ধান নিয়ে চতুর্মুখী বিপদে কৃষক

আপলোড সময় : ২৮-০৪-২০২৬ ০৯:৩৬:৩২ পূর্বাহ্ন , আপডেট সময় : ২৮-০৪-২০২৬ ০৯:৪০:৪৩ পূর্বাহ্ন
বিশ্বজিত রায়::
সুনামগঞ্জের হাওরে এখনও অর্ধেকের বেশি ধান কাটা অবশিষ্ট আছে। এর মধ্যে হাওরাঞ্চলে বজ্রসহ ভারি বৃষ্টি হওয়ায় পাকা ধান কাটতে পারছেন না কৃষক। বাড়তি মজুরিতে যতটুকু কাটতে পারছে বৃষ্টির কারণে তাও নষ্ট হচ্ছে। এক মাসেরও বেশি সময়ের বৃষ্টিতে পানি লেগে অনেক জায়গায় ধান কাঁচা রয়ে গেছে। এর মাঝে বন্যার আশঙ্কা দেখা দেওয়ায় হাওরজুড়ে আতঙ্ক বিরাজ করছে।

রবিবার রাত থেকে সোমবার সন্ধ্যা পর্যন্ত সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলে মুষলধারে বৃষ্টি হয়েছে। আগামী তিনদিন টানা বৃষ্টির পূর্বাভাস দিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। এই পরিস্থিতিতে হাওর ও নদীর পানি বাড়তে থাকায় অবশিষ্ট ধান কাটা নিয়ে উৎকণ্ঠায় পড়েছেন কৃষক।** সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ড এক বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, উত্তর-পূর্বাঞ্চলের হাওর অববাহিকা ও তৎসংলগ্ন উজানে ২৮ থেকে ৩০ এপ্রিল ভারি ও অতিভারি বৃষ্টি হতে পারে। এতে হাওর এলাকার সুরমা-কুশিয়ারাসহ অন্যান্য নদীর পানি বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ার পাশাপাশি আকস্মিক বন্যার সম্ভাবনাও রয়েছে। এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হলে বোরো ফসলের ক্ষয়ক্ষতির বিষয়টি উল্লেখ করেছে পাউবো। এ অবস্থায় হাওরাঞ্চলে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ভারি বৃষ্টিপাতের ফলে ধান কাটতে পারছেন না কৃষক। শ্রমিক সংকটের পাশাপাশি জমিতে পানি লেগে থাকায় কম্বাইন হারভেস্টার যন্ত্রও নামানো সম্ভব হচ্ছে না। বাড়তি মজুরি দিয়ে অনেকে ধান কাটতে পারলেও রোদ না থাকায় স্তূপ করা ধানে অংকুর গজানোর অবস্থা হয়েছে কৃষকের। এ নিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় ভোগছেন লক্ষাধিক কৃষক পরিবার। 

পাগনা হাওরের চাইর (চার) আনা ধান কাটা হইছে। পানি থাকায় ধান তো মেশিনদি কাটা যার না। মেশিনও কম, মানুষও (শ্রমিক) কম। লাগাতার বৃষ্টি হওয়ায় ধান তো শুকানিও যার না, কাইট্যাই কিতা করব। মাইনষের খলার মাঝে কাটা ধান পইড়া আছে। ধানও গন্ধ ধরিলাইছে। সবাই খুব কষ্টের মধ্যে আছে।’ ধান নিয়ে উদ্বেগের কথা বলছিলেন সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার লক্ষণশ্রী ইউনিয়নের গোবিন্দপুর গ্রামের কৃষক মো. রেনু মিয়া। 

তাহিরপুরের শাহাগঞ্জ গ্রামের কৃষক জিয়াউর রহমান বলেন, ধান তো কাটা হইতাছে না। শনির হাওরের ধান এখনও অর্ধেক বাকি আছে। ৪০ ভাগের মতো কাটা হইছে। আমার ২০-২২ কিয়ার (৩০ শতকে এক কিয়ার) জমির মাঝে ৮ কিয়ারের মতো কাটছি। কিন্তু রইদ (রোদ) না থাকায় শুকাইতে পারতাছি না। বৃষ্টিতে আতঙ্কগ্রস্ত ওই কৃষক বলেন, হাঁটুহিমা-উরাতহিমা (হাঁটু ও উরু সমান) পানি থাকায় বেপারিও ক্ষেতে নামে না। যে বৃষ্টি দিতাছে, মনে হয় না মানুষ ধান কাইট্যা (কেটে) ঠিকভাবে ঘরে তুলতে পারব। জেলা কৃষি অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সুনামগঞ্জের ১২ উপজেলার ১৩৭টি হাওরে এ বছর ২ লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর জমিতে বোরো চাষাবাদ হয়েছে। যার উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা প্রায় ১৪ লাখ মেট্রিক টন। উৎপাদিত বোরো ধানের মূল্য প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা। জেলায় বছরে প্রায় সাড়ে ৫ লাখ মেট্রিক টন চালের চাহিদার বিপরীতে উৎপাদন হয় সাড়ে ১১ লাখ মেট্রিক টন। উদ্বৃত্ত ৬ লাখ মেট্রিক টন চাল দেশের খাদ্যভা-ারে যুক্ত হয়। কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, সোমবার পর্যন্ত ৯২ হাজার ১১৮ হেক্টর জমির ধান কাটা হয়েছে। ১ লাখ ৩১ হাজার ৩৯৩ হেক্টর জমির ধান কাটা এখনও বাকি আছে। এ পর্যন্ত হাওর ও নন হাওরে ৪১ ভাগ জমির ধান কাটতে পেরেছে কৃষক।
জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য মতে, সুনামগঞ্জে এ বছর ১৪৫ কোটি টাকা প্রাক্কলিত ব্যয় ধরে ৭১০টি প্রকল্পে ৬০২ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ নির্মাণ ও সংস্কার কাজ করেছে।
শাল্লা হাওর বাঁচাও আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক জয়ন্ত সেন বলেন, ধান নিয়ে চতুর্মুখী বিপদে পড়েছেন কৃষক। ধান কেটে আনতে পারছে না, আনতে পারলেও শুকাতে পারছে না। কিয়ার প্রতি কাটাতেই চার-পাঁচ হাজার টাকা চলে যাচ্ছে। ধান বহন করে বাড়ির ধারে-কাছে নিয়ে আসতে আরও খরচ হচ্ছে। শ্রমিক না পেয়ে জলে বাসা ফলনের আশা একরকম ছেড়েই দিয়েছেন অনেকে।
সুনামগঞ্জ কৃষক সংগ্রাম সমিতির সহ-সভাপতি ও ধর্মপাশা উপজেলার বাসিন্দা খায়রুল বশর ঠাকুর খান বলেন, দৈনিক এক হাজার থেকে ১৫শ’ টাকায় শ্রমিক নিয়ে ধান কাটাচ্ছেন কৃষক। নিজেরাও হাড়খাটুনি পরিশ্রম করছেন। যেটুকু কাটতে পেরেছেন সেটাও অংকুর গজিয়ে নষ্ট হওয়ার অবস্থা হচ্ছে। টানা বৃষ্টিতে চরম বিপর্যস্ত অবস্থায় আছে কৃষক।
সুনামগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মোহাম্মদ ওমর ফারুক বলেন, জেলার ১৩৭টি হাওরের শতভাগ ধান কাটতে মে মাসের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত লাগবে। আমরা দ্রুত ধান কাটতে কৃষকদের নির্দেশনা দিলেও যেভাবে বৃষ্টি হচ্ছে তাতে কৃষক-শ্রমিক কেউই জমিতে নামতে পারছেন না। টানা বৃষ্টি হওয়ায় হাওরে উৎকণ্ঠা ছড়িয়ে পড়েছে।
সুনামগঞ্জ পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মামুন হাওলাদার বলেন, মঙ্গলবার থেকে টানা তিন দিন ভারতের চেরাপুঞ্জিসহ জেলার হাওরাঞ্চলে ভারী থেকে অতিভারী বৃষ্টি হবে। এতে নদনদীর পানি আরও বাড়তে থাকবে।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এখন পর্যন্ত হাওর রক্ষা বাঁধের কোন ক্ষয়ক্ষতি হয়নি। তবে টানা বৃষ্টিতে হাওর রক্ষা বাঁধের মাটি দুর্বল হয়ে পড়েছে। পাহাড়ি ঢল নামলে সেই চাপ সামলানো কঠিন হবে।

সম্পাদকীয় :

  • সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি : মো. জিয়াউল হক
  • সম্পাদক ও প্রকাশক : বিজন সেন রায়
  • বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : মোক্তারপাড়া রোড, সুনামগঞ্জ-৩০০০।

অফিস :

  • ই-মেইল : [email protected]
  • ওয়েবসাইট : www.sunamkantha.com