হাওরে গোখাদ্য নিয়ে শঙ্কা

আপলোড সময় : ০৯-০৫-২০২৬ ১২:২৬:১২ পূর্বাহ্ন , আপডেট সময় : ০৯-০৫-২০২৬ ১২:৪১:৫৫ পূর্বাহ্ন
শামস শামীম::
শাল্লার উদগল হাওর পাড়ের কৃষাণি ছায়া রানী দাস ছেলেদের নিয়ে বাড়ির কৃষিকাজ নিজেই সামলান। এবার তার পরিবার হাওরে প্রায় ২৭ বিঘা জমিতে বোরো ধান চাষ করে। বৈশাখের প্রথম সপ্তাহের পর তিনি কিছু পাকা ধান কাটতে পেরেছিলেন। দ্বিতীয় সপ্তাহেই শুরু হয় টানা বৃষ্টি; যেন শনি নেমে আসে তাদের পাকা ধানের ওপর। এতে হাওরে থাকা বাকি ধান তলিয়ে যায়। এ ছাড়া যে ধান তিনি কেটেছিলেন সেগুলোরও কিছুটা রোদে শুকাতে না পারায় অঙ্কুর গজিয়ে নষ্ট হয়েছে। এর সঙ্গে নষ্ট হয়েছে ধানের খড়। ছায়া রানীর ভাষায়, ধান হারানোর পর খড় হারানো যেন অনেকটাই ‘মরার উপর খাঁড়ার ঘা’। তিনি আক্ষেপ নিয়ে বলছিলেন, “আমার তিন পুত (ছেলে) আর আটটা গরু। মাত্র পাঁচ কিয়ার (৩০ শতাংশে ১ কিয়ার, ৩৩ শতাংশে ১ বিঘা) ধান কাটছি। আর ২২ কিয়ার নষ্ট অইছে। পাঁচ কিয়ারের খেড়ও পুরা নষ্ট অইছে। ধানও অর্ধেক নষ্ট।” আটটি গরু নিয়ে কীভাবে বছর পার করবেন সেই দুশ্চিন্তাই এখন কৃষাণি ছায়া রানীর।
সুনামগঞ্জের হাওরের বিভিন্ন অঞ্চলের কৃষক বলছেন, পানির নিচ থেকে ধান কাটার চিন্তা তারা এখন বাদ দিয়েছেন। তাদের চেষ্টা অঙ্কুর গজিয়ে ওঠা ধান রোদে শুকিয়ে কিছুটা খাদ্য উপযোগী করার আর গোখাদ্য হিসেবে খড় বাঁচানোর। অনেকে এটাও আশঙ্কা করেন, হয়ত গোখাদ্যের অভাবে তাদের গরুও বিক্রি করে দিতে হতে পারে। অনেকে বাজারে খোঁজ-খবরও করছেন। কিন্তু ফসল নষ্ট হওয়ায় মানুষের হাতে টাকা নেই, ফলে গবাদিপশুর দামও পড়ে গেছে।
এ বিষয়ে সুনামগঞ্জ জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, হাওরে এখনও ট্রাক্টরের চেয়ে চাষাবাদের জন্য গবাদিপশুই প্রধান। হাওরের কৃষি অর্থনীতি তথা চাষাবাদ সচল রেখেছে গবাদিপশুই। হাওরের প্রাকৃতিক খড়ই গবাদিপশুর প্রধান খাদ্য। প্রতি বছর বৈশাখ শেষে প্রাকৃতিক খড় শুকিয়ে প্রক্রিয়াজাত করে কৃষক গোখাদ্য মজুদ করেন। এখন জলাবদ্ধতায় ধান নষ্ট হয়ে গেছে। এতে গবাদিপশুর প্রাকৃতিক খাদ্য খড়ও পচে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। এবার তাই গোখাদ্যের সংকট হবে। আমরা কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানিয়েছি।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য মতে, জেলায় হাওরে প্রায় পৌনে চার লাখ কৃষক আছেন। প্রায় সবাই চাষাবাদের জন্য জমির অনুপাতে গরু লালন-পালন করেন। ভাটিতে প্রাকৃতিক এই খড় দিয়ে বর্ষাকালীন ছয় মাস গবাদিপশুকে লালনপালন করেন কৃষক। বাকি ছয় মাস শুকনো মৌসুমে গোচারণ ভূমিতে গবাদিপশুকে চড়ান তারা।
গত কয়েকদিন সদর, দিরাই ও শাল্লা উপজেলার হাওরাঞ্চল ঘুরে দেখা গেছে, হাওরের খলা ও জাঙ্গাল থেকে পচা খড়ের উৎকট গন্ধ এসে নাকে লাগছে। খলা পানিতে ডুবে যাওয়ায় সেখানে থাকা খড়ও পচে গেছে। এতে কোথাও কোথাও পানির রং কালো হয়ে গেছে। 

সুনামগঞ্জ জেলা প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর বলছে, জেলায় সাত লাখ ৪০ হাজার গবাদিপশু রয়েছে। প্রতি বছর হাওরে প্রায় দুই কোটি ২০ লাখ টন খড় উৎপাদন হয়। এর বাজার মূল্য প্রায় ১২০ কোটি টাকা। প্রতি বছর সনাতন পদ্ধতিতে কৃষকরা ধান শুকিয়ে গোলাজাত করার পর খড় শুকিয়ে গম্বুজাকৃতির আদলে স্তূপ করে রাখেন। একে খড়ের ‘গম্বুজ’ বা খড়ের ‘লাছি’ বলা হয়। ‘লাছি’ তোলার সময় কৃষক উৎসব করেন। গ্রামের মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করে খাওয়া-দাওয়া করা হয়। তবে এবার পরিস্থিতি ভিন্ন।
কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, খাদ্য উদ্বৃত্ত জেলা সুনামগঞ্জে ১৯৩টি ছোট-বড়ো হাওর ও বিলে বোরো আবাদ হয়। চলতি বছর জেলায় দুই লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে হাওরে এক লাখ ৬৫ হাজার ২৭৫ হেক্টর ও নন-হাওরে ৫৮ হাজার ২৩৬ হেক্টর চাষ হয়েছে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ১৪ লাখ টন, যার বাজার মূল্য প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকা। চাষ করা এসব জমির মধ্যে জেলায় ২০ হাজার ১২০ হেক্টরের ফসল ডুবে নষ্ট হয়েছে। যদিও কৃষক ও হাওর বাঁচাও আন্দোলনের নেতাদের ভাষ্য, প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতি আরও অনেক বেশি। কৃষি বিভাগের তথ্য বাস্তবসম্মত নয়।

গত বুধবার শাল্লা উপজেলার ছায়ার হাওর ও দিরাই উপজেলার উদগল হাওর ঘুরে দেখা গেছে, প্রায় প্রত্যেক কৃষকের খলা থেকে খড় পচে উৎকট গন্ধ বেরুচ্ছে। রোদ পেয়ে শুকানোর জন্য দিলেও নেতিয়ে গেছে খড়। আবার বৃষ্টিতে ভিজে নষ্ট হচ্ছে।
দিরাই উপজেলার কল্যাণী গ্রামের উদগল হাওরের কৃষাণি সুলেখা দাসকে দেখা গেল পচা খড় রোদে নাড়ছেন। খলায় গাছগাছালি নেই। সুলেখার স্বামী একটি রাইস মিলে চাকরি করেন। তাই ক্ষেত-খামার তাকেই সামলাতে হয়।
সুলেখা বলছিলেন, বর্গায় ৭-৯ হাজার টাকা কিয়ারপ্রতি ভাড়া নিয়ে তিনি ২৪ কিয়ার জমি চাষ করেছিলেন। এর মধ্যে ১০ কিয়ার ডুবে নষ্ট হযেছে। বাকি ১৪ কিয়ার কাটলেও খড় ও ধান পচে নষ্ট হচ্ছে। রোদে শুকিয়েও কিনারা করতে পারছেন না।
চারটি গরু দিয়ে তাদের গিরস্তি চলে। এখন কীভাবে এগুলো পালন করবেন এ নিয়ে চিন্তিত তিনি। বলছিলেন, “হুনেন, মাইনসে চাইয়া-চিত্তে খাইতে পারে। পশু সেটা পারে না। গরু কীভাবে পালব?” একই হাওরের চাকুয়া গ্রামের কয়েকজন কৃষকও বললেন একই কথা।

ছায়ার হাওরের শাল্লা উপজেলার চাকুয়া গ্রামের রানু চন্দ্র দাসের ২২ কিয়ার জমির মধ্যে মাত্র ছয় কিয়ার কাটছেন। বাকি খেত পানিতে ডুবে নষ্ট হয়ে গেছে। ছয় কিয়ারের ধান অর্ধেক পচে, অঙ্কুর গজিয়ে নষ্ট হয়েছে। খড়ও পচে গেছে। তিনি বলছিলেন, “সাতটা গরুরে কিবায় খাবাইমু। নিজের খাবার, ঋণ ও গরুর খাবারের জন্য গরু বিক্রি করতে পাইকারের সঙ্গে কথা কইছি। পাইকার কয় মাইনসের হাতো ট্যাকা নাই। দাম কম। নিজেও বাজারে গিয়া দেখি দাম কম।” উপজেলার লৌলারচর গ্রামের কৃষক অঞ্জন সামন্ত বলেন, “পাঁচটা গরু আমার। ছায়ার হাওরে ৩৫ কিয়ারের মধ্যে ১০ কিয়ার কাটছি। বাকি খেত পানির তলে। যা খাটছিলাম তার অর্ধেক ধান রোদ না থাকায় পচে গ্যাড়া বেরিয়েছে। খেড় পুরা নষ্ট। এখন গরুর খাবারের কথা ভেবে কিছু গরু বিক্রি করে দেব। কিন্তু বাজারে খোঁজ নিয়ে জানতে পারছি দাম কম।”
এদিকে বৃহস্পতিবার দুপুরে হাওরাঞ্চলে বন্যা সমস্যার স্থায়ী সমাধান আন্দোলন পরিচালনা কমিটি হাওরের ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের ক্ষতিপূরণ, গবাদিপশুর খাদ্য সংস্থানসহ নানা দাবিতে স্মারকলিপি দিয়েছে জেলা প্রশাসনকে।
কমিটির সদস্য সুখেন্দু তালুকদার মিন্টু বলেন, “এবার হাওরে পাকা ও কাঁচা দানের সঙ্গে কাটা ধান ও খড়ও বৃষ্টিতে ভিজে নষ্ট হয়েছে। সরকারের স্থানীয় কর্তৃপক্ষ ক্ষতি নিয়ে লুকোচুরি করছে।” বাহাড়া ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান বিশ্বজিৎ চৌধুরী নান্টু নিজেও একজন কৃষক। শাল্লার ছায়ার হাওরে জমি রয়েছে তার। ফসলের সঙ্গে খড়ও নষ্ট হওয়ার আক্ষেপ নিয়ে বলেন, খড়ের লাছি হাওরের চিরায়ত উৎসব। ধান কাটা, মাড়াই ও গোলায় ভরা শেষে এক কৃষক আরেক কৃষককে সহযোগিতা করেন খড়ের লাছি তৈরিতে। কিন্তু এবার খড় পচে নষ্ট হওয়ায় খড়ই সংগ্রহ হবে না; লাছি উৎসবও সম্ভব না।

সম্পাদকীয় :

  • সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি : মো. জিয়াউল হক
  • সম্পাদক ও প্রকাশক : বিজন সেন রায়
  • বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : মোক্তারপাড়া রোড, সুনামগঞ্জ-৩০০০।

অফিস :

  • ই-মেইল : [email protected]
  • ওয়েবসাইট : www.sunamkantha.com