচাই-বাছাই শেষে সরকারি সহায়তা পৌঁছে দেওয়া হবে। অন্যদিকে, ফসলহানির পাশাপাশি কম দামে ধান বিক্রি করেও ক্ষতির মুখে পড়েছেন কৃষকেরা। জামালগঞ্জের হালি হাওরপাড়ের কালীপুর গ্রামের কৃষক মোহাম্মদ আলী আমজাদ জানান, তিন কিয়ার জমিতে চাষ করে প্রতি কিয়ারে ১০ হাজার টাকার বেশি খরচ হয়েছে। কিন্তু উৎপাদিত ধান বিক্রি করতে হচ্ছে মাত্র ৮০০ টাকা মণ দরে। তিনি বলেন, সরকারি দামে ধান দেওয়ার সুযোগ পাই না। ধান রাখতেও পারতেছি না, বিক্রিও করতে পারতেছি না। লোকসান হইলেও ঋণ শোধ করতে ধান বেচতে হইব। হালি হাওরের বড় কৃষকদের একজন মো. আয়না মিয়া জানান, সপ্তাহখানেক আগে ভেজা ধান ৬০০ টাকা দরে ৫০০ মণ বিক্রি করেছেন তিনি। প্রতি কিয়ার জমিতে চাষ, কাটাই ও পরিবহন মিলিয়ে খরচ পড়েছে অনেক বেশি। তার ভাষায়, “এক মণ ধান উৎপাদন করতে ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৩০০ টাকা খরচ হইছে। এখন বিক্রি হইতাছে আট শ-সাড়ে আট শ টাকায়। প্রতি মণে তিন-চার শ টাকা লোকসান। ডুইব্যা যাওয়া ধানের হিসাব তো বাদই দিলাম। এইবার অনেকের না খাইয়া থাকার অবস্থা হইব।” জেলা খাদ্য বিভাগের তথ্যমতে, চলতি বোরো মৌসুমে সুনামগঞ্জে ২১ হাজার ৩৪৯ মেট্রিক টন ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। সরকার কৃষকের কাছ থেকে ৩৬ টাকা কেজি বা ১ হাজার ৪৪০ টাকা মণ দরে ধান কিনছে। তবে কাক্সিক্ষত ফলন না হওয়ায় লক্ষ্যমাত্রা পূরণ নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছে। সুনামগঞ্জ জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক কার্যালয়ের আহরণ ও ব্যয়ন কর্মকর্তা বি এম মুশফিকুর রহমান বলেন, ৩ মে থেকে ধান সংগ্রহ কার্যক্রম শুরু হয়েছে, চলবে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত। আমরা শুকনা ও ভালো মানের ধান সংগ্রহ করি। কিন্তু বৈরী আবহাওয়ার কারণে কৃষকেরা ভেজা ধান নিয়ে আসছেন। আবহাওয়া ভালো থাকলে কৃষকেরা শুকিয়ে ধান দিতে পারবেন বলে আশা করছি।
রোদ উঠেছে, শুকোচ্ছে হাওরের ভেজা মাটি। কিন্তু সেই রোদও সুনামগঞ্জের কৃষকের মুখে হাসি ফেরাতে পারেনি। বরং ফসলহীন মাঠের দিকে তাকিয়ে আরও গভীর হচ্ছে তাদের হতাশা। কারণ, বছরের একমাত্র ভরসা বোরো ধান পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ার পর এখন সামনে শুধু ঋণের বোঝা আর অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ। হাওরের বিভিন্ন এলাকায় ধান কাটার মৌসুম প্রায় শেষ। কোথাও কোথাও কৃষকেরা নষ্ট হয়ে যাওয়া ধানের সামান্য অবশিষ্ট অংশ রোদে শুকিয়ে ঘরে তোলার চেষ্টা করছেন। তবে অধিকাংশ কৃষকের জন্য সেটিও সম্ভব হয়নি। ফসল হারিয়ে এখন সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা - কীভাবে শোধ হবে লাখ লাখ টাকার ঋণ। সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার মোল্লাপাড়া ইউনিয়নের দেখার হাওরে গিয়ে দেখা যায়, হাছনপছন্দ গ্রামের কৃষক ইনসান আলী এবার প্রায় আট একর জমিতে বোরো আবাদ করেছিলেন। ভালো ফলনের আশায় ধারদেনা করে চাষ করেছিলেন তিনি। কিন্তু এক রাতের পানিতেই সব শেষ হয়ে যায়। কথা বলতে গিয়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে ইনসান আলী বলেন, “জমি করতে গিয়ে মানুষের কাছ থেকে সাড়ে পাঁচ লাখ টাকা ধার নিছি। ভাবছিলাম ধান বিক্রি করে সব শোধ করমু। এখন নিজের জমির ধানই পাই নাই। পাওনাদারের চাপ বাড়তাছে। বড় ছেলেকে নিয়ে অন্য শহরে কামে যাইতে হইতে পারে।” একই চিত্র পাশের গ্রামের কৃষক সাহেব আলীর জীবনেও। প্রায় সাড়ে তিন লাখ টাকা বিনিয়োগ করেছিলেন তিনি। কিন্তু ফসলহানির পর এখন পরিবার চালানোই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কয়েক দিন আগে অতিরিক্ত দুশ্চিন্তায় মাঠেই অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি। স্থানীয় কৃষিকাজে জড়িতদের ভাষ্য, শুধু গুয়ারছুড়া, রৌয়ারপাড় ও হাছনপছন্দ এলাকায় অন্তত ২০ জন বর্গাচাষি ঋণ করে চাষাবাদ করে এখন চরম বিপদে পড়েছেন। তাদের অনেকেই অন্যের জমি নিয়ে আবাদ করেছিলেন। ফলে ফসল না হলেও জমির খরচ ও ঋণের দায় থেকেই যাচ্ছে। সংকট আরও গভীর করেছে এনজিওর কিস্তির চাপ। কৃষকদের অভিযোগ, ফসলহানির মধ্যেও বিভিন্ন ঋণদান সংস্থার কর্মীরা নিয়মিত কিস্তি আদায়ে বাড়ি বাড়ি যাচ্ছেন। এতে মানসিকভাবে আরও ভেঙে পড়ছেন তারা। এ ব্যাপারে এলাকায় কিস্তি আদায়ে আসা এক এনজিওকর্মী একা বেগম বলেন, “এই এলাকায় আমাদের প্রায় ছয় কোটি টাকা ঋণ দেওয়া আছে। কিস্তি বন্ধের বিষয়ে এখনো কেউ অফিসে আনুষ্ঠানিকভাবে জানায়নি। কারও সমস্যা থাকলে অফিসে যোগাযোগ করতে হবে।” এদিকে জেলার মধ্যনগর উপজেলার বাসিন্দা এবং হাওরের বাঁচাও আন্দোলনের নেতা চিত্তরঞ্জন তালুকদার বলেন, “ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের দ্রুত সহায়তা না দিলে অনেক পরিবার এলাকা ছেড়ে যেতে বাধ্য হবে। কৃষকের হাতে এখন কোনো টাকা নেই। সরকারকে জরুরি ভিত্তিতে খাদ্য ও আর্থিক সহায়তা দিতে হবে।” অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মতিউর রহমান খান জানান, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা প্রস্তুতের কাজ চলছে। ইতোমধ্যে প্রায় ৯৮ হাজার কৃষকের তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। যাচাই-বাছাই শেষে সরকারি সহায়তা পৌঁছে দেওয়া হবে। অন্যদিকে, ফসলহানির পাশাপাশি কম দামে ধান বিক্রি করেও ক্ষতির মুখে পড়েছেন কৃষকেরা। জামালগঞ্জের হালি হাওরপাড়ের কালীপুর গ্রামের কৃষক মোহাম্মদ আলী আমজাদ জানান, তিন কিয়ার জমিতে চাষ করে প্রতি কিয়ারে ১০ হাজার টাকার বেশি খরচ হয়েছে। কিন্তু উৎপাদিত ধান বিক্রি করতে হচ্ছে মাত্র ৮০০ টাকা মণ দরে। তিনি বলেন, সরকারি দামে ধান দেওয়ার সুযোগ পাই না। ধান রাখতেও পারতেছি না, বিক্রিও করতে পারতেছি না। লোকসান হইলেও ঋণ শোধ করতে ধান বেচতে হইব। হালি হাওরের বড় কৃষকদের একজন মো. আয়না মিয়া জানান, সপ্তাহখানেক আগে ভেজা ধান ৬০০ টাকা দরে ৫০০ মণ বিক্রি করেছেন তিনি। প্রতি কিয়ার জমিতে চাষ, কাটাই ও পরিবহন মিলিয়ে খরচ পড়েছে অনেক বেশি। তার ভাষায়, “এক মণ ধান উৎপাদন করতে ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৩০০ টাকা খরচ হইছে। এখন বিক্রি হইতাছে আট শ-সাড়ে আট শ টাকায়। প্রতি মণে তিন-চার শ টাকা লোকসান। ডুইব্যা যাওয়া ধানের হিসাব তো বাদই দিলাম। এইবার অনেকের না খাইয়া থাকার অবস্থা হইব।” জেলা খাদ্য বিভাগের তথ্যমতে, চলতি বোরো মৌসুমে সুনামগঞ্জে ২১ হাজার ৩৪৯ মেট্রিক টন ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। সরকার কৃষকের কাছ থেকে ৩৬ টাকা কেজি বা ১ হাজার ৪৪০ টাকা মণ দরে ধান কিনছে। তবে কাক্সিক্ষত ফলন না হওয়ায় লক্ষ্যমাত্রা পূরণ নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছে। সুনামগঞ্জ জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক কার্যালয়ের আহরণ ও ব্যয়ন কর্মকর্তা বি এম মুশফিকুর রহমান বলেন, ৩ মে থেকে ধান সংগ্রহ কার্যক্রম শুরু হয়েছে, চলবে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত। আমরা শুকনা ও ভালো মানের ধান সংগ্রহ করি। কিন্তু বৈরী আবহাওয়ার কারণে কৃষকেরা ভেজা ধান নিয়ে আসছেন। আবহাওয়া ভালো থাকলে কৃষকেরা শুকিয়ে ধান দিতে পারবেন বলে আশা করছি।