বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের হাওর এলাকা দেশের খাদ্যনিরাপত্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। বিশেষ করে সুনামগঞ্জসহ হাওরাঞ্চল একফসলি হওয়ায় এখানকার কৃষকরা পুরোপুরি বোরো ধানের ওপর নির্ভরশীল। প্রতি বছর আগাম বন্যা, অপরিকল্পিত বাঁধ নির্মাণ, দুর্বল পানি ব্যবস্থাপনা এবং প্রশাসনিক ত্রুটির কারণে ফসলহানির পুনরাবৃত্তি একটি দীর্ঘস্থায়ী সংকটে পরিণত হয়েছে। এমন প্রেক্ষাপটে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রীর স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণের ঘোষণা নিঃসন্দেহে সময়োপযোগী ও আশাব্যঞ্জক। তবে এই ঘোষণার কার্যকর বাস্তবায়নই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
হাওর রক্ষায় অতীতে বহু প্রকল্প নেওয়া হলেও সেগুলোর বেশিরভাগই ছিল অস্থায়ী ও অপরিকল্পিত। ঠিকাদার নির্ভরতা, দুর্নীতি এবং জবাবদিহিতার অভাবে প্রতিবছর একই সমস্যার পুনরাবৃত্তি ঘটছে। মন্ত্রীর বক্তব্যে “জনগণের টাকা অপচয় করা যাবে না” এবং “অপরিকল্পিত প্রকল্প নেওয়া যাবে না” - এই অঙ্গীকার বাস্তবে রূপ নিতে হলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে কঠোর নজরদারির আওতায় আনতে হবে। বিশেষ করে পানি উন্নয়ন বোর্ডের কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা জরুরি।
ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা প্রণয়ন নিয়েও প্রতিবছর অভিযোগ ওঠে। প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের বাদ দিয়ে প্রভাবশালীদের অন্তর্ভুক্তির প্রবণতা জনঅসন্তোষ তৈরি করে। তাই তালিকা তৈরিতে প্রযুক্তিনির্ভর যাচাই, স্থানীয় অংশগ্রহণ এবং স্বাধীন পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা চালু করা প্রয়োজন। কৃষকদের জন্য বিশেষ কার্ড প্রদান এবং তিন মাস সহায়তার উদ্যোগ ইতিবাচক হলেও তা যেন কোনোভাবেই অনিয়মের শিকার না হয়, সেদিকে বিশেষ দৃষ্টি রাখতে হবে।
দীর্ঘমেয়াদে হাওর রক্ষার জন্য টেকসই অবকাঠামো নির্মাণ অপরিহার্য। প্রতিবছর অস্থায়ী বাঁধ নির্মাণে বিপুল অর্থ ব্যয় না করে স্থায়ী বাঁধ, কার্যকর স্লুইইস গেট এবং নদী-খাল খননের মাধ্যমে পানি প্রবাহের স্বাভাবিক ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। একইসঙ্গে প্রকৌশলীদের মাধ্যমে বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনা গ্রহণ এবং স্থানীয় বাস্তবতা বিবেচনায় নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বজ্রপাত থেকে কৃষকদের সুরক্ষায় ছোট ছোট আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। তবে এসব কেন্দ্রের অবস্থান, রক্ষণাবেক্ষণ এবং ব্যবহারের বিষয়ে সচেতনতা তৈরি না হলে এর সুফল মিলবে না। দুর্যোগ পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ ব্যবস্থাও আরও উন্নত করা প্রয়োজন।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো- হাওর সমস্যার সমাধান কেবল একটি মন্ত্রণালয়ের একক দায়িত্ব নয়। কৃষি, পানি স¤পদ, পরিবেশ, মৎস্য এবং স্থানীয় সরকার সবখাতের সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া টেকসই সমাধান সম্ভব নয়। পাশাপাশি স্থানীয় জনগণকে পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে স¤পৃক্ত করতে হবে, যাতে প্রকল্পগুলো বাস্তবমুখী ও গ্রহণযোগ্য হয়।
সরকারের সদিচ্ছা এবং নীতিগত ঘোষণা ইতিবাচক হলেও হাওরবাসীর দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা বলছে- ঘোষণার চেয়ে বাস্তবায়নই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তাই এবার প্রয়োজন কথার চেয়ে কাজে প্রমাণ। যদি স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং পরিকল্পিত উদ্যোগ নিশ্চিত করা যায়, তবে হাওরের কৃষকরা প্রতি বছরের অনিশ্চয়তা থেকে মুক্তি পেতে পারেন। অন্যথায়, এই ঘোষণা কেবল আরেকটি আশার বাণী হয়েই থেকে যাবে।