সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চল আবারও প্রমাণ করলো- দায়সারা উন্নয়ন কখনো টেকসই সমাধান হতে পারে না। অনেক স্থানে অপরিকল্পিত ফসলরক্ষা বাঁধ ফসলহানির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। জলকপাটহীন, অপরিকল্পিত ও তড়িঘড়ি করে নির্মিত এসব বাঁধ কৃষকের শেষ সম্বলকেই হুমকির মুখে ফেলেছে। ফলে বোরো ধানের ভরা মৌসুমে হাজার হাজার কৃষক আজ দিশেহারা।
হাওরের কৃষি ব্যবস্থা এমনিতেই ঝুঁকিপূর্ণ। একফসলী জমিতে সারা বছরের জীবিকা নির্ভর করে একটি মৌসুমের ওপর। সেখানে পানি নিষ্কাশনের সঠিক ব্যবস্থা না থাকলে কিংবা বাঁধ নির্মাণে সামান্য গাফিলতিও বিপর্যয় ডেকে আনে। বর্তমানে দেখা যাচ্ছে, পরিকল্পনার অভাবে কোথাও পানি আটকে জমি ডুবছে, আবার কোথাও কৃষক নিজেরাই বাঁধ কেটে পানি নামাতে বাধ্য হচ্ছেন। এটি শুধু প্রশাসনিক ব্যর্থতাই নয়, বরং দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনার বহিঃপ্রকাশ।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো- ক্ষতির পরিমাণ নিয়ে বিভ্রান্তিকর তথ্য। কৃষকদের দাবি হাজার হাজার হেক্টর জমি পানিতে তলিয়ে গেছে, অথচ সংশ্লিষ্ট দপ্তর বলছে এর পরিমাণ অনেক কম। এই তথ্যগত অসঙ্গতি বাস্তবতা আড়াল করার শামিল। প্রকৃত ক্ষতির চিত্র নিরূপণ না করলে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ সম্ভব নয়।
কৃষকেরা এখন নিজের খরচে সেচযন্ত্র বসিয়ে, দিনরাত পরিশ্রম করে ফসল বাঁচানোর চেষ্টা করছেন। কোথাও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর তহবিল পর্যন্ত ব্যবহার করতে হচ্ছে। এটি একটি করুণ বাস্তবতা - রাষ্ট্রীয় সহায়তা যেখানে প্রয়োজন, সেখানে কৃষককে একাই লড়তে হচ্ছে। এমন পরিস্থিতি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
অন্যদিকে, বাঁধ কাটাকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ এবং ১৪৪ ধারা জারি - এসব ঘটনা পরিস্থিতির ভয়াবহতাকেই তুলে ধরে। যখন মানুষ জীবিকার শেষ আশ্রয় হারানোর আশঙ্কায় থাকে, তখন আইনশৃঙ্খলার অবনতিও অস্বাভাবিক নয়। তাই কেবল প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ নয়, সমস্যার মূল কারণ নিরসনই এখন জরুরি।
এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য কিছু মৌলিক পদক্ষেপ এখনই গ্রহণ করা প্রয়োজন। প্রথমত, হাওরাঞ্চলের জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদি ও বিজ্ঞানভিত্তিক পানি ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হবে। দ্বিতীয়ত, প্রতিটি বাঁধ প্রকল্পে বাধ্যতামূলকভাবে কার্যকর জলকপাট স্থাপন এবং পানি প্রবাহের স্বাভাবিক পথ নিশ্চিত করতে হবে। তৃতীয়ত, স্থানীয় কৃষক, জনপ্রতিনিধি ও বিশেষজ্ঞদের স¤পৃক্ত করে প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করতে হবে। চতুর্থত, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য দ্রুত ক্ষতিপূরণ ও প্রণোদনার ব্যবস্থা করতে হবে।
সবচেয়ে বড় কথা, হাওরকে শুধু প্রকল্প হিসেবে নয়, একটি জীবন্ত প্রতিবেশব্যবস্থা হিসেবে দেখতে হবে। এখানে যে কোনো অবকাঠামো নির্মাণের আগে প্রকৃতি, পানি প্রবাহ ও স্থানীয় বাস্তবতা গভীরভাবে বিবেচনায় নিতে হবে।
প্রতিবছর একই সমস্যার পুনরাবৃত্তি কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। কৃষকের ঘাম ও চোখের জল যেন আর অবহেলার কারণে নষ্ট না হয় - সেই দায়িত্ব রাষ্ট্রের। এখনই কার্যকর, পরিকল্পিত ও জবাবদিহিমূলক পদক্ষেপ না নিলে হাওরের এই সংকট ভবিষ্যতে আরও ভয়াবহ রূপ নেবে।