শিক্ষার সামাজিক পরিবেশ

আপলোড সময় : ৩১-০৩-২০২৬ ১০:২১:৩৬ অপরাহ্ন , আপডেট সময় : ৩১-০৩-২০২৬ ১০:২২:৪২ অপরাহ্ন
মোহাম্মদ জামাল উদ্দিন::
“বিদ্যা অমূল্য ধন” হাই স্কুলে পড়েছিলাম কিন্তু অর্থ তখন পুরোপুরি বুঝতাম না। এখন যেমনটি অনুধাবন করতে পারছি। এই অমূল্য বিদ্যা অর্জন করাও খুব কঠিন কাজ। এর জন্য প্রথমত দরকার একটা শিক্ষার সামাজিক পরিবেশ। এক কালে ছিল সন্ধ্যার পরে ঘরে ঘরে - বাতি, হারিকেন, কেরোসিনের কুপি জ্বালিয়ে স্কুলগামী সব ছেলে-মেয়ে পড়তে বসতো। কিন্তু এখন আর এমনটি নেই। যুগের পরিবর্তনে লেখাপড়ার ধরণ ও পরিবেশে অনেক পরিবর্তন এসেছে। আমাদের সমাজে ধনী, গরীব, মধ্যবিত্ত, নি¤œবিত্ত, হতদরিদ্র এবং বিভিন্ন পেশার লোকজন দৈনিক, সাপ্তাহিক, মাসিক, বাৎসরিক যে কাজগুলো করি বা যে যেভাবে চলি এবং যা রীতিনীতি মেনে চলি মোটামুটি তাই হলো আমাদের সামাজিক পরিবেশ। এই সামাজিক পরিবেশে এখন একটা বিষয় হারিয়ে গেছে তা হলো শিক্ষার্থীদের লেখাপড়ার বিষয়ে আমি, আপনি, আমরা কিছু বলতে পারিনা। সকাল, দুপুর, বিকাল, এমনকি সন্ধ্যার পরও ঘরে পড়তে না বসে রাস্তাঘাটে অযথা ঘুরাঘুরি করতে দেখি এরা আমাদের কারো ছেলেমেয়ে, ছোট ভাই-বোন, ভাতিজা-ভাতিজী, ভাগনা-ভাগিনী অথবা পাড়া-প্রতিবেশীর ছেলে মেয়ে। কিন্তু কেন পড়ার সময় বাইরে ঘুরছে, পড়তে বসছে না সমাজে গণ্যমান্য ব্যক্তি বা সিনিয়র সিটিজেনদের সেই কথা বলার অধিকার হারিয়ে গেছে। অধিকার ফিরিয়ে এনে শিক্ষার পরিবেশ তৈরি করা আমাদের সবার নৈতিক দায়িত্ব ও কর্তব্য। নতুবা বিদ্যার মতো অমূল্য ধন অর্জন ও সমাজের উন্নয়ন করা কোনটাই সম্ভব না। যে সকল পরিবার ছেলেমেয়েকে কঠোর নিয়ম-শৃঙ্খলে রেখেছেন তারাই সফল হচ্ছেন আর তা হলো সমাজের ২০% শিক্ষার্থী। বাকি ৮০% শিক্ষার্থীকে সঠিক শিক্ষা দিতে না পারলে সমাজ ও দেশের পরিবর্তন বা উন্নতি সম্ভব না। সঠিক শিক্ষার অভাব বা শুধুমাত্র সনদ অর্জনের একটি উদাহরণ হলো:- একদিন একজন প্রাইভেট ইউভার্সিটি থেকে ইংরেজি সাহিত্যে অনার্স ও মাস্টার্স স¤পন্ন করে আমার কাছে ইংরেজিতে লেখা একটা ঈঠ জমা দিলেন। পরের দিন আমি খাম খুলে সিভিটা দেখি তাতে ঠিকানা লেখা “সিএনজি পেট্রোল পা¤েপর পাশে” এটাকে ইংরেজিতে লিখেছেন- “ঈঘএ চবঃৎড়ষ ঢ়ঁসঢ়বৎ ঢ়ধংব.” এখন কথা হলো সর্বোচ্চ ডিগ্রি অর্জন করে পা¤েপর পাশে ইংলিশ যদি “চঁসঢ়বৎ চধংবব” লিখেন তাহলে দেশ ও জাতি এই ধরনের শিক্ষিত জনের কাছ থেকে কি পাবে? এমন বিদ্যাকে অমূল্য ধন বলা যাবে না। এগুলো হলো যত্রতত্র প্রাইভেট ইউভার্সিটি গড়ে তোলার ফল এবং কম নম্বর পেয়ে পাস করে মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে ভর্তির সুযোগ পাওয়া। বর্তমানে সুষ্ঠু, সঠিক শিক্ষা অর্জন নিশ্চিত করতে হলে সমাজের সবার দায়িত্ব পালনে এগিয়ে আসতে হবে। এটা শুধু মাত্র ৫ ঘণ্টার জন্য স্কুলে পাঠিয়ে একজন শিক্ষকের উপর দায়িত্ব দিলেই সম্ভব হবে না। বাকি ১৯ ঘণ্টা শিক্ষার্থী থাকে মা-বাবা, পরিবারের আত্মীয়-স্বজনের সাথে। বর্তমান লেখাপড়ার সিস্টেমে ফেল করা কঠিন কেননা সৃজনশীল উত্তর অনেকভাবে সৃজন করে লেখা যায়। তাই কোন মতে উদ্দীপকের আলোকে কিছু লিখতে পারলেই কিছু পাস নম্বর পাওয়া যায়। ৯০ দশকে একটি প্রশ্নের উত্তর হুবহু মুখস্থ লিখলেও ১০ এর মধ্যে ৬ বা সর্বোচ্চ ৭ মার্ক পাওয়া যেতো। বেশির ভাগ শিক্ষার্থীই ৪ বা ৫ পেতো। মুখস্থ বিদ্যা দূরীকরণের লক্ষ্যে বর্তমান সৃজনশীল পদ্ধতি। কিন্তু আগে মুখস্থ করাও এতো সহজ ছিল না, বেশ কয়েকটা বাংলা কিংবা ইংরেজি রচনা মুখস্থ করা সবার পক্ষে মোটেই সহজ ছিল না। যারা এই মুখস্থ বিদ্যা, সন্ধি বিচ্ছেদ, বাগধারা, সমাস, এক কথায় প্রকাশ, কারক, শব্দ, বিরাম চিহ্ন, সারাংশ, ভাব সম্প্রসারণ, বাংলা ব্যাকরণ, ইংরেজি গ্রামার ইত্যাদি বুঝতে পারছেন কেবল তারা অনেকেই উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করতে পেরেছেন। কিন্তু এসব বিষয়ে এখন আর আগের মত খুব বেশি করে না শিখেও পাশ করা যায়। যারা ৯০ দশকের শিক্ষার্থী হিসেবে উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করেছেন বর্তমানে সর্বোচ্চ উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করার থেকেও বেশি শিক্ষিত মনে হয় এবং স্ব স্ব ক্ষেত্রে, চাকুরী ক্ষেত্রে, অনেকই ব্যবসা-বাণিজ্যে, বিভিন্ন বিভাগে প্রতিষ্ঠিত। তাই বর্তমান সময়ে সঠিক শিক্ষা অর্জন নিশ্চিত করতে হলে স্কুলগামী ছেলে মেয়ের লেখাপড়ার প্রতি সমাজের সবার নজরদারি বাড়াতে হবে। তরুণ সমাজের অবক্ষয় রোধে সমাজের অভিভাবককেই পদক্ষেপ নিতে হবে, সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। প্রবাদ আছে- “শিক্ষাই জাতির মেরুদ-”। কিন্তু বর্তমানে সুশিক্ষা ও কারিগরি শিক্ষাই হতে পারে জাতির মেরুদ-। ইদানিং লক্ষণীয় আমাদের শহর সুনামগঞ্জের বিভিন্ন স্থানে প্রায়ই দেখা যায় কিছু শিক্ষার্থী যেমন- রিভার ভিউ, কলেজের হিন্দু হোস্টেলের মোড়ে আরো বিভিন্ন স্থানে অযথা দাঁড়িয়ে ছেলে-মেয়ে আড্ডা দেয়। তার সাথে কিছু ছেলেদের হাতে সিগারেট। এই সিগারেট থেকেই আস্তে আস্তে একদিন বিভিন্ন জাতের নেশার প্রতি আসক্তি বেড়ে যাবে। এক সময় এই মাদক থেকে তাদেরকে আর ফেরানো যাবে না। এ থেকে রক্ষা করার জন্য এখনই উদ্যোগ না নিলে সুনামগঞ্জের শিক্ষার হার তলানীতেই রয়ে যাবে। সামাজিক শিক্ষার পরিবেশ তৈরি করতে সন্ধ্যার সময় ছাত্র-ছাত্রী যাতে অযথা রাস্তায় ঘুরাঘুরি ও দিনের বেলা উল্লেখযোগ্য স্থানে ঘুরাঘুরি, স্কুল ড্রেস পরিধান করে বিভিন্ন পার্কে প্রবেশ বন্ধ করার জন্য অভিভাবক ও প্রশাসনের নজরদারি বাড়ানো দরকার। সমাজের নেতৃত্ব প্রদানকারী জননেতা, সুধীজন, গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ, শিক্ষক এমনকি স্থানীয় এমপি মহোদয়ও এই তরুণ-কিশোর সমাজকে রক্ষা করার জন্য জনসচেতনতা বৃদ্ধি করতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে পারেন। সমন্বিত প্রচেষ্টায় সুনামগঞ্জের শিক্ষার হার বেড়ে উঠুক তাই যেন সকলের প্রত্যাশা হয়।
[মোহাম্মদ জামাল উদ্দিন, সহকারী প্রধান শিক্ষক, সুনামগঞ্জ উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়]

সম্পাদকীয় :

  • সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি : মো. জিয়াউল হক
  • সম্পাদক ও প্রকাশক : বিজন সেন রায়
  • বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : মোক্তারপাড়া রোড, সুনামগঞ্জ-৩০০০।

অফিস :

  • ই-মেইল : [email protected]
  • ওয়েবসাইট : www.sunamkantha.com