আমীন আল রশীদ::
এরশাদের শাসনামলে ১৯৮৮ সালে যখন অষ্টম সংশোধনীর মধ্য দিয়ে ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে সংবিধানে যুক্ত করা হয়, তখন এই বিলের বিরুদ্ধে সংসদে জ্বালাময়ী বক্তৃতা দিয়েছিলেন নুরুল ইসলাম মনি। তিনি তখন বরগুনা-২ আসন থেকে নির্বাচিত স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য।
ইসলামকে রাষ্ট্রধর্মের স্বীকৃতি দেওয়ার ঘটনাকে ‘রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের উপলক্ষ্য’ মন্তব্য করে নুরুল ইসলাম মনি তখন সংসদে বলেছিলেন, “আজকে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম করার পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশে যেখানে ৯৫ শতাংশ লোক মুসলমান, যারা ইসলামকে বিশ্বাস করে এবং যেখানে পাকিস্তানের জন্ম হয়েছিল ইসলামের ভিত্তিতে, সেই পাকিস্তানের আমলেই আমরা দেখেছি ইসলামের ভড়াডুবি। ইসলামের নামকরণ করতে গিয়ে যে অনৈসলামিক কাজ-কর্ম হয়েছে পাকিস্তানের সময়, তা আমরা দীর্ঘদিন অবলোকন করে এসেছি। তার পরিণতিতে আজকের এই বাংলাদেশের জন্ম। এ দেশের সাধারণ মানুষ খুব ভালো করে জানে যে, ঘুষ না দিলে বাংলাদেশে কোনো কাজ হয় না। এই ঘুষ কারা খায়? ভদ্রলোকেরাই ঘুষ খেয়ে মসজিদে নামাজ পড়তে যায়। আজকে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম করা হলে, আজকে যে ভদ্রলোক মসজিদে নামাজ পড়তে যান না বা রোজা রাখেন না, তিনি কি নতুন করে রোজা রাখবেন এবং নামাজ পড়বেন? রাতারাতি কি তারা ফেরেস্তা হয়ে যাবেন?” (জাতীয় সংসদের কার্যবিবরণী ১৯৮৮, পৃ. ১৬২২)।
সেই নুরুল ইসলাম এখন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ। গত বৃহ¯পতিবার (১৬ এপ্রিল) জাতীয় সংসদে তিনি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে নিয়ে লেখা একটি কবিতা আবৃত্তি করে আলোচনার জন্ম দিয়েছেন। টাইম ম্যাগাজিন পত্রিকায় বিশ্বের প্রভাবশালী ১০০ ব্যক্তিত্বের মধ্যে তারেক রহমানের নাম আসায় তাকে সংসদের পক্ষ থেকে অভিনন্দন জানান চিফ হুইপ। এ সময় তিনি একটি কবিতা পাঠ করেন। তবে কবিতাটি কার লেখা, তা তিনি উল্লেখ করেননি।
কবিতাটি এরকম:
“তিনি আসার আগে দেশটা যেন ভাঁজ করা মানচিত্র ছিল,
নদী ছিল, মানুষ ছিল, স্বপ্নও ছিল
কিন্তু দিগন্ত খুলে দেওয়ার মতো কোনো হাত ছিল না।
তিনি এলেন, বললেন, খুবই কম কথা, সময়ের কপালে লিখে দিলেন একটি উজ্জ্বল উচ্চারণ
বললেন, উই হ্যাভ আ প্ল্যান
তাঁর দৃঢ়তা ছিল পাহাড়ের মতো
কিন্তু হৃদয় শিশিরভেজা ঘাসের মতো
বিশ্বের বড় বড় দরজায় তিনি কড়া নাড়েননি, নিজের আলোয় দাঁড়িয়েছিলেন, দরজাগুলো নিজেই খুলে গেছে
এখন দূরদেশের আকাশেও আমাদের পতাকার রং দেখা যায়,
বিদেশি বাতাসেও শোনা যায় এই মাটির নাম
এই দেশের নাম, বাংলাদেশের নাম
নেতৃত্ব মানে শুধু সামনে হাঁটা নয়,
নেতৃত্ব মানে অসংখ্য ক্লান্ত মানুষের চোখে স্বপ্ন জাগিয়ে তোলা
আশা জাগিয়ে তোলা।”
কবিতাটি কার লেখা তিনি যেহেতু উল্লেখ করেননি, ফলে অনেকে ধারণা করছেন এটি চিফ হুইপ নিজেই লিখেছেন।
এর আগে গত ১২ মার্চ ত্রয়োদশ সংসদ শুরুর প্রথম দিনেই সংসদের বৈঠকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী প্রয়াত খালেদা জিয়াকে নিয়ে প্রখ্যাত কবি আল মাহমুদের কবিতা আবৃত্তি করেছিলেন স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
খালেদা জিয়া এবং তার ছেলে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে নিয়ে সংসদে কবিতা পাঠের এই ঘটনাগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয় অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ আমলের সংসদে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে নিয়ে সংগীতশিল্পী ও সংসদ সদস্য মমতাজের গানের কথা। শুধু মমতাজ নন, ওই সংসদে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে স্তুতি মোটামুটি শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। অতি উৎসাহী কেউ কেউ শেখ মুজিবুর রহমানের নামের সঙ্গে ‘রহতামুল্লাহি আলাইহি’ উচ্চারণ করতেন।
নারায়ণগঞ্জের সাবেক সংসদ সদস্য শামীম ওসমান তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার স¤পর্কে বলেছিলেন, “তিনি (শেখ হাসিনা) ওলি-আউলিয়ার পর্যায়ে পৌঁছে গেছেন।” আবার শেখ হাসিনার শাড়ির প্রশংসা নিয়েও সংসদের হাসির রোল পড়েছে। শেখ হাসিনা নিজেও এইসব প্রশংসা ও স্তুতি উপভোগ করতেন বলেই মনে হয়।
কয়েকটি উদাহরণ দেওয়া যাক।
পদ্মা সেতুর উদ্বোধন উপলক্ষ্যে ২০২২ সালের ২৭ জুন সংসদে গান ও কবিতার মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভূয়সী প্রশংসা করেন মমতাজ এবং সাবেক সংসদ সদস্য আসাদুজ্জামান নূর।
মমতাজ প্রথমে গান শোনান- “আমার নেত্রী শেখ হাসিনা যার তুলনা নাই/ এমন একজন নেত্রীর জন্য আমি দোয়া চাই।”
একপর্যায়ে মমতাজ বলেন, “এখন নারীরা শাড়ি-গয়না চায় না।” এরপর তিনি গেয়ে ওঠেন: “চাই না গয়না চাই না শাড়ি/ নৌকাতে ভোট না দিলে যাবো চলে বাপের বাড়ি।”
বক্তব্যের শেষের দিকে বিরোধী দলের দিক থেকে মমতাজকে আরও একটি গান গাওয়ার অনুরোধ আসে। মমতাজ তখন বলেন, “আরে আপনি শুনতে চেয়েছেন, গাইবো না?”
এরপর তিনি গেয়ে ওঠেন, “সবার আগে চিন্তা করলো শেখ হাসিনার সরকার/ যাতায়াতের উন্নয়নে পদ্মা সেতু দরকার।”
এর আগে তৎকালীন মন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর তার বক্তব্য শেষে কবি কামাল চৌধুরীর “পদ্মা সেতু” কবিতা থেকে কিছু অংশ আবৃত্তি করে শোনান। (বাংলা ট্রিবিউন, ২৮ জুন ২০২২)।
২০২০ সালের জানুয়ারি মাসে শেখ হাসিনার জন্য দোয়া চেয়ে জাতীয় সংসদে গান পরিবেশ করেন মমতাজ বেগম। সুরে সুরে বলেন, “আমার নেত্রী শেখ হাসিনা তুলনা যার নাই/ আপনার আমার নেত্রী যিনি জাতির পিতার কন্যা তিনি/ আমরা সবাই তারে চিনি যার তুলনা নাই/ আমার নেত্রী শেখ হাসিনা, এই বিশ্ব যারে করে গণ্য/ তার কারণেই আমরা ধন্য।/ এমন একজন নেত্রীর জন্য আমি দোয়া চাই/ সবার হাতে তালি চাই।” গানের একপর্যায়ে মমতাজের জন্য নির্ধারিত সময় শেষ হয়ে গেলে তার মাইক বন্ধ হয়ে যায়। এ অবস্থায় বক্তব্য শেষ করার জন্য তাকে বাড়তি এক মিনিট সময় দেওয়া হয়। (সমকাল, ২৯ জানুয়ারি ২০২০)।
বঙ্গবন্ধু ও শেখ হাসিনাকে নিয়ে সংসদে মমতাজের গানের শুরুটা আরও আগে। ২০১৪ সালের জুন মাসে প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে মমতাজ গেয়ে শোনান: “হায়রে বাঙালি, ওরে বাঙালি, তোরা বুঝবি রে একদিন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তোদের মাঝে থাকবে না যেদিন। শেখ হাসিনার জন্য আছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, তা না হলে ওসব কথা বলাই যেত না।” (প্রথম আলো, ১৯ জুন ২০১৪)।
২০২০ সালের মার্চ মাসে ঋতুরাজ বসন্তের আগমন উপলক্ষ্যে শেখ হাসিনার শাড়ির রঙের প্রশংসা করতে গিয়ে জাতীয় পার্টির (জাপা) এমপি মুজিবুল হক বলেছিলেন, “মাননীয় সংসদ নেত্রীকে দেখে আজকে মনে হলো যে বসন্ত খুব শিগগির।” তখন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মজা করে বলেন, “আমি কিন্তু বাসন্তী রং পরিনি। এখানে অনেক রং আছে। কালোও আছে। আমার মনে হচ্ছে মাননীয় সংসদ সদস্য কালার ব্লাইন্ড। এটা বাংলা করলে হয় রংকানা। জানি না, আজকে বাড়িতে গিয়ে ওনার কপালে কী আছে।” (প্রথম আলো, ০৮ মার্চ ২০২০)।
এর মাসখানেক আগে ২০২০ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদের বৈঠকে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ‘হজরত’ সম্বোধন করেন সংসদের হুইপ আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপন। রাষ্ট্রপতির ভাষণে ওপর আনীত ধন্যবাদ প্রস্তাবের ওপর আলোচনায় স্বপন বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আরবি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছেন। তিনি ইসলামের ইতিহাসে এক অনন্য উচ্চতায় আসীন হয়েছেন। তাই শেখ হাসিনার নাম উচ্চারণ করার পূর্বে তার প্রতি সম্মানসূচক একটি শব্দ উচ্চারণ করতে চাই, ‘হযরত শেখ হাসিনা’ তোমাকে অভিবাদন।
২০১৫ সালে বঙ্গবন্ধুর আগে শহীদ ও পরে ‘রহমাতুল্লাহি আলাইহি’ ব্যবহারের দাবি জানায় আওয়ামী ওলামা লীগের একাংশ। দলটির এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, “জাতির জনকের নামের আগে বঙ্গবন্ধু ব্যবহার করা হয়। তবে দুঃখজনক হলেও সত্য যে উনার নামের আগে জাতীয়ভাবে শহীদ শব্দ ব্যবহার করা হয় না। নামের শেষে রহমাতুল্লাহি আলাইহি বলা হয় না। অবিলম্বে বঙ্গবন্ধুর নামের আগে জাতীয়ভাবে শহীদ শব্দ ব্যবহার করতে হবে, নামের শেষে রহমাতুল্লাহি আলাইহি বলতে হবে এবং ১৫ অগাস্টকে জাতীয় শাহাদাত দিবস ঘোষণা করতে হবে।” (বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম, ০৫ সেপ্টেম্বর ২০১৫)।
যদ্দূর মনে পড়ে, চট্টগ্রাম থেকে নির্বাচিত একজন সংসদ সদস্য সংসদের বৈঠকেও বঙ্গবন্ধুর নামের পরে ‘রমহাতুল্লাহি আলাইহি’ উচ্চারণ করেছিলেন।
আওয়ামী লীগ আমলে সংসদে এবং সংসদের বাইরে প্রধানমন্ত্রী এবং তার প্রয়াত পিতার প্রশংসা ও স্তুতির এরকম আরও অসংখ্য উদাহরণ দেওয়া সম্ভব।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান টিআইবির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৪ সালে শুরু হওয়া একাদশ জাতীয় সংসদে সরকার ও সরকারপ্রধানের প্রশংসায় ৬১ ঘণ্টা ২৬ মিনিট ব্যয় হয়েছে। এর আর্থিক মূল্য প্রায় ১০০ কোটি ৩৯ লাখ ৩৩ হাজার ৭০৪ টাকা।
টিআইবির ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, একাদশ সংসদের প্রথম অধিবেশনে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আনীত ধন্যবাদ প্রস্তাব নিয়ে আলোচনায় সরকারদলীয় সদস্যরা তাদের বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রীর প্রশংসায় ১৯.৮ শতাংশ এবং সরকারের প্রশংসায় ১৯.৪ শতাংশ সময় ব্যয় করেছেন। সরকারি দলের পাশাপাশি বিরোধী দলের সদস্যরাও সরকার ও সরকারপ্রধানের প্রশংসায় সময় ব্যয় করেছেন। প্রশ্ন হলো, বর্তমান সংসদও কি সেই পথে হাঁটছে?
চলমান ত্রয়োদশ সংসদে অনেক বিষয়ে সরকারি ও বিরোধী দলের সমঝোতা আছে। যেমন অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে অধিকাংশই সরকারি ও বিরোধী দলের সমঝোতার মাধ্যমে সংসদে বিল আকারে পাস হয়েছে। কয়েকটি অধ্যাদেশ এবং জুলাই সনদের বাস্তবায়ন নিয়ে সরকারি ও বিরোধী দলের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। এসব ইস্যুতে বিরোধী দল বেশ কয়েকবার ওয়াকআউটও করেছে। কিন্তু দিন শেষে এবারের সরকারি ও বিরোধী দলের মধ্যে একটা বোঝাপড়া বা মতের ঐক্য আছে বলে মনে হয়। এর একটি কালণ হয়তো এই যে, ত্রয়োদশ সংসদে যেসব দলের প্রতিনিধিত্ব আছে, তাদের সবাই জুলাই অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগের বিরোধী ছিল।
চলমান সংসদে একটা বিষয় নজর কাড়ার মতো। সেটি হলো, বিরোধী দলীয় নেতারা সরকারের নানা কর্মকা-ের সমালোচনা করলেও বক্তৃতায় তারা বরাবরই বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা, সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ভূয়সী প্রশংসা করেন। সরকারি দলের সংসদ সদস্যরা যে ভাষায় জিয়াউর রহমান এবং খালেদা জিয়ার প্রশংসা করেন, সেটি অনেক সময় সরকারি দলের প্রশংসাকেও ছাপিয়ে যায়। যেমন গত ৯ এপ্রিল জাতীয় সংসদে ‘জাতীয় মুক্তিযুদ্ধ কাউন্সিল ২০২৬’ বিল পাসের আলোচনায় বিরোধী দলীয় নেতা ও জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান বলেন, “পঁচাত্তরের পটপরিবর্তনের পর ক্ষমতার ধারাবাহিকতায় মরহুম প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের হাতে নিঃসন্দেহে বহুদলীয় গণতন্ত্র ফিরিয়ে এসেছে। যার সুফল পরবর্তী পর্যায়ে পেয়েছে এবং আজকের পার্লামেন্টও সে ধারাবাহিকার অংশ।”
বিরোধী দলীয় নেতা আরও বলেন, “তিনি (জিয়াউর রহমান) জণগণের মনের ভাষা পড়তে পেরেছিলেন। এজন্য তাকে যখন নির্মমভাবে খুন করা হলো তখন তিনি দুনিয়া থেকে বিদায় নেয়ার সময় ইতিহাসের বিরল সম্মান নিয়ে বিদায় নিয়েছিলেন।” একপর্যায়ে তিনি জিয়াউর রহমানকে ‘রহেমাহুল্লাহ” বলেও সম্বোধন করেন।
তবে জিয়াউর রহমান, খালেদা জিয়া এবং তারেক রহমানকে নিয়ে এসব প্রশংসার ভেতরে কতটুকু প্রশংসা আর কতটুকু স্তুতি - সেটি তর্কসাপেক্ষ। প্রশংসা আর স্তুতির পার্থক্য নিশ্চয়ই সংসদ সদস্যরা জানেন।
এটা ঠিক যে, প্রশংসার নানা ধরন আছে। কে কখন কার প্রশংসা করছেন এবং কোন উদ্দেশ্যে করছেন, তার ওপর প্রশংসার ভাষা নির্ভর করে। সুন্দর চেহারা, দীঘল চুল, সুন্দর পোশাক, মার্জিত আচরণ, পরীক্ষায় ভালো ফলাফল কিংবা ক্যারিয়ারের কোনো সাফল্যের প্রশংসাগুলো আমাদের যাপিত জীবনের অংশ। এগুলো নিতান্তই প্রশংসা এবং সাধারণত এইসব প্রশংসার আড়ালে বিশেষ কোনো কিছু পাওয়া বা অর্জনের উদ্দেশ্য থাকে না।
কিন্তু প্রশংসা যখন অতি প্রশংসা হয়, তখন সেটি স্তুতিতে পরিণত হয় আর প্রতিটি স্তুতির পেছনেই থাকে কিছু না কিছু পাওয়া বা অর্জনের উদ্দেশ্য। সংসদে এমপিরা প্রধানমন্ত্রীর কোনো ভালো কাজের প্রশংসাকে যখন স্তুতির পর্যায়ে নিয়ে যান, তখন বুঝতে হবে ওই সংসদ সদস্য বিশেষভাবে প্রধানমন্ত্রীর কৃপা লাভ করতে চাইছেন বা তার দৃষ্টি আকর্ষণ করছেন। তিনি হয়তো বিশেষ কিছু প্রত্যাশা করছেন। সাধারণ প্রশংসা আর স্তুতির ভাষাগত পার্থক্য দিয়েই প্রশংসাকারীর উদ্দেশ্য স¤পর্কে ধারণা করা যায়।
প্রশ্ন হলো, জাতীয় সংসদ কি এই স্তুতির সংস্কৃতি থেকে বের হতে পারছে? বিশেষ করে স্তুতিকে যে দলের নেতৃত্বাধীন সংসদ শিল্পে উত্তীর্ণ করেছিল - গণঅভ্যুত্থানে সেই দলটির পতনের পরেও সংসদের ওই বাজে সংস্কৃতির ধারাবাহিকতা চলছে কি না? যে সংসদের নেতা তারেক রহমান শুরু থেকেই রাজনীতিতে একটি উন্নত সংস্কৃতি চালুর চেষ্টা করছেন বলে প্রতীয়মাণ হচ্ছে। যিনি প্রায় দেড় যুগ লন্ডনে বসবাস করার মধ্য দিয়ে ইউরোপের উন্নত ও গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক আবেহের সঙ্গে পরিচিত হয়েছেন এবং নির্বাচনি জনসভাগুলোয় যিনি প্রচলিত ধারার বাইরে গিয়ে একটি নতুন ধরনের সংস্কৃতি চালুর চেষ্টা করেছেন, তার নেতৃত্বাধীন সংসদেও স্তুতির সংস্কৃতি চালু হোক - সেটি কাম্য নয়।
মনে রাখতে হবে, একজন শাসক স্বৈরাচার বা একনায়ক হয়ে ওঠেন যখন তার বিরোধিতা করার কেউ থাকে না। কেউ যখন তার বিরোধিতা করে না অথবা করার সাহস করে না। শাসক তখন নিজেকে অপ্রতিদ্বন্দ্বী এবং বিকল্পহীন ভাবা শুরু করেন। এই ভাবনা তার মনোজগৎ পাল্টে দেয়। তিনি নিজের কাজকেই সঠিক বলে মনে করতে শুরু করেন। তিনি যা করেন, তার সবই দেশ ও জনগণের কল্যাণে করছেন - এমন একটি প্রতীতি তার মনে জন্ম নেয় এবং এভাবে তিনি কর্তৃত্ববাদী হয়ে ওঠেন। ফলে তিনি যাতে নিজেকে আনচ্যালেঞ্জড বা বিকল্পহীন মনে করতে না পারেন, সেজন্যই সমালোচনা ও বিরোধিত থাকা দরকার। রাজনৈতিক সহকর্মী ও বিরোধীরা এবং নাগরিক সমাজের লোকেরা যদি প্রধানমন্ত্রীকে সুপরামর্শ দিয়ে এবং প্রয়োজনীয় সমালোচনার মধ্য দিয়ে তাকে সহযোগিতা না করেন বা করতে না পারেন, তাহলে ওই শাসকের ফ্যাসিস্ট বা একনায়ক হয়ে ওঠা প্রতিরোধের কোনো উপায় থাকে না।