দোয়ারাবাজার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে হামের লক্ষণ নিয়ে দুই শিশুর ভর্তি হওয়া এবং আরও এক শিশুকে গুরুতর নিউমোনিয়ার কারণে সিলেটে পাঠানোর ঘটনা নিছক একটি বিচ্ছিন্ন স্বাস্থ্যসংবাদ নয়; বরং এটি আমাদের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার জন্য একটি সতর্কবার্তা। দেশে সাম্প্রতিক সময়ে শিশুদের মধ্যে হাম-এর প্রাদুর্ভাব বাড়ছে - যা উদ্বেগজনক এবং তাৎক্ষণিক মনোযোগ দাবি করে।
হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ, যা বাতাসের মাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। আক্রান্ত শিশুর হাঁচি-কাশির মাধ্যমে ভাইরাস বাতাসে ভেসে থেকে অন্যদের সংক্রমিত করতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, একজন আক্রান্ত শিশু আশপাশের বহু শিশুকে সংক্রমিত করার ক্ষমতা রাখে। ফলে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা ও স্বাস্থ্য সচেতনতার অভাব এই রোগের বিস্তারকে আরও ত্বরান্বিত করে।
অতীতে টিকাদান কর্মসূচির সফলতার কারণে হাম অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে টিকাদানে শিথিলতা, গুজব এবং অসচেতনতার কারণে আবারও এই রোগ মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। এটি দুঃখজনক হলেও বাস্তব যে, অনেক অভিভাবক এখনও টিকার গুরুত্ব অনুধাবন করতে পারছেন না বা ভুল তথ্যের কারণে শিশুদের টিকা দিতে দ্বিধাগ্রস্ত হচ্ছেন।
হামের লক্ষণ প্রথমে সাধারণ জ্বর, কাশি, নাক দিয়ে পানি পড়া দিয়ে শুরু হলেও পরবর্তীতে শরীরে লালচে ফুসকুড়ি দেখা দেয়। অনেক ক্ষেত্রে এটি জটিল রূপ নেয় - বিশেষ করে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, এমনকি মস্তিষ্কের প্রদাহের মতো মারাত্মক জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে। শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ায় অন্য সংক্রমণের ঝুঁকিও বেড়ে যায়।
এই প্রেক্ষাপটে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো- প্রতিরোধ। আর প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হচ্ছে টিকাদান। নির্ধারিত সময় অনুযায়ী এমআর (মিজলস-রুবেলা) টিকার দুই ডোজ গ্রহণ করলে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এই রোগ থেকে সুরক্ষা পাওয়া সম্ভব। তাই যেসব শিশু এখনও টিকার আওতায় আসেনি, তাদের দ্রুত টিকাদানের আওতায় আনা জরুরি।
এছাড়া অভিভাবকদের সচেতনতা বাড়ানোও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিশুর জ্বর বা র্যাশ দেখা দিলে দেরি না করে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া, আক্রান্ত শিশুকে আলাদা রাখা, পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা এবং পুষ্টিকর খাবার নিশ্চিত করা - এসব বিষয় অবহেলা করা চলবে না।
সরকার ও স্বাস্থ্য বিভাগকে এই পরিস্থিতিতে আরও সক্রিয় হতে হবে। গ্রাম থেকে শহর - সব জায়গায় টিকাদান কর্মসূচি জোরদার করা, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং গুজব প্রতিরোধে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। পাশাপাশি স্থানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদেরও এ বিষয়ে ভূমিকা রাখতে হবে।
সবশেষে বলতে হয়, হাম কোনো অবহেলার রোগ নয়। এটি প্রতিরোধযোগ্য, কিন্তু অবহেলা করলে প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে। তাই এখনই সময় সচেতন হওয়ার, দায়িত্ব নেওয়ার এবং শিশুদের নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার।