মোহাম্মদ আব্দুল হক::
দীর্ঘ এক মাসের অধিক সময় ধরে চলছে ইরান ও আমেরিকা-ইসরায়েল যুদ্ধ। ট্রাম্প ইরানকে প্রস্তর যুগে নিতে চান। পাথরের যুগ পেরিয়ে এসে সভ্যতার এ সময়ে আমরা বিশ্বের জাতিসংঘ গড়ে তুললেও দেশে দেশে জাতিতে জাতিতে চলছে যুদ্ধ। পাথরের যুগে কিন্তু সারা পৃথিবীর এরকম জাতিসংঘ ছিলো না। যুদ্ধ তখনও ছিলো। তবে তখন যুদ্ধে এখনকার মতো এতো তীক্ষè যুদ্ধাস্ত্র আবিষ্কার হয়নি। মানুষ ধীরে ধীরে জ্ঞান-বিজ্ঞান ও বর্ণমালায় এ পর্যায়ে পৌঁছে। জানা দরকার হাজার হাজার বছরের নানান যুগ নানান সভ্যতার উত্থান-পতনের ইতিহাস। এখন ট্রাম্প যে প্রস্তর যুগের ইঙ্গিত দিলেন, আমরা অনেকে হয়তো জানি না প্রস্তর যুগ কি, কেমন এবং আমরা কিভাবে প্রস্তর যুগ থেকে এই আধুনিক সভ্যতায় এলাম। মানুষ যদি পড়া ও লেখার কৌশল আবিষ্কার করতে না-পারতো, তাহলে-তো ধারাবাহিকভাবে আমাদের পক্ষে এখন পর্যন্ত পৃথিবীর ইতিহাস ও ঐতিহ্য জানা ও নতুনদেরকে তা জানানো দুরূহ ব্যাপার হতো। বিভিন্ন ভাষার মানুষ যারা বিভিন্ন রকমের বা আকৃতির চিহ্ন বা বর্ণ দ্বারা লেখার রীতি আবিষ্কার করে সেই কঠিন কাজটিকে সহজ করে গেছেন, তা কৃতজ্ঞতার সাথে স্মরণ রাখতে হবে। প্রাচীন যুগের ওই মানুষেরা শুরুতেই খুব বুদ্ধিমান ছিলো না। আবির্ভাবের লক্ষ লক্ষ বছর পরে মানুষ বুদ্ধিতে সমৃদ্ধ হয়েছে। আমরা বিপথগামী হই মূলের খবর রাখি না বলেই। এখন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যে প্রস্তর যুগের কথা বলছেন- হ্যাঁ, একসময় মানুষ প্রস্তর যুগে ছিলো। কিন্তু সেটা অনেক অনেক বছর আগে। আমাদের এই গোলাকার পৃথিবী নামক গ্রহের মানুষের উৎপত্তি বা আবির্ভাব ঘটেছে এখন থেকে প্রায় বিশ লক্ষ বছরেরও পূর্বের প্রাগৈতিহাসিক যুগে অর্থাৎ যে যুগের ইতিহাস পূর্ণাঙ্গ জানা সম্ভব হয়নি সেই সময়ে। প্রথম দিকের মানুষ অর্থ বোধগম্য শব্দ উচ্চারণের মাধ্যমে কথা বলতেও পারতো না, এতো বুদ্ধিও ছিলোনা তাদের। জীবন ধারণের জন্যে বন-জঙ্গলের ফল, গাছের শিকড়-বাকড় আর ইঁদুর, কাঠবিড়ালী, ছোটো ছোটো পাখি ইত্যাদি খেয়ে চলতো। ওই মানুষগুলো একসময় পাথর খ- ঘষে ঘষে ধারালো অস্ত্র বা হাতিয়ার বানাতে শিখে ফেলে এবং তা দিয়ে আঘাত করেই ছোটোবড়ো পশু শিকার করে খেতে আরম্ভ করে। প্রাচীন যুগের ইতিহাসের ওই সময়টাকে পুরান পাথরের যুগ বলা হয়। ওই সময়ে মানুষ পাথরে ঘষে আগুন জ্বালাতে শিখে এবং পরে আগুনে পুড়িয়ে মাংস খাওয়াও শিখে নেয়। গবেষকদের ধারণায় ফুটে উঠেছে যে, ওই যুগের মানুষের মগজ গরিলার মতো ছোটো ছিল, বুদ্ধি ছিল কম। শারীরিক গঠনও ছিল অন্যরকম, চোয়াল ছিল বেশ বড়ো। সময়ের সাথে সাথে ও খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তনের ফলে চোয়াল ও অন্যান্য অঙ্গে পরিবর্তন আসে। পুরান পাথরের যুগের মানুষ ছিল প্রধানত পশু শিকারি। তারা শিকারে দল বেঁধে বের হতো। যখন পশু শিকারের উদ্দেশ্যে দলবদ্ধভাবে বের হতো, তখন প্রয়োজন বুঝানোর জন্যে বা একে অন্যকে উদ্দেশ্য বিনিময় করার জন্যে অল্প স্বল্প কণ্ঠের আওয়াজ করতো এবং বিভিন্ন ইশারায় একজন অন্যজনকে নির্দেশ করতো। এভাবেই কণ্ঠ ধ্বনি বা আওয়াজ থেকেই ধীরে ধীরে নিজস্ব অর্থ বোধগম্য কথা বলতে শিখে নেয়। এখন একবিংশ শতাব্দীতে এসে বিজ্ঞানের অগ্রগতি ও উন্নতির প্রায় শিখরে পৌঁছে যদি আমাদেরকে শুনতে হয় কোনো একটি দেশ আরেকটি দেশকে পাথরের যুগে নিয়ে যাবে তখন নিশ্চয়ই ভাবতে হয়। আসুন ঘুরে আসি, আমাদের আলোচনা চলুক প্রস্তর যুগের মানুষ নিয়ে। প্রাচীন যুগের ইতিহাসের পুরান পাথর যুগের ওই মানুষেরাই কালক্রমে বিভিন্ন আকৃতির পাথর ঘষে বা ভেঙে নানান রকম অস্ত্র ও যন্ত্রপাতি বানানো শিখে নেয়। পরে ওইসব যন্ত্রপাতি ও হাতিয়ারের সাহায্যে ক্রমশঃ আদিম মানুষগুলো তাদের জীবনের অনেক কঠিন কাজকে সহজে করে ফেলতে শিখে। এরপর আরও কেটে গেছে ধারাবাহিকভাবে হাজার হাজার বছরের পথের দুঃসহনীয় যাত্রা। ওই প্রাচীন যুগের আদিম মানুষের মাঝে পর্যায়ক্রমে চিন্তারও পরিবর্তন আসে। সেই সময়ের মানুষের পরিবর্তন হতে হতে মানুষের বুদ্ধিও উন্নত হয়। আজকের আমরা যে জ্ঞান-বিজ্ঞানে উন্নত বুদ্ধিমান মানুষ তা কিন্তু ওই পুরান পাথর যুগের মানুষেরই বংশধর। এখন থেকে আনুমানিক প্রায় এক লক্ষ বছর আগেই এই বুদ্ধিমান মানুষের উৎপত্তি হয়েছিল। বিজ্ঞ প-িতদের মতে এই আধুনিক মানুষদের উৎপত্তি আফ্রিকাতে হয়েছিল। এর পরবর্তীতে আফ্রিকা থেকে এই মানুষেরা ইউরোপ ও এশিয়ার বিভিন্ন জায়গায় জীবনের প্রয়োজনেই ছড়িয়ে পড়েছিল। আফ্রিকা মহাদেশ থেকে ইউরোপ ও এশিয়ায় ছড়িয়ে পড়লেও, তখনও পর্যন্ত মানুষ আজকের এই জ্ঞান-বিজ্ঞানে উন্নত ও স¤পদে ভরপুর আমেরিকায় পৌঁছায়নি। আমেরিকায় মানুষেরা পৌঁছে আরো অনেক অনেক বছর পরে। এখন থেকে অর্থাৎ এই একবিংশ শতাব্দীর প্রায় চল্লিশ হাজার বছর আগে এশিয়া অঞ্চল থেকে ওই আগের মানুষেরা বেরিং প্রণালী হয়ে উত্তর আমেরিকায় প্রবেশ করে। তখন বরফ যুগ চলছিল, তাই অনেক জায়গা বরফে ঢাকা থাকতো। এছাড়াও এশিয়া ও আমেরিকার মাঝে দূরত্ব বেরিং প্রণালীর কাছে মাত্র প্রায় আশি কিলোমিটার। তাই তারা সময়ের সাথে সাথে এগিয়ে যায় এবং সেভাবেই বহু কষ্টে আমেরিকাতেও পৌঁছে যায়। এদের বংশধররাই ছড়িয়ে যায় দক্ষিণ দিকে দক্ষিণ আমেরিকার পথে। প্রাচীন ইতিহাসের বরফ যুগ শেষ হয়েছে আজ থেকে দশ হাজার বছরের আগে। সেই তখনকার বরফ গলে গলে পানির প্রবাহ নদী হয়ে সমুদ্রে গিয়ে পড়েছে। এসময় আরেকদল শিকারী মানুষ এশিয়ার দক্ষিণ-পূর্ব দিকে প্রায় পঁচিশ হাজার বছর আগে এশিয়া অঞ্চল থেকে ইন্দোনেশিয়ার ছোটবড়ো দ্বীপগুলো পার হয়ে পৌঁছে যায় অস্ট্রেলিয়া মহাদেশে। সেখানে তখনকার মানুষেরা ক্যাঙারো প্রভৃতি প্রাণী শিকার করে জীবন অতিবাহিত করতো। সুপ্রিয় পাঠক, এভাবেই আদিম মানুষেরা বংশানুক্রমে প্রাচীনকাল থেকে ক্রমশঃ শিখে শিখে এগুতে থাকে এবং ছড়িয়ে পড়ে সারা পৃথিবীতে। আমরা সেই পুরান পাথর যুগ থেকে এ পর্যন্ত আধুনিক সভ্য জগতের মানুষ। এখানে খুবই সংক্ষিপ্ত ইতিহাস তুলে ধরেছি ইতিহাসের পাতায় খুঁজে পাওয়া থেকে। আমেরিকার - ইসরায়েল ও ইরান যুদ্ধ চলছে। ট্রাম্প ঘোষণা করেন তিনি নাকি ইরানকে সেই পাথরের যুগে নিয়ে যাবেন। এটা কি সম্ভব? পৃথিবীটা আমাদের এবং আমরা এই পৃথিবীর মৃত্তিকায় বেড়ে ওঠা নানান ভাষার, নানান বর্ণের, নানান ধর্মের, নানান সংস্কৃতির মানুষ। কিন্তু গভীরভাবে পর্যালোচনা করলে পাই, আমরা আসলে একই বংশধারার মানব জাতি। এদিক থেকে আমাদের সারা দুনিয়ার মানুষের জীবনে একটি কথাই সত্য মানা উচিত যা কবি বলেছেন - “নানান বরণ গাভীরে ভাই/ একই বরণ দুধ,/ জগৎ ভরমিয়া দেখিলাম/ একই মায়ের পুত।” সেই আদি থেকেই মানুষ সুশৃঙ্খল পরিবেশ গড়তে গড়তে এগিয়ে এসেছে সভ্যতার বিকাশমান মাঠে। মানুষ সমৃদ্ধির পথে এভাবেই এগিয়েছে। এখানে মানুষে মানুষে পশুদের মতো হানাহানি মানুষেরই অপমান। আমরা কথা বলতে শিখেছি, ভালো-মন্দ চিনেছি। অতএব, আমরা কথায় ও কাজে সুন্দর ফুটিয়ে তুলবো। এখানে উগ্রতা ও দাম্ভিকতা কখনও আধুনিক মানব সভ্যতার সাথে যায় না। পৃথিবীর ইতিহাস দীর্ঘ। সংক্ষিপ্ত একটি প্রবন্ধে সব বিষয় তুলে ধরা যায় না। মনে থাকে যেনো, পরবর্তী সময়ে ১৪৫৩ খ্রিস্টাব্দে অটোমান তুর্কীদের আক্রমণে বাইজেন্টাইন সা¤্রাজ্যও অবলুপ্ত হয়। এরপর এগিয়ে যাওয়া যায় চীনের ইতিহাস এবং ভারতীয় উপমহাদেশে মানব সভ্যতার অগ্রগতির ইতিহাসের দিকে। এসব বিষয় আমরা কমবেশি জানি। আজকে আমরা সভ্যতার একটা বিশেষ পর্যায়ে এসেছি। আমরা সভ্য। এভাবেই আদিম মানুষ ধীরে ধীরে সভ্যতা রচনা করে এগিয়েছে এবং এখন অতি আধুনিক বিজ্ঞান চর্চার মাধ্যমে বর্তমান সভ্য মানুষ আরও এগিয়ে যাচ্ছে। কে চায় প্রস্তর যুগে ফিরে যেতে। মি. ট্রাম্প সংযত হোন। [লেখক : কলামিস্ট ও কথাসাহিত্যিক]
দীর্ঘ এক মাসের অধিক সময় ধরে চলছে ইরান ও আমেরিকা-ইসরায়েল যুদ্ধ। ট্রাম্প ইরানকে প্রস্তর যুগে নিতে চান। পাথরের যুগ পেরিয়ে এসে সভ্যতার এ সময়ে আমরা বিশ্বের জাতিসংঘ গড়ে তুললেও দেশে দেশে জাতিতে জাতিতে চলছে যুদ্ধ। পাথরের যুগে কিন্তু সারা পৃথিবীর এরকম জাতিসংঘ ছিলো না। যুদ্ধ তখনও ছিলো। তবে তখন যুদ্ধে এখনকার মতো এতো তীক্ষè যুদ্ধাস্ত্র আবিষ্কার হয়নি। মানুষ ধীরে ধীরে জ্ঞান-বিজ্ঞান ও বর্ণমালায় এ পর্যায়ে পৌঁছে। জানা দরকার হাজার হাজার বছরের নানান যুগ নানান সভ্যতার উত্থান-পতনের ইতিহাস। এখন ট্রাম্প যে প্রস্তর যুগের ইঙ্গিত দিলেন, আমরা অনেকে হয়তো জানি না প্রস্তর যুগ কি, কেমন এবং আমরা কিভাবে প্রস্তর যুগ থেকে এই আধুনিক সভ্যতায় এলাম। মানুষ যদি পড়া ও লেখার কৌশল আবিষ্কার করতে না-পারতো, তাহলে-তো ধারাবাহিকভাবে আমাদের পক্ষে এখন পর্যন্ত পৃথিবীর ইতিহাস ও ঐতিহ্য জানা ও নতুনদেরকে তা জানানো দুরূহ ব্যাপার হতো। বিভিন্ন ভাষার মানুষ যারা বিভিন্ন রকমের বা আকৃতির চিহ্ন বা বর্ণ দ্বারা লেখার রীতি আবিষ্কার করে সেই কঠিন কাজটিকে সহজ করে গেছেন, তা কৃতজ্ঞতার সাথে স্মরণ রাখতে হবে। প্রাচীন যুগের ওই মানুষেরা শুরুতেই খুব বুদ্ধিমান ছিলো না। আবির্ভাবের লক্ষ লক্ষ বছর পরে মানুষ বুদ্ধিতে সমৃদ্ধ হয়েছে। আমরা বিপথগামী হই মূলের খবর রাখি না বলেই। এখন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যে প্রস্তর যুগের কথা বলছেন- হ্যাঁ, একসময় মানুষ প্রস্তর যুগে ছিলো। কিন্তু সেটা অনেক অনেক বছর আগে। আমাদের এই গোলাকার পৃথিবী নামক গ্রহের মানুষের উৎপত্তি বা আবির্ভাব ঘটেছে এখন থেকে প্রায় বিশ লক্ষ বছরেরও পূর্বের প্রাগৈতিহাসিক যুগে অর্থাৎ যে যুগের ইতিহাস পূর্ণাঙ্গ জানা সম্ভব হয়নি সেই সময়ে। প্রথম দিকের মানুষ অর্থ বোধগম্য শব্দ উচ্চারণের মাধ্যমে কথা বলতেও পারতো না, এতো বুদ্ধিও ছিলোনা তাদের। জীবন ধারণের জন্যে বন-জঙ্গলের ফল, গাছের শিকড়-বাকড় আর ইঁদুর, কাঠবিড়ালী, ছোটো ছোটো পাখি ইত্যাদি খেয়ে চলতো। ওই মানুষগুলো একসময় পাথর খ- ঘষে ঘষে ধারালো অস্ত্র বা হাতিয়ার বানাতে শিখে ফেলে এবং তা দিয়ে আঘাত করেই ছোটোবড়ো পশু শিকার করে খেতে আরম্ভ করে। প্রাচীন যুগের ইতিহাসের ওই সময়টাকে পুরান পাথরের যুগ বলা হয়। ওই সময়ে মানুষ পাথরে ঘষে আগুন জ্বালাতে শিখে এবং পরে আগুনে পুড়িয়ে মাংস খাওয়াও শিখে নেয়। গবেষকদের ধারণায় ফুটে উঠেছে যে, ওই যুগের মানুষের মগজ গরিলার মতো ছোটো ছিল, বুদ্ধি ছিল কম। শারীরিক গঠনও ছিল অন্যরকম, চোয়াল ছিল বেশ বড়ো। সময়ের সাথে সাথে ও খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তনের ফলে চোয়াল ও অন্যান্য অঙ্গে পরিবর্তন আসে। পুরান পাথরের যুগের মানুষ ছিল প্রধানত পশু শিকারি। তারা শিকারে দল বেঁধে বের হতো। যখন পশু শিকারের উদ্দেশ্যে দলবদ্ধভাবে বের হতো, তখন প্রয়োজন বুঝানোর জন্যে বা একে অন্যকে উদ্দেশ্য বিনিময় করার জন্যে অল্প স্বল্প কণ্ঠের আওয়াজ করতো এবং বিভিন্ন ইশারায় একজন অন্যজনকে নির্দেশ করতো। এভাবেই কণ্ঠ ধ্বনি বা আওয়াজ থেকেই ধীরে ধীরে নিজস্ব অর্থ বোধগম্য কথা বলতে শিখে নেয়। এখন একবিংশ শতাব্দীতে এসে বিজ্ঞানের অগ্রগতি ও উন্নতির প্রায় শিখরে পৌঁছে যদি আমাদেরকে শুনতে হয় কোনো একটি দেশ আরেকটি দেশকে পাথরের যুগে নিয়ে যাবে তখন নিশ্চয়ই ভাবতে হয়। আসুন ঘুরে আসি, আমাদের আলোচনা চলুক প্রস্তর যুগের মানুষ নিয়ে। প্রাচীন যুগের ইতিহাসের পুরান পাথর যুগের ওই মানুষেরাই কালক্রমে বিভিন্ন আকৃতির পাথর ঘষে বা ভেঙে নানান রকম অস্ত্র ও যন্ত্রপাতি বানানো শিখে নেয়। পরে ওইসব যন্ত্রপাতি ও হাতিয়ারের সাহায্যে ক্রমশঃ আদিম মানুষগুলো তাদের জীবনের অনেক কঠিন কাজকে সহজে করে ফেলতে শিখে। এরপর আরও কেটে গেছে ধারাবাহিকভাবে হাজার হাজার বছরের পথের দুঃসহনীয় যাত্রা। ওই প্রাচীন যুগের আদিম মানুষের মাঝে পর্যায়ক্রমে চিন্তারও পরিবর্তন আসে। সেই সময়ের মানুষের পরিবর্তন হতে হতে মানুষের বুদ্ধিও উন্নত হয়। আজকের আমরা যে জ্ঞান-বিজ্ঞানে উন্নত বুদ্ধিমান মানুষ তা কিন্তু ওই পুরান পাথর যুগের মানুষেরই বংশধর। এখন থেকে আনুমানিক প্রায় এক লক্ষ বছর আগেই এই বুদ্ধিমান মানুষের উৎপত্তি হয়েছিল। বিজ্ঞ প-িতদের মতে এই আধুনিক মানুষদের উৎপত্তি আফ্রিকাতে হয়েছিল। এর পরবর্তীতে আফ্রিকা থেকে এই মানুষেরা ইউরোপ ও এশিয়ার বিভিন্ন জায়গায় জীবনের প্রয়োজনেই ছড়িয়ে পড়েছিল। আফ্রিকা মহাদেশ থেকে ইউরোপ ও এশিয়ায় ছড়িয়ে পড়লেও, তখনও পর্যন্ত মানুষ আজকের এই জ্ঞান-বিজ্ঞানে উন্নত ও স¤পদে ভরপুর আমেরিকায় পৌঁছায়নি। আমেরিকায় মানুষেরা পৌঁছে আরো অনেক অনেক বছর পরে। এখন থেকে অর্থাৎ এই একবিংশ শতাব্দীর প্রায় চল্লিশ হাজার বছর আগে এশিয়া অঞ্চল থেকে ওই আগের মানুষেরা বেরিং প্রণালী হয়ে উত্তর আমেরিকায় প্রবেশ করে। তখন বরফ যুগ চলছিল, তাই অনেক জায়গা বরফে ঢাকা থাকতো। এছাড়াও এশিয়া ও আমেরিকার মাঝে দূরত্ব বেরিং প্রণালীর কাছে মাত্র প্রায় আশি কিলোমিটার। তাই তারা সময়ের সাথে সাথে এগিয়ে যায় এবং সেভাবেই বহু কষ্টে আমেরিকাতেও পৌঁছে যায়। এদের বংশধররাই ছড়িয়ে যায় দক্ষিণ দিকে দক্ষিণ আমেরিকার পথে। প্রাচীন ইতিহাসের বরফ যুগ শেষ হয়েছে আজ থেকে দশ হাজার বছরের আগে। সেই তখনকার বরফ গলে গলে পানির প্রবাহ নদী হয়ে সমুদ্রে গিয়ে পড়েছে। এসময় আরেকদল শিকারী মানুষ এশিয়ার দক্ষিণ-পূর্ব দিকে প্রায় পঁচিশ হাজার বছর আগে এশিয়া অঞ্চল থেকে ইন্দোনেশিয়ার ছোটবড়ো দ্বীপগুলো পার হয়ে পৌঁছে যায় অস্ট্রেলিয়া মহাদেশে। সেখানে তখনকার মানুষেরা ক্যাঙারো প্রভৃতি প্রাণী শিকার করে জীবন অতিবাহিত করতো। সুপ্রিয় পাঠক, এভাবেই আদিম মানুষেরা বংশানুক্রমে প্রাচীনকাল থেকে ক্রমশঃ শিখে শিখে এগুতে থাকে এবং ছড়িয়ে পড়ে সারা পৃথিবীতে। আমরা সেই পুরান পাথর যুগ থেকে এ পর্যন্ত আধুনিক সভ্য জগতের মানুষ। এখানে খুবই সংক্ষিপ্ত ইতিহাস তুলে ধরেছি ইতিহাসের পাতায় খুঁজে পাওয়া থেকে। আমেরিকার - ইসরায়েল ও ইরান যুদ্ধ চলছে। ট্রাম্প ঘোষণা করেন তিনি নাকি ইরানকে সেই পাথরের যুগে নিয়ে যাবেন। এটা কি সম্ভব? পৃথিবীটা আমাদের এবং আমরা এই পৃথিবীর মৃত্তিকায় বেড়ে ওঠা নানান ভাষার, নানান বর্ণের, নানান ধর্মের, নানান সংস্কৃতির মানুষ। কিন্তু গভীরভাবে পর্যালোচনা করলে পাই, আমরা আসলে একই বংশধারার মানব জাতি। এদিক থেকে আমাদের সারা দুনিয়ার মানুষের জীবনে একটি কথাই সত্য মানা উচিত যা কবি বলেছেন - “নানান বরণ গাভীরে ভাই/ একই বরণ দুধ,/ জগৎ ভরমিয়া দেখিলাম/ একই মায়ের পুত।” সেই আদি থেকেই মানুষ সুশৃঙ্খল পরিবেশ গড়তে গড়তে এগিয়ে এসেছে সভ্যতার বিকাশমান মাঠে। মানুষ সমৃদ্ধির পথে এভাবেই এগিয়েছে। এখানে মানুষে মানুষে পশুদের মতো হানাহানি মানুষেরই অপমান। আমরা কথা বলতে শিখেছি, ভালো-মন্দ চিনেছি। অতএব, আমরা কথায় ও কাজে সুন্দর ফুটিয়ে তুলবো। এখানে উগ্রতা ও দাম্ভিকতা কখনও আধুনিক মানব সভ্যতার সাথে যায় না। পৃথিবীর ইতিহাস দীর্ঘ। সংক্ষিপ্ত একটি প্রবন্ধে সব বিষয় তুলে ধরা যায় না। মনে থাকে যেনো, পরবর্তী সময়ে ১৪৫৩ খ্রিস্টাব্দে অটোমান তুর্কীদের আক্রমণে বাইজেন্টাইন সা¤্রাজ্যও অবলুপ্ত হয়। এরপর এগিয়ে যাওয়া যায় চীনের ইতিহাস এবং ভারতীয় উপমহাদেশে মানব সভ্যতার অগ্রগতির ইতিহাসের দিকে। এসব বিষয় আমরা কমবেশি জানি। আজকে আমরা সভ্যতার একটা বিশেষ পর্যায়ে এসেছি। আমরা সভ্য। এভাবেই আদিম মানুষ ধীরে ধীরে সভ্যতা রচনা করে এগিয়েছে এবং এখন অতি আধুনিক বিজ্ঞান চর্চার মাধ্যমে বর্তমান সভ্য মানুষ আরও এগিয়ে যাচ্ছে। কে চায় প্রস্তর যুগে ফিরে যেতে। মি. ট্রাম্প সংযত হোন। [লেখক : কলামিস্ট ও কথাসাহিত্যিক]