সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলে এবারের জলাবদ্ধতা শুধু কৃষকের ধানই কেড়ে নেয়নি, কেড়ে নিয়েছে তাদের ভবিষ্যতের ভরসাও। ধানের সঙ্গে নষ্ট হয়েছে খড়, আর সেই খড়ের সংকট এখন গবাদিপশু পালন ও আগামী মৌসুমের কৃষিকাজ নিয়ে নতুন শঙ্কা তৈরি করেছে। হাওরের কৃষকরা বছরের পর বছর ধরে যে কৃষি-অর্থনীতি ও জীবনযাত্রা গড়ে তুলেছেন, তার একটি বড় ভিত্তি এই খড়। ফলে খড় নষ্ট হওয়া মানে শুধু গোখাদ্যের সংকট নয়; এটি পুরো হাওর অর্থনীতির জন্য এক গভীর বিপদের বার্তা।
প্রতিবছর বৈশাখ শেষে কৃষকরা ধান ঘরে তোলার পর খড় শুকিয়ে ‘লাছি’ তৈরি করেন। এটি শুধু খাদ্য সংরক্ষণ নয়, হাওর সংস্কৃতিরও অংশ। কিন্তু এবার টানা বৃষ্টিতে ধানক্ষেত ডুবে যাওয়ার পাশাপাশি খলায় রাখা খড়ও পচে গেছে। কোথাও কোথাও সেই পচা খড়ের দুর্গন্ধে পরিবেশ ভারী হয়ে উঠেছে। কৃষকেরা রোদে শুকিয়ে খড় বাঁচানোর চেষ্টা করলেও বারবার বৃষ্টিতে তা ব্যর্থ হচ্ছে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, হাওরের কৃষি এখনও অনেকাংশে গবাদিপশুনির্ভর। চাষাবাদ, পরিবহন ও পারিবারিক অর্থনীতিতে গরু গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। অথচ গোখাদ্যের অভাবে এখন অনেক কৃষক বাধ্য হয়ে কম দামে গরু বিক্রির চিন্তা করছেন। বাজারে মানুষের হাতে টাকা না থাকায় গবাদিপশুর দামও পড়ে গেছে। অর্থাৎ কৃষক একদিকে ফসল হারাচ্ছেন, অন্যদিকে স¤পদও হারানোর পথে।
সরকারি হিসেবে প্রায় ২০ হাজার হেক্টরের বেশি ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হলেও স্থানীয়দের দাবি, প্রকৃত ক্ষতি আরও অনেক বেশি। বাস্তবতা হলো, হাওরের বহু কৃষক এখন ঋণ, খাদ্য সংকট ও গবাদিপশুর খাদ্য জোগান - এই তিন সংকটের মুখোমুখি। অথচ এখন পর্যন্ত গোখাদ্য সংকট মোকাবিলায় দৃশ্যমান কোনো কার্যকর উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। এই পরিস্থিতিতে সরকারকে দ্রুত জরুরি পদক্ষেপ নিতে হবে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সরাসরি আর্থিক সহায়তা, স্বল্পমূল্যে বা বিনামূল্যে গোখাদ্য বিতরণ, কৃষিঋণ পুনঃতফসিল এবং গবাদিপশু রক্ষায় বিশেষ প্রণোদনা চালু করা জরুরি। পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে হাওরাঞ্চলে জলাবদ্ধতা ও বন্যা ব্যবস্থাপনায় টেকসই পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। শুধু ফসল নয়, কৃষকের জীবন ও জীবিকাও রক্ষা করতে হবে।
হাওরের কৃষকরা দেশের খাদ্য নিরাপত্তায় বড় অবদান রাখেন। তাদের দুর্দিনে পাশে দাঁড়ানো শুধু মানবিক দায়িত্ব নয়, এটি জাতীয় স্বার্থেরও বিষয়। এখন প্রয়োজন আশ্বাস নয়, কার্যকর পদক্ষেপ।