বিশ্বজিত রায়::
পাহাড়ি ঢলের সাথে পরিকল্পনাহীন অব্যবস্থাপনাই হাওরে জলাবদ্ধ বন্যা ডেকে আনছে। হাওরাঞ্চলের নদ-নদী ও খাল-বিল ভরাটসহ নিষ্কাশনের পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতার শিকার বোরো চাষীরা। এবার জলাবদ্ধতা থেকে ফলন বাঁচাতে প্রায় ৩০টিরও বেশি বাঁধ কেটে দিয়েছে কৃষক। বাঁধ কাটার ঘটনায় ১৪৪ ধারা পর্যন্ত জারি করতে হয়েছে প্রশাসনকে।
বিগত প্রায় এক দশকে ফসল রক্ষা বাঁধ মেরামতের নামে সরকারের হাজার কোটি টাকা ব্যয় হলেও কৃষক তার সুফল পায়নি। দায়সারা বাঁধ দিয়ে হাওরে এক ধরনের কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হয়েছে দাবি হাওর বিশ্লেষকদের।
২০১৭ সালে প্রলয়ঙ্করী হাওর বিপর্যয়ের পর কৃষক ও হাওর আন্দোলনের লোকজনের দাবির মুখে বাঁধের কাজ সংক্রান্ত নীতিমালায় পরিবর্তন আনে সরকার। ২০১৮ সাল থেকে নতুন নীতিমালা অনুযায়ী প্রশাসন, পাউবো, কৃষক ও জনপ্রতিনিধিদের সমন্বয়ে প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি (পিআইসি) কাজ শুরু করে বাঁধে। এরপর থেকে যত্রতত্র বাঁধ দিয়ে গোটা হাওরাঞ্চলকে বিপদে ফেলা হয়েছে। বাঁধের কাজে পরিকল্পনার অভাব, ব্যাপক অনিয়ম-দুর্নীতি, অদক্ষতা ও জবাবদিহিতা না থাকার অভিযোগ আছে পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) বিরুদ্ধে। সরেজমিনে দেখা যায়, বারবার বাঁধ দেওয়ার ফলে স্থায়ী রাস্তায় রূপ নেওয়ার অবস্থা হয়েছে হাওরের অনেক জায়গায়। বাঁধ দিয়ে হাওরকেন্দ্রিক অনেক নদীর গতিপথও থামিয়ে দেওয়া হচ্ছে। পাগনা হাওরের অভ্যন্তরে প্রবেশ করা আলীপুর গ্রামসংলগ্ন পিয়াইন নদীর মুখে গত আট বছর ধরে বাঁধ (বৌগলাখালি বাঁধ) দিয়ে আসছে পাউবো। শান্তিগঞ্জ উপজেলার দেখার হাওরের ভেতরে প্রবেশ করা মহাশিং নদীর মাঝ বরাবর বাঁধ (উথারিয়া বাঁধ) দিয়ে ওই হাওরের অনেক জমি জলাবদ্ধতার দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে ৭১০টি প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে ১৪৫ কোটি টাকা। এই প্রকল্প বাস্তবায়নে হাওরের কান্দা ও জাঙ্গাল কেটে ৩১ লাখ ২১ হাজার ঘনমিটার মাটি আনা হয়েছে বাঁধে। ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরে ১৪৫ কোটি টাকার ৬৮৪টি প্রকল্পে মাটি কাটা হয়েছিল ৩০ লাখ ৪০ হাজার ৩৮৮ ঘনমিটার। ২০২৩-২০২৪ অর্থবছরে ৭৩৪টি প্রকল্পের আওতায় ১০৩ কোটি টাকা ব্যয়ে মাটি কাটা হয়েছিল ৩২ লাখ ৮ হাজার ২৩৩ ঘনমিটার। তিন বছরে দুই হাজার ১৩৬টি ফসল রক্ষা বাঁধ সংস্কার ও মেরামত কাজে ৯৩ লাখ ৬৯ হাজার ৬৮৮ ঘনমিটার মাটি বাঁধে ফেলা হয়েছে। পাউবো’র তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে প্রায় ১৫১ কোটি টাকা ব্যয়ে ৯৬৫টি প্রকল্পে ১ হাজার ৩৪ কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণ ও সংস্কার করা হয়। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ৮০ কোটি টাকা, ২০১৯-২০ অর্থবছরে ১০২ কোটি টাকা, ২০২০-২১ অর্থবছরে ১০১ কোটি টাকা, ২০২১-২২ অর্থবছরে ৯৫ কোটি টাকা, ২০২২-২৩ সালে সবচেয়ে বেশি ১ হাজার ৬৪টি প্রকল্পে ব্যয় হয় ১৫৫ কোটি টাকা। প্রতি বছরেই হাওরের কান্দা ও জাঙ্গাল কেটে মাটি ফেলা হচ্ছে বাঁধে। এই মাটিতে ভরাট হচ্ছে নদী এবং হাওরের ডোবা, নালা ও বিল। দিন দিন ভরাটের মাত্রা বৃদ্ধি পাওয়ায় জলাবদ্ধতা চরম আকার ধারণ করেছে বলে মনে করছেন কৃষক।
জামালগঞ্জের মহালিয়া হাওরের বড় কৃষক দেবাশীষ তালুকদার বলেন, যেভাবে বাঁধ দেওয়া হয় তাতে পানি নামার কোন রাস্তা থাকে না। নদী, খাল-বিল তো ভরাট হচ্ছেই। সবকিছু জানাবোঝা করেই কাজ করা লাগে। কিন্তু বাঁধ দিতে গিয়ে কৃষক ও হাওর গবেষক কারও কোন মতামত নেওয়া হয় না। যে কারণে এইবার হাওরে পানি জমে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে।
সুনামগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, সুনামগঞ্জে হাওরে ২ লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে হাওরে ১ লাখ ৬৫ হাজার ২৭৫ হেক্টর ও নন হাওরে ৫৮ হাজার ২৩৬ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ করেছেন কৃষক। জেলায় কার্ডধারী ৩ লাখ ৬৫ হাজার ৭৭৭ জন কৃষকের মাঝে ২ লাখ ২৩ হাজার ৮০৭ জনই ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষক। এবার জলাবদ্ধতায় প্রায় সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
হাওর গবেষক পাভেল পার্থ বলেন, সর্বাধিক হাওর, বিল ও নদীসমৃদ্ধ প্রাকৃতিক জলাধার রয়েছে সুনামগঞ্জে। হাওর সুরক্ষায় জলাভূমি খননের দাবি উঠেছিল আশির দশকে ভাসান পানির আন্দোলনের সময়। কিন্তু খনন না করে ফসল রক্ষা বাঁধের নামে হাওরে ভূমির শ্রেণিবিন্যাস বদলে ফেলা হচ্ছে। বিপর্যয়ের যেকটা কারণ তার মধ্যে বেড়িবাঁধ অন্যতম।
গৎবাঁধা অপরিকল্পিত বাঁধেই বিপর্যয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, হাওরে পানি ব্যবস্থাপনার অন্যতম আধার জাঙ্গাল। বোরো মৌসুমের শুরুতে জাঙ্গাল কাটা হতো, প্রয়োজনে আবার বন্ধ করে ফেলা হতো। বাঁধ দিতে গিয়ে জাঙ্গাল-কান্দা সব কেটে ফেলা হচ্ছে। এতে হাওরের বৈশিষ্ট্য মরে যাচ্ছে। বাঁধ ও মাটি বাণিজ্যের অনৈতিক ধান্দা হাওরে জলাবদ্ধতা ও বন্যা সৃষ্টি করছে। হাওরকেন্দ্রিক জলাধার খনন ও সুদূরপ্রসারী সুষ্ঠু পরিকল্পনার তাগিদ দিয়ে এই গবেষক বলেন, ভারতের চেরাপুঞ্জি পৃথিবীর সর্বাধিক বৃষ্টিপ্রবণ এলাকা। হাওরাঞ্চল এর ভাটিতে হওয়ায় এখানে বৃষ্টি হবে, ঢলও নামবে। এক সময় পানির ধারণ ক্ষমতা হাওর ও নদীর ছিল। সব ভরাট হয়ে যাওয়ায় হাওরে জলাবদ্ধ বন্যা দেখা দিচ্ছে।
তিনি বলেন, বাঁধের নামে হাওরে কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হচ্ছে। কোথায় বাঁধ, কোথায় জলকপাট দিতে হবে, এ ব্যাপারে কৃষকই বড় পরিকল্পনাবিদ। হাওর নিয়ে কাজ করা সংগঠন, ব্যক্তি ও কৃষকের মতামতকে গুরুত্ব দিতে হবে।
এ ব্যাপারে শাহজালাল বিজ্ঞান প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি ও খনিজ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মিজানুর রহমান বলেন, একটা বাঁধ করার পর প্রতি বছর ভাঙবে, আবার করা হবে, এটা কোন টেকসই ব্যবস্থাপনা হতে পারে না। বাঁধের মাটি ও পাহাড়ি ঢলের পলি পড়ে হাওর-নদী ভরাট হচ্ছে। এগুলো খনন না করলে জলাবদ্ধতার সঙ্কট আরও ঘনীভূত হবে। তিনি বলেন, বছরের পর বছর বাঁধ দিয়ে পকেট ভারির চিন্তা না করে আন্তরিকতা নিয়ে কাজ করলেই হয়। এ জন্য পুর-পরিবেশ প্রকৌশলী, স্থানীয় ও হাওর বিশেষজ্ঞ মতামতের ভিত্তিতে পরিকল্পনা সাজাতে হবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী বাঁধ, জলকপাট ও পানি নিষ্কাশনের পথ করতে হবে।
সুনামগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. ওমর ফারুক বলেন, বাঁধের মাটি স্বাভাবিকভাবে নদী কিংবা হাওরে গিয়ে পড়ে। এতে নদীর নাব্যতা কমছে, হাওর অভ্যন্তরের খাল-বিলও ভরাট হচ্ছে। নদী ও হাওরের খাল-বিল খননের বিষয়টি সব জায়গাতেই আলোচনা হচ্ছে।
সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মামুন হাওলাদার বলেন, জলাবদ্ধতা নিরসনে হাওর ও নদী খননের পরিকল্পনা আছে। বাঁধের কাজ যে নিয়মে হচ্ছে সে রকমই হবে। হাওরের বিশেষ বিশেষ জায়গা দেখে জলকপাট নির্মাণের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
সুনামগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য কামরুজ্জামান কামরুল বলেন, ইতিমধ্যে খননের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। ধারাবাহিকভাবে হাওরাঞ্চলের নদী-খাল-বিলও খননের আওতায় আসবে। হাওরে যেভাবে বাঁধ দেওয়া হচ্ছে সেই নিয়মের পরিবর্তন দরকার।
পাহাড়ি ঢলের সাথে পরিকল্পনাহীন অব্যবস্থাপনাই হাওরে জলাবদ্ধ বন্যা ডেকে আনছে। হাওরাঞ্চলের নদ-নদী ও খাল-বিল ভরাটসহ নিষ্কাশনের পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতার শিকার বোরো চাষীরা। এবার জলাবদ্ধতা থেকে ফলন বাঁচাতে প্রায় ৩০টিরও বেশি বাঁধ কেটে দিয়েছে কৃষক। বাঁধ কাটার ঘটনায় ১৪৪ ধারা পর্যন্ত জারি করতে হয়েছে প্রশাসনকে।
বিগত প্রায় এক দশকে ফসল রক্ষা বাঁধ মেরামতের নামে সরকারের হাজার কোটি টাকা ব্যয় হলেও কৃষক তার সুফল পায়নি। দায়সারা বাঁধ দিয়ে হাওরে এক ধরনের কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হয়েছে দাবি হাওর বিশ্লেষকদের।
২০১৭ সালে প্রলয়ঙ্করী হাওর বিপর্যয়ের পর কৃষক ও হাওর আন্দোলনের লোকজনের দাবির মুখে বাঁধের কাজ সংক্রান্ত নীতিমালায় পরিবর্তন আনে সরকার। ২০১৮ সাল থেকে নতুন নীতিমালা অনুযায়ী প্রশাসন, পাউবো, কৃষক ও জনপ্রতিনিধিদের সমন্বয়ে প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি (পিআইসি) কাজ শুরু করে বাঁধে। এরপর থেকে যত্রতত্র বাঁধ দিয়ে গোটা হাওরাঞ্চলকে বিপদে ফেলা হয়েছে। বাঁধের কাজে পরিকল্পনার অভাব, ব্যাপক অনিয়ম-দুর্নীতি, অদক্ষতা ও জবাবদিহিতা না থাকার অভিযোগ আছে পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) বিরুদ্ধে। সরেজমিনে দেখা যায়, বারবার বাঁধ দেওয়ার ফলে স্থায়ী রাস্তায় রূপ নেওয়ার অবস্থা হয়েছে হাওরের অনেক জায়গায়। বাঁধ দিয়ে হাওরকেন্দ্রিক অনেক নদীর গতিপথও থামিয়ে দেওয়া হচ্ছে। পাগনা হাওরের অভ্যন্তরে প্রবেশ করা আলীপুর গ্রামসংলগ্ন পিয়াইন নদীর মুখে গত আট বছর ধরে বাঁধ (বৌগলাখালি বাঁধ) দিয়ে আসছে পাউবো। শান্তিগঞ্জ উপজেলার দেখার হাওরের ভেতরে প্রবেশ করা মহাশিং নদীর মাঝ বরাবর বাঁধ (উথারিয়া বাঁধ) দিয়ে ওই হাওরের অনেক জমি জলাবদ্ধতার দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে ৭১০টি প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে ১৪৫ কোটি টাকা। এই প্রকল্প বাস্তবায়নে হাওরের কান্দা ও জাঙ্গাল কেটে ৩১ লাখ ২১ হাজার ঘনমিটার মাটি আনা হয়েছে বাঁধে। ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরে ১৪৫ কোটি টাকার ৬৮৪টি প্রকল্পে মাটি কাটা হয়েছিল ৩০ লাখ ৪০ হাজার ৩৮৮ ঘনমিটার। ২০২৩-২০২৪ অর্থবছরে ৭৩৪টি প্রকল্পের আওতায় ১০৩ কোটি টাকা ব্যয়ে মাটি কাটা হয়েছিল ৩২ লাখ ৮ হাজার ২৩৩ ঘনমিটার। তিন বছরে দুই হাজার ১৩৬টি ফসল রক্ষা বাঁধ সংস্কার ও মেরামত কাজে ৯৩ লাখ ৬৯ হাজার ৬৮৮ ঘনমিটার মাটি বাঁধে ফেলা হয়েছে। পাউবো’র তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে প্রায় ১৫১ কোটি টাকা ব্যয়ে ৯৬৫টি প্রকল্পে ১ হাজার ৩৪ কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণ ও সংস্কার করা হয়। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ৮০ কোটি টাকা, ২০১৯-২০ অর্থবছরে ১০২ কোটি টাকা, ২০২০-২১ অর্থবছরে ১০১ কোটি টাকা, ২০২১-২২ অর্থবছরে ৯৫ কোটি টাকা, ২০২২-২৩ সালে সবচেয়ে বেশি ১ হাজার ৬৪টি প্রকল্পে ব্যয় হয় ১৫৫ কোটি টাকা। প্রতি বছরেই হাওরের কান্দা ও জাঙ্গাল কেটে মাটি ফেলা হচ্ছে বাঁধে। এই মাটিতে ভরাট হচ্ছে নদী এবং হাওরের ডোবা, নালা ও বিল। দিন দিন ভরাটের মাত্রা বৃদ্ধি পাওয়ায় জলাবদ্ধতা চরম আকার ধারণ করেছে বলে মনে করছেন কৃষক।
জামালগঞ্জের মহালিয়া হাওরের বড় কৃষক দেবাশীষ তালুকদার বলেন, যেভাবে বাঁধ দেওয়া হয় তাতে পানি নামার কোন রাস্তা থাকে না। নদী, খাল-বিল তো ভরাট হচ্ছেই। সবকিছু জানাবোঝা করেই কাজ করা লাগে। কিন্তু বাঁধ দিতে গিয়ে কৃষক ও হাওর গবেষক কারও কোন মতামত নেওয়া হয় না। যে কারণে এইবার হাওরে পানি জমে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে।
সুনামগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, সুনামগঞ্জে হাওরে ২ লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে হাওরে ১ লাখ ৬৫ হাজার ২৭৫ হেক্টর ও নন হাওরে ৫৮ হাজার ২৩৬ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ করেছেন কৃষক। জেলায় কার্ডধারী ৩ লাখ ৬৫ হাজার ৭৭৭ জন কৃষকের মাঝে ২ লাখ ২৩ হাজার ৮০৭ জনই ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষক। এবার জলাবদ্ধতায় প্রায় সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
হাওর গবেষক পাভেল পার্থ বলেন, সর্বাধিক হাওর, বিল ও নদীসমৃদ্ধ প্রাকৃতিক জলাধার রয়েছে সুনামগঞ্জে। হাওর সুরক্ষায় জলাভূমি খননের দাবি উঠেছিল আশির দশকে ভাসান পানির আন্দোলনের সময়। কিন্তু খনন না করে ফসল রক্ষা বাঁধের নামে হাওরে ভূমির শ্রেণিবিন্যাস বদলে ফেলা হচ্ছে। বিপর্যয়ের যেকটা কারণ তার মধ্যে বেড়িবাঁধ অন্যতম।
গৎবাঁধা অপরিকল্পিত বাঁধেই বিপর্যয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, হাওরে পানি ব্যবস্থাপনার অন্যতম আধার জাঙ্গাল। বোরো মৌসুমের শুরুতে জাঙ্গাল কাটা হতো, প্রয়োজনে আবার বন্ধ করে ফেলা হতো। বাঁধ দিতে গিয়ে জাঙ্গাল-কান্দা সব কেটে ফেলা হচ্ছে। এতে হাওরের বৈশিষ্ট্য মরে যাচ্ছে। বাঁধ ও মাটি বাণিজ্যের অনৈতিক ধান্দা হাওরে জলাবদ্ধতা ও বন্যা সৃষ্টি করছে। হাওরকেন্দ্রিক জলাধার খনন ও সুদূরপ্রসারী সুষ্ঠু পরিকল্পনার তাগিদ দিয়ে এই গবেষক বলেন, ভারতের চেরাপুঞ্জি পৃথিবীর সর্বাধিক বৃষ্টিপ্রবণ এলাকা। হাওরাঞ্চল এর ভাটিতে হওয়ায় এখানে বৃষ্টি হবে, ঢলও নামবে। এক সময় পানির ধারণ ক্ষমতা হাওর ও নদীর ছিল। সব ভরাট হয়ে যাওয়ায় হাওরে জলাবদ্ধ বন্যা দেখা দিচ্ছে।
তিনি বলেন, বাঁধের নামে হাওরে কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হচ্ছে। কোথায় বাঁধ, কোথায় জলকপাট দিতে হবে, এ ব্যাপারে কৃষকই বড় পরিকল্পনাবিদ। হাওর নিয়ে কাজ করা সংগঠন, ব্যক্তি ও কৃষকের মতামতকে গুরুত্ব দিতে হবে।
এ ব্যাপারে শাহজালাল বিজ্ঞান প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি ও খনিজ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মিজানুর রহমান বলেন, একটা বাঁধ করার পর প্রতি বছর ভাঙবে, আবার করা হবে, এটা কোন টেকসই ব্যবস্থাপনা হতে পারে না। বাঁধের মাটি ও পাহাড়ি ঢলের পলি পড়ে হাওর-নদী ভরাট হচ্ছে। এগুলো খনন না করলে জলাবদ্ধতার সঙ্কট আরও ঘনীভূত হবে। তিনি বলেন, বছরের পর বছর বাঁধ দিয়ে পকেট ভারির চিন্তা না করে আন্তরিকতা নিয়ে কাজ করলেই হয়। এ জন্য পুর-পরিবেশ প্রকৌশলী, স্থানীয় ও হাওর বিশেষজ্ঞ মতামতের ভিত্তিতে পরিকল্পনা সাজাতে হবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী বাঁধ, জলকপাট ও পানি নিষ্কাশনের পথ করতে হবে।
সুনামগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. ওমর ফারুক বলেন, বাঁধের মাটি স্বাভাবিকভাবে নদী কিংবা হাওরে গিয়ে পড়ে। এতে নদীর নাব্যতা কমছে, হাওর অভ্যন্তরের খাল-বিলও ভরাট হচ্ছে। নদী ও হাওরের খাল-বিল খননের বিষয়টি সব জায়গাতেই আলোচনা হচ্ছে।
সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মামুন হাওলাদার বলেন, জলাবদ্ধতা নিরসনে হাওর ও নদী খননের পরিকল্পনা আছে। বাঁধের কাজ যে নিয়মে হচ্ছে সে রকমই হবে। হাওরের বিশেষ বিশেষ জায়গা দেখে জলকপাট নির্মাণের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
সুনামগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য কামরুজ্জামান কামরুল বলেন, ইতিমধ্যে খননের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। ধারাবাহিকভাবে হাওরাঞ্চলের নদী-খাল-বিলও খননের আওতায় আসবে। হাওরে যেভাবে বাঁধ দেওয়া হচ্ছে সেই নিয়মের পরিবর্তন দরকার।