স্টাফ রিপোর্টার ::
প্রশাসনিক অনুমতির জটিলতা আর শর্তের বেড়াজাল - সবকিছুকে ছাপিয়ে দ্রোহ ও প্রতিবাদের সুরে এবারের পহেলা বৈশাখ উদযাপন করল বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী, সুনামগঞ্জ জেলা সংসদ। নির্দিষ্ট কোনো প্রাঙ্গণে নয়, শহরের প্রাণকেন্দ্র হোসেন বখত চত্বরই হয়ে উঠল তাদের উৎসবের মঞ্চ; আর রাজপথই রূপ নিল সাংস্কৃতিক মিলনমেলায়।
এক দশকেরও বেশি সময় ধরে সুনামগঞ্জ পৌর শহরের ঐতিহ্য জাদুঘর প্রাঙ্গণে বর্ষবরণ অনুষ্ঠান আয়োজন করে আসছিল উদীচী। কিন্তু এবার সেই চেনা আয়োজনে ছেদ পড়ে। সংগঠনের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে, জেলা প্রশাসনের অনুমতি না পাওয়ায় তারা সেখানে অনুষ্ঠান করতে পারেনি। যদিও জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ ইলিয়াস মিয়া জানিয়েছেন, শুধু জাদুঘর প্রাঙ্গণ ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হয়নি, আলাদা অনুষ্ঠান আয়োজনের ক্ষেত্রে কোনো নিষেধাজ্ঞা ছিল না।
এদিকে, উদীচীর পক্ষ থেকে সংগঠনের সভাপতি, সুনামগঞ্জের নারী আন্দোলনের বিশিষ্ট নেত্রী ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব শীলা রায় এবং সাধারণ সম্পাদক জহির উদ্দিন স্বাক্ষরিত এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, শুধু জাদুঘর প্রাঙ্গণে নয়, শহরের অন্য একটি স্থানেও বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা করা হয়েছিল, কিন্তু সেখানেও প্রশাসন থেকে অনুমতি পাওয়া যায়নি।
উদীচীর পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, প্রতিবছরের মতো এবারও তারা সুনামগঞ্জ ঐতিহ্য জাদুঘর প্রাঙ্গণে বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা করেছিল। এ বিষয়ে ৮ এপ্রিল জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত অনুমতি চাওয়া হয়। জেলা প্রশাসক মৌখিকভাবে জানান, অনুষ্ঠানের গানের ও অন্যান্য পরিবেশনার তালিকা জমা দিতে হবে। উদীচীর মতে, একটি স্বাধীন ও গণমুখী সাংস্কৃতিক সংগঠন হিসেবে তারা গানের তালিকা প্রদান করতে বাধ্য নয়। ফলে শহরের উকিলপাড়ায় রিভার ভিউয়ের বটতলায় বিকল্প বর্ষবরণ উৎসব আয়োজনের চেষ্টা করা হয়। কিন্তু পয়লা বৈশাখের আগের দিন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মুঠোফোনে জানান যে সরকারি আয়োজনে সব সংগঠন থাকছে, আলাদা আয়োজন করা যাবে না।
এই প্রেক্ষাপটে পহেলা বৈশাখ (১৪ এপ্রিল) সকালে হোসেন বখত চত্বরে প্রতিবাদ সভা ও বর্ষবরণ কর্মসূচি শুরু করে সংগঠনটি। পরে তা রূপ নেয় দিনব্যাপী সাংস্কৃতিক আয়োজনে। আলোচনা, প্রতিবাদী গণসংগীত এবং নাট্য পরিবেশনায় মুখর হয়ে ওঠে পুরো এলাকা।
অনুষ্ঠানের প্রধান আকর্ষণ ছিল পথনাটক ‘বাঁধ’, যা রচনা করেছেন উদীচীর কেন্দ্রীয় সহসভাপতি জাহাঙ্গীর আলম। নাটকটি সমসাময়িক সামাজিক বাস্তবতা ও প্রতিবাদের ভাষা তুলে ধরে দর্শকদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলে। নাটক শেষে শিল্পীদের অংশগ্রহণে একটি বর্ণাঢ্য গানের মিছিল শহরের প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে।
উদীচী সুনামগঞ্জ জেলা সংসদের সভাপতি শীলা রায়ের সভাপতিত্বে এবং সাধারণ সম্পাদক জহির উদ্দিনের সার্বিক তত্ত্বাবধানে আয়োজিত এ কর্মসূচিতে বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ সংহতি প্রকাশ করেন। উপস্থিত ছিলেন বিএনপি, জাসাস, কমিউনিস্ট পার্টি, যুব ইউনিয়নসহ বিভিন্ন সংগঠনের নেতারা।
বক্তারা বলেন, পহেলা বৈশাখ কেবল একটি উৎসব নয় - এটি বাঙালির অসাম্প্রদায়িক চেতনা, সংস্কৃতি ও প্রতিবাদের প্রতীক। সাংস্কৃতিক চর্চার স্বাধীনতা নিশ্চিত না হলে সমাজে সুস্থ ধারার বিকাশ বাধাগ্রস্ত হবে। তারা মনে করেন, উদীচীর এ উদ্যোগ সুনামগঞ্জের সাংস্কৃতিক আন্দোলনকে আরও শক্তিশালী করবে।