সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজার ও মধ্যনগর - দুটি ভিন্ন এলাকা, কিন্তু সংকট এক ও অভিন্ন: অবৈধ বালু উত্তোলন। একদিকে সোনালী চেলা নদীর পাড় কেটে নির্বিচারে বালু উত্তোলনে বিলুপ্তির পথে একের পর এক গ্রাম; অন্যদিকে গুমাই নদীতে ড্রেজার বসিয়ে প্রশাসনের নাকের ডগায় চলছে একই ধ্বংসযজ্ঞ। এই চিত্র শুধু স্থানীয় সংকট নয় - এটি সারা দেশের নদী ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা ও আইনের শাসনের প্রশ্নকে সামনে নিয়ে আসে।
নদী কোনো খনিজ ভা-ার নয় যে, ইচ্ছেমতো তুলে নেওয়া যাবে। নদী একটি জীবন্ত ব্যবস্থা - এর প্রবাহ, তীর, তলদেশ, আশপাশের কৃষি ও বসতি সবই একটি ভারসাম্যের অংশ। সেই ভারসাম্য ভেঙে গেলে এর প্রভাব পড়ে ভয়াবহভাবে। সোনালী চেলা নদীর তীরে ইতোমধ্যে বসতবাড়ি বিলীন, শত শত বিঘা ফসলি জমি নদীগর্ভে চলে গেছে। এখন আরও কয়েকটি গ্রাম মানচিত্র থেকে মুছে যাওয়ার দ্বারপ্রান্তে। এটি কেবল প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়; বরং মানুষের তৈরি বিপর্যয়।
বালু উত্তোলনের জন্য সরকার নির্ধারিত নীতিমালা থাকলেও বাস্তবে তার প্রয়োগ প্রশ্নবিদ্ধ। অভিযোগ রয়েছে- ইজারার আড়ালে, কিংবা ইজারার সীমা লঙ্ঘন করে, প্রভাবশালী সিন্ডিকেট নদীর পাড় কেটে বালু তুলছে। এতে নদীর স্বাভাবিক গতিপথ পরিবর্তিত হচ্ছে, তীর ভাঙন তীব্র হচ্ছে এবং জনপদ ধ্বংস হচ্ছে। আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো- প্রতিবাদ করলে সাধারণ মানুষকে ভয়ভীতি, মামলা এমনকি হামলার হুমকি দেওয়া হচ্ছে।
মধ্যনগরের গুমাই নদীর ঘটনাও একইভাবে উদ্বেগজনক। প্রকাশ্য দিবালোকে ড্রেজার বসিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বালু উত্তোলন চললেও কার্যকর পদক্ষেপের অভাব প্রশ্ন তোলে - প্রশাসনের সক্ষমতা নাকি সদিচ্ছার ঘাটতি? অভিযোগ, স্থানীয় প্রভাবশালীদের স¤পৃক্ততা থাকায় বিষয়টি উপেক্ষিত হচ্ছে। যদি সত্যিই তা হয়, তবে এটি শুধু প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়, বরং রাষ্ট্রের ন্যায়বিচার ব্যবস্থার জন্যও একটি অশনিসংকেত।
এই প্রেক্ষাপটে কিছু জরুরি পদক্ষেপ এখন সময়ের দাবি প্রথমত, অবৈধ বালু উত্তোলন অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। প্রয়োজনে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে ড্রেজার জব্দ ও দায়ীদের শাস্তির আওতায় আনতে হবে। দ্বিতীয়ত, নদী ভাঙনপ্রবণ এলাকাগুলোতে জরুরি ভিত্তিতে টেকসই প্রতিরক্ষা বাঁধ নির্মাণ করতে হবে। তৃতীয়ত, বালু মহাল ইজারা প্রদানের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে এবং স্থানীয় জনগণের মতামতকে গুরুত্ব দিতে হবে। চতুর্থত, প্রশাসনের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে—কোনো অভিযোগ উপেক্ষিত হলে তার কারণ খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। পঞ্চমত, নদী ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে, যাতে পরিবেশ, কৃষি ও জনজীবনের ভারসাম্য রক্ষা পায়।
নদী রক্ষা মানেই জনপদ রক্ষা। আজ যে গ্রাম ভাঙছে, কাল তা অন্য কোথাও পুনরাবৃত্তি হবে - যদি আমরা এখনই কঠোর অবস্থান না নিই। উন্নয়নের নামে প্রকৃতিকে ধ্বংস করে টেকসই ভবিষ্যৎ গড়া সম্ভব নয়। তাই সময় এসেছে- সিন্ডিকেট নয়, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার; লুটপাট নয়, প্রাকৃতিক স¤পদের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার। রাষ্ট্র ও প্রশাসনের প্রতি আমাদের আহ্বান- অবিলম্বে কার্যকর পদক্ষেপ নিন। নইলে নদী হারাবে তার গতি, আর মানুষ হারাবে তার বসতি।