এডভোকেট স্বপন কুমার দেব
অন্য একটি বিষয় নিয়ে লেখা সাব্যস্ত করেছিলাম। ঝর্ণা আপার মৃত্যুর খবরে বদলে গেছে তা। ঝর্ণা আপাকে নিয়ে যেটুকু স্মৃতিতে আছে তা লেখতে মনের মধ্যে ভীষণ তাগিদ অনুভব করছি। জাতীয় সংসদের মাননীয় স্পিকার বীর মুক্তিযোদ্ধা সাবেক কৃতী ফুটবলার মেজর (অব.) বীর বিক্রম হাফিজ উদ্দিন সাহেবের সহধর্মিণী দিলারা হাফিজ ঝর্ণা আপা শনিবার বাংলাদেশ সময় বেলা সাড়ে এগারোটায় সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় পরিণত বয়সে মৃত্যুবরণ করেছেন। এতে আমি ভীষণভাবে শোকাভিভূত হয়েছি। উনার বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করি এবং শোকসন্তপ্ত পরিবার ও স্বজনদের প্রতি গভীর শোক ও সমবেদনা জানাচ্ছি। ঝর্ণা আপাকে ছোটবেলা থেকেই চিনতাম। কারণ ঝর্ণা আপা ছিলেন করিমুন্নেসা মাসীমা’র মেয়ে। করিমুন্নেসা মাসীমা ও আমার মা কিরণ বালা দেব একসঙ্গে দীর্ঘদিন শহরের এসসি গার্লস হাই স্কুলে শিক্ষকতা করেছেন। শৈশবে মায়ের সঙ্গে এই স্কুলের লাইব্রেরি থেকে বই আনতে যেতাম নিয়মিত। করিমুন্নেসা মাসীমা ও উনার মেয়েরা ছিলেন বইয়ের পোকা। ঝর্ণা আপা এসসি গার্লস হাই স্কুলে পড়াশোনা করতেন ও এখান থেকেই মেট্রিক পাশ করেন। যতদূর মনে পড়ে এখানকার কলেজ থেকেই ইন্টারমিডিয়েট পাশ করেন! অতঃপর উচ্চ শিক্ষার্থে ঢাকা যান ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স ডিগ্রি লাভ করেন। সম্ভবত ইতিহাসে। একবার মায়ের সংক্রান্তি নিমন্ত্রণে ছোটবেলায় ঝর্ণা আপা করিমুন্নেসা মাসীমার সঙ্গে আমাদের বাসায় এসেছিলেন। ঝর্ণা আপার বাবা আবুল হোসেন মোক্তার সাহেব। আমার বাবাও ছিলেন আইনজীবী। গার্ডিয়ানরা ছোটদের কোর্টে ঘোরাঘুরি করতে নিষেধ করলেও মাঝেমাঝে হজমী কিনতে লুকিয়ে চলে যেতাম। আবুল হোসেন সাহেব দেখতে লম্বা চওড়া ফর্সা রং ছিল। উনি আমাকে কোর্টে দেখলেই প্রথমে ভরত দা’র স্টল থেকে রসগোল্লা ও জেম বিস্কুট খাইয়ে বলে দিতেন, কোর্টে আর আসবে না। নিয়তির বিধানে নিজে উকিল হই এবং দীর্ঘদিন কোর্ট প্রাঙ্গণে সময় অতিক্রম করি। মনটা সেখানেই পড়ে আছে। ঝর্ণা আপা দেখতে সুন্দরী ও ফর্সা ছিলেন। কিরণদি’র ছেলে হিসেবে স্কুলে গেলে ঝর্ণা আপা, এলাদি এরা আমার সঙ্গে কথা বললে আমি লজ্জায় কোনো কথা বলতে পারতাম না! তখন খুব হাসাহাসি হতো! ঝর্ণা আপা সুনামগঞ্জের আরেক কিংবদন্তি মেজর (অব.) ইকবাল হোসেন চৌধুরী মাসুক ভাইয়ের আপন ছোটবোন। ইকবাল ভাই মন্ত্রী থাকাকালে সুনামগঞ্জ শহরে তুলনামূলকভাবে অনেক আগেই রান্নার গ্যাস লাইন এনে দিয়েছিলেন মহিলাদের জোরালো দাবির প্রেক্ষিতে। এতে পুরুষদের আদৌ কোন আগ্রহ ছিল না। ডিজিটাল ল্যান্ড টেলিফোন এনে আধুনিক এক্সচেঞ্জ অফিস স্থাপন করেন। সর্বোপরি ছাতক ও জগন্নাথপুর যখন সিলেটের সঙ্গে প্রায় যোগ দেয় দেয় অবস্থা ছিল ও নিকারে প্রস্তাব পর্যন্ত পাশ হয়ে গিয়েছিল তখন তিনি তা আটকে দিতে সমর্থ্য হন। সুনামগঞ্জবাসী উনার পাশে ছিল অটল। আমাদের বাসার লাগোয়া পশ্চিমে দিকের কাঠের শিলং টাইপ অপূর্ব সুন্দর দোতলা বাংলো বাড়ির মালিক ছিলেন কাঠইড়ের রায় সাহেব। পরবর্তীতে এই বাড়িটি খরিদ করেন ঝর্ণা আপার আপন মামা ডা. আবুল লেইস সাহেব ও আপন খালা গণি দারোগা সাহেবের স্ত্রী। বন্ধু রানা ভাইয়ের আম্মা। তারা এখানে বসবাস শুরু করেন। তখন ঝর্ণা আপা, মাসুক ভাই তারা আরপিননগরের বাসা থেকে নিয়মিত আসা-যাওয়া করতেন এই বাংলো বাড়িতে। মাসুক ভাই এখানেই থাকতেন প্রায় সময়। ফুটবল খেলতেন আমরা ছোটবড় মিলিয়ে। ঝর্ণা আপার সঙ্গে আলাপ হতো। তিনি ছোটভাইয়ের মতো দেখতেন। কালের বিবর্তনে বাংলো বাড়িটি একসময় ভাঙা পড়ে যায়। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ঝর্ণা আপার বিয়ে হয় হাফিজ উদ্দিন সাহেবের সঙ্গে। সেই থেকে ঝর্ণা আপা দিলারা হাফিজ নামেই বেশি পরিচিত। করিমুন্নেসা মাসীমা গল্প করছিলেন আমার মায়ের সঙ্গে যে জামাই খুব ভালো হয়েছে। খুব যত্ব আত্তি করেছে তারা। ঢাকা থেকে আসার সময় মেয়ে জামাই এয়ারপোর্ট এসে উনাকে প্লেনে তুলে দেয়। ইকবাল ভাই বিয়ের পর একদিন মামা ও খালার বাসায় নতুন বউ মমতাজ ইকবালকে সঙ্গে নিয়ে দেখা করতে আসলে তারা আমাদের বাসায় এসেছিলেন। সাথে আপাও ছিলেন। তখন আমার মা জীবিত ছিলেন। সেদিন ঝর্ণা আপার সঙ্গে নানা বিষয়ে আলাপ হয়েছিল মনে আছে। উনার ছোটবোন ফোয়ারার বিয়ের সময় গেট ধরা নিয়ে একটি মজার ঘটনা ঘটে! বরযাত্রীরা আসলে মেয়েরা গেটে আটকালে দরকষাকষি চলতে থাকে! এক পর্যায়ে তারা বেশ কিছু নোট দিলে সবাই খুশি হয়ে গেট ছেড়ে দেন। মুহূর্তে চিৎকার উঠেছিল! সব নোট পাকিস্তানি একশত রুপির নোট! প্রতিবাদ হলেও কাজ হয়নি! বরযাত্রী দল অলরেডি গেট পাস করে ভেতরে ঢুকে গেছেন! ভালো খাওয়া ছিল। প্রথম বুরহানী খাই। চমৎকার স্বাদ! ঝর্ণা আপারা ঢাকা থেকে সুনামগঞ্জে বেড়াতে আসলেই খালা ও মামার বাসায় আসতেন। তখন মাঝেমাঝে দেখা হয়ে যেত। একসময় ইকবাল ভাইয়ের সঙ্গে যোগাযোগ খুব বেড়ে যায়। ইকবাল ভাইয়ের মৃত্যুর পরে ভাবি মমতাজ ইকবালের সঙ্গেও যোগাযোগ বেড়েছিল। মহাজোট থেকে উনার এমপি ইলেকশনে কিছু আইনী বিষয়ে আমি সংশ্লিষ্ট ছিলাম। ঝর্ণা আপা যখন ইডেন কলেজের প্রিন্সিপাল ছিলেন তখন একদিন উনার কক্ষে গিয়েছিলাম। সঙ্গে আমার বড় মেয়ে ছিল। ঝর্ণা আপা আমাকে বসতে দিয়ে সেখানে থাকা অন্য শিক্ষিকাদের সঙ্গে আমার পরিচয় করিয়ে দেন এই বলে, ওর মা আমার শিক্ষিকা ছিলেন। তারপর চা ও সিঙ্গাড়া খাইয়ে দেন। আমি নুতন বাসা বানানোর পরে একদিন ঝর্ণা আপা উনার ছোটভাই মাহবুবকে সাথে নিয়ে এমনিতেই বেড়াতে এসেছিলেন। সব দেখে বললেন খুব সুন্দর বাসা বানাইছো স্বপন। উনাকে আমার লেখা বই উপহার দিলে তিনি খুব খুশি হন। মাহবুবকেও দেই। সে বলেছিল কানাডা যেতে প্লেনে বসে বসে পড়বে। মাহবুব আমার ছোটভাই প্রয়াত অঞ্জনের বন্ধু ও ক্লাসমেট। মাহবুব এখন ঠিক কোথায় আছে জানা নেই! মনে হয় কানাডাতেই কোন প্রোভিন্সে আছে! আমার বই পড়ে ঝর্ণা আপার ভালো লেগেছিল এবং তা মোবাইল ফোনে আমাকে জানিয়েছিলেন। ঝর্ণা আপা একজন সুলেখিকা। একাধিক বই লিখেছেন। আমাকে বই উপহার দেন, চার কন্যা। নিজেদের মা খালাদের কাহিনী। কি সুন্দর লেখার গতি ও আকর্ষণ। পড়ে মুগ্ধ হই। সর্বশেষ সামনাসামনি দেখা ও কথাবার্তা হয় এসসি গার্লস হাইস্কুলের ৭৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে। উনি অনুষ্ঠানে যোগ দিতে এসেছিলেন। ‘চন্দ্রলোকের বালিকারা’ কি সুন্দর ম্যাগাজিন। সঞ্চিতা চৌধুরী এরা দায়িত্বে ছিলেন অনুষ্ঠানের। ঝর্ণা আপার লেখা ছিল। আমার একটি লেখাও ছাপা হলে আমি ধন্য হই। অনুষ্ঠান উপলক্ষে ঝর্ণা আপার সঙ্গে দেখা হয় সামনের সড়কে। সেদিন আর বাসায় আসেননি। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে অনেক কথা হয়েছিল। আমার স্ত্রী শুভ্রাকে উনি খুব ¯েœহ করতেন ও মাঝেমাঝে আলাপ করতেন। শেষে ফেসবুকের মাধ্যমে একটা যোগাযোগ ছিল। কমেন্ট করতেন। আমিও করতাম উনার লেখা পড়ে। পুরাতন কাঠের বাংলো বাড়ি ও শহরের অন্যান্য পুরাতন বাড়ি নিয়ে আমার ‘এলোমেলো ডায়েরি’ ১৮ পর্বে একটি পোস্ট দেই। বাড়ির রঙিন স্ক্যাচসহ। লেখার পেছনে কবি ও উকিল রোকেশ লেইসের অনুপ্রেরণা ছিল। এই বাড়িতেই তো রোকেশের শৈশব কেটেছে। তাই ভুলতে পারেননা! হয়তো কিছুটা আফসোস থাকতে পারে কবি মনে! এই লেখা পড়ে ঝর্ণা আপা একটি সুন্দর স্মৃতি জাগানিয়া কমেন্ট করেছিলেন। তা খুঁজে পেয়েছি। আংশিক তুলে দিলাম এখানে- “সুন্দর বর্ণনা করেছো স্বপন। এই বাড়ীটা দেখতে আমারও খুব ভালো লাগতো। পরবর্তী সময়ে যখন আমার মামা-খালারা এই বাড়ীতে উঠলেন, তখন টিফিন ব্রেকে প্রত্যেক দিনই যেতাম, ছোট বড় ঘরগুলো ঘুরে দেখতাম, লিচুতলা আর বরই তলায়ও (মৌসুমে) একটা চক্কর দিয়ে নিতাম.....।” ঝর্ণা আপা মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক থাকাকালীন সুনামগঞ্জের জন্য বিশেষ অবদান রাখেন। উনার বন্ধু সার্কেল অনেক বড় ছিল। দেশে দেশে বেড়াতে খুব ভালোবাসতেন। অনেক দেশ ভ্রমণ করেছেন। ঝর্ণা আপার স্মৃতি আমার কাছে চিরদিন জীবন্ত থাকবে। স্নেহময়ী ও মমতাময়ী ঝর্ণা আপা, আপনি জান্নাতবাসী হোন।
অন্য একটি বিষয় নিয়ে লেখা সাব্যস্ত করেছিলাম। ঝর্ণা আপার মৃত্যুর খবরে বদলে গেছে তা। ঝর্ণা আপাকে নিয়ে যেটুকু স্মৃতিতে আছে তা লেখতে মনের মধ্যে ভীষণ তাগিদ অনুভব করছি। জাতীয় সংসদের মাননীয় স্পিকার বীর মুক্তিযোদ্ধা সাবেক কৃতী ফুটবলার মেজর (অব.) বীর বিক্রম হাফিজ উদ্দিন সাহেবের সহধর্মিণী দিলারা হাফিজ ঝর্ণা আপা শনিবার বাংলাদেশ সময় বেলা সাড়ে এগারোটায় সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় পরিণত বয়সে মৃত্যুবরণ করেছেন। এতে আমি ভীষণভাবে শোকাভিভূত হয়েছি। উনার বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করি এবং শোকসন্তপ্ত পরিবার ও স্বজনদের প্রতি গভীর শোক ও সমবেদনা জানাচ্ছি। ঝর্ণা আপাকে ছোটবেলা থেকেই চিনতাম। কারণ ঝর্ণা আপা ছিলেন করিমুন্নেসা মাসীমা’র মেয়ে। করিমুন্নেসা মাসীমা ও আমার মা কিরণ বালা দেব একসঙ্গে দীর্ঘদিন শহরের এসসি গার্লস হাই স্কুলে শিক্ষকতা করেছেন। শৈশবে মায়ের সঙ্গে এই স্কুলের লাইব্রেরি থেকে বই আনতে যেতাম নিয়মিত। করিমুন্নেসা মাসীমা ও উনার মেয়েরা ছিলেন বইয়ের পোকা। ঝর্ণা আপা এসসি গার্লস হাই স্কুলে পড়াশোনা করতেন ও এখান থেকেই মেট্রিক পাশ করেন। যতদূর মনে পড়ে এখানকার কলেজ থেকেই ইন্টারমিডিয়েট পাশ করেন! অতঃপর উচ্চ শিক্ষার্থে ঢাকা যান ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স ডিগ্রি লাভ করেন। সম্ভবত ইতিহাসে। একবার মায়ের সংক্রান্তি নিমন্ত্রণে ছোটবেলায় ঝর্ণা আপা করিমুন্নেসা মাসীমার সঙ্গে আমাদের বাসায় এসেছিলেন। ঝর্ণা আপার বাবা আবুল হোসেন মোক্তার সাহেব। আমার বাবাও ছিলেন আইনজীবী। গার্ডিয়ানরা ছোটদের কোর্টে ঘোরাঘুরি করতে নিষেধ করলেও মাঝেমাঝে হজমী কিনতে লুকিয়ে চলে যেতাম। আবুল হোসেন সাহেব দেখতে লম্বা চওড়া ফর্সা রং ছিল। উনি আমাকে কোর্টে দেখলেই প্রথমে ভরত দা’র স্টল থেকে রসগোল্লা ও জেম বিস্কুট খাইয়ে বলে দিতেন, কোর্টে আর আসবে না। নিয়তির বিধানে নিজে উকিল হই এবং দীর্ঘদিন কোর্ট প্রাঙ্গণে সময় অতিক্রম করি। মনটা সেখানেই পড়ে আছে। ঝর্ণা আপা দেখতে সুন্দরী ও ফর্সা ছিলেন। কিরণদি’র ছেলে হিসেবে স্কুলে গেলে ঝর্ণা আপা, এলাদি এরা আমার সঙ্গে কথা বললে আমি লজ্জায় কোনো কথা বলতে পারতাম না! তখন খুব হাসাহাসি হতো! ঝর্ণা আপা সুনামগঞ্জের আরেক কিংবদন্তি মেজর (অব.) ইকবাল হোসেন চৌধুরী মাসুক ভাইয়ের আপন ছোটবোন। ইকবাল ভাই মন্ত্রী থাকাকালে সুনামগঞ্জ শহরে তুলনামূলকভাবে অনেক আগেই রান্নার গ্যাস লাইন এনে দিয়েছিলেন মহিলাদের জোরালো দাবির প্রেক্ষিতে। এতে পুরুষদের আদৌ কোন আগ্রহ ছিল না। ডিজিটাল ল্যান্ড টেলিফোন এনে আধুনিক এক্সচেঞ্জ অফিস স্থাপন করেন। সর্বোপরি ছাতক ও জগন্নাথপুর যখন সিলেটের সঙ্গে প্রায় যোগ দেয় দেয় অবস্থা ছিল ও নিকারে প্রস্তাব পর্যন্ত পাশ হয়ে গিয়েছিল তখন তিনি তা আটকে দিতে সমর্থ্য হন। সুনামগঞ্জবাসী উনার পাশে ছিল অটল। আমাদের বাসার লাগোয়া পশ্চিমে দিকের কাঠের শিলং টাইপ অপূর্ব সুন্দর দোতলা বাংলো বাড়ির মালিক ছিলেন কাঠইড়ের রায় সাহেব। পরবর্তীতে এই বাড়িটি খরিদ করেন ঝর্ণা আপার আপন মামা ডা. আবুল লেইস সাহেব ও আপন খালা গণি দারোগা সাহেবের স্ত্রী। বন্ধু রানা ভাইয়ের আম্মা। তারা এখানে বসবাস শুরু করেন। তখন ঝর্ণা আপা, মাসুক ভাই তারা আরপিননগরের বাসা থেকে নিয়মিত আসা-যাওয়া করতেন এই বাংলো বাড়িতে। মাসুক ভাই এখানেই থাকতেন প্রায় সময়। ফুটবল খেলতেন আমরা ছোটবড় মিলিয়ে। ঝর্ণা আপার সঙ্গে আলাপ হতো। তিনি ছোটভাইয়ের মতো দেখতেন। কালের বিবর্তনে বাংলো বাড়িটি একসময় ভাঙা পড়ে যায়। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ঝর্ণা আপার বিয়ে হয় হাফিজ উদ্দিন সাহেবের সঙ্গে। সেই থেকে ঝর্ণা আপা দিলারা হাফিজ নামেই বেশি পরিচিত। করিমুন্নেসা মাসীমা গল্প করছিলেন আমার মায়ের সঙ্গে যে জামাই খুব ভালো হয়েছে। খুব যত্ব আত্তি করেছে তারা। ঢাকা থেকে আসার সময় মেয়ে জামাই এয়ারপোর্ট এসে উনাকে প্লেনে তুলে দেয়। ইকবাল ভাই বিয়ের পর একদিন মামা ও খালার বাসায় নতুন বউ মমতাজ ইকবালকে সঙ্গে নিয়ে দেখা করতে আসলে তারা আমাদের বাসায় এসেছিলেন। সাথে আপাও ছিলেন। তখন আমার মা জীবিত ছিলেন। সেদিন ঝর্ণা আপার সঙ্গে নানা বিষয়ে আলাপ হয়েছিল মনে আছে। উনার ছোটবোন ফোয়ারার বিয়ের সময় গেট ধরা নিয়ে একটি মজার ঘটনা ঘটে! বরযাত্রীরা আসলে মেয়েরা গেটে আটকালে দরকষাকষি চলতে থাকে! এক পর্যায়ে তারা বেশ কিছু নোট দিলে সবাই খুশি হয়ে গেট ছেড়ে দেন। মুহূর্তে চিৎকার উঠেছিল! সব নোট পাকিস্তানি একশত রুপির নোট! প্রতিবাদ হলেও কাজ হয়নি! বরযাত্রী দল অলরেডি গেট পাস করে ভেতরে ঢুকে গেছেন! ভালো খাওয়া ছিল। প্রথম বুরহানী খাই। চমৎকার স্বাদ! ঝর্ণা আপারা ঢাকা থেকে সুনামগঞ্জে বেড়াতে আসলেই খালা ও মামার বাসায় আসতেন। তখন মাঝেমাঝে দেখা হয়ে যেত। একসময় ইকবাল ভাইয়ের সঙ্গে যোগাযোগ খুব বেড়ে যায়। ইকবাল ভাইয়ের মৃত্যুর পরে ভাবি মমতাজ ইকবালের সঙ্গেও যোগাযোগ বেড়েছিল। মহাজোট থেকে উনার এমপি ইলেকশনে কিছু আইনী বিষয়ে আমি সংশ্লিষ্ট ছিলাম। ঝর্ণা আপা যখন ইডেন কলেজের প্রিন্সিপাল ছিলেন তখন একদিন উনার কক্ষে গিয়েছিলাম। সঙ্গে আমার বড় মেয়ে ছিল। ঝর্ণা আপা আমাকে বসতে দিয়ে সেখানে থাকা অন্য শিক্ষিকাদের সঙ্গে আমার পরিচয় করিয়ে দেন এই বলে, ওর মা আমার শিক্ষিকা ছিলেন। তারপর চা ও সিঙ্গাড়া খাইয়ে দেন। আমি নুতন বাসা বানানোর পরে একদিন ঝর্ণা আপা উনার ছোটভাই মাহবুবকে সাথে নিয়ে এমনিতেই বেড়াতে এসেছিলেন। সব দেখে বললেন খুব সুন্দর বাসা বানাইছো স্বপন। উনাকে আমার লেখা বই উপহার দিলে তিনি খুব খুশি হন। মাহবুবকেও দেই। সে বলেছিল কানাডা যেতে প্লেনে বসে বসে পড়বে। মাহবুব আমার ছোটভাই প্রয়াত অঞ্জনের বন্ধু ও ক্লাসমেট। মাহবুব এখন ঠিক কোথায় আছে জানা নেই! মনে হয় কানাডাতেই কোন প্রোভিন্সে আছে! আমার বই পড়ে ঝর্ণা আপার ভালো লেগেছিল এবং তা মোবাইল ফোনে আমাকে জানিয়েছিলেন। ঝর্ণা আপা একজন সুলেখিকা। একাধিক বই লিখেছেন। আমাকে বই উপহার দেন, চার কন্যা। নিজেদের মা খালাদের কাহিনী। কি সুন্দর লেখার গতি ও আকর্ষণ। পড়ে মুগ্ধ হই। সর্বশেষ সামনাসামনি দেখা ও কথাবার্তা হয় এসসি গার্লস হাইস্কুলের ৭৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে। উনি অনুষ্ঠানে যোগ দিতে এসেছিলেন। ‘চন্দ্রলোকের বালিকারা’ কি সুন্দর ম্যাগাজিন। সঞ্চিতা চৌধুরী এরা দায়িত্বে ছিলেন অনুষ্ঠানের। ঝর্ণা আপার লেখা ছিল। আমার একটি লেখাও ছাপা হলে আমি ধন্য হই। অনুষ্ঠান উপলক্ষে ঝর্ণা আপার সঙ্গে দেখা হয় সামনের সড়কে। সেদিন আর বাসায় আসেননি। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে অনেক কথা হয়েছিল। আমার স্ত্রী শুভ্রাকে উনি খুব ¯েœহ করতেন ও মাঝেমাঝে আলাপ করতেন। শেষে ফেসবুকের মাধ্যমে একটা যোগাযোগ ছিল। কমেন্ট করতেন। আমিও করতাম উনার লেখা পড়ে। পুরাতন কাঠের বাংলো বাড়ি ও শহরের অন্যান্য পুরাতন বাড়ি নিয়ে আমার ‘এলোমেলো ডায়েরি’ ১৮ পর্বে একটি পোস্ট দেই। বাড়ির রঙিন স্ক্যাচসহ। লেখার পেছনে কবি ও উকিল রোকেশ লেইসের অনুপ্রেরণা ছিল। এই বাড়িতেই তো রোকেশের শৈশব কেটেছে। তাই ভুলতে পারেননা! হয়তো কিছুটা আফসোস থাকতে পারে কবি মনে! এই লেখা পড়ে ঝর্ণা আপা একটি সুন্দর স্মৃতি জাগানিয়া কমেন্ট করেছিলেন। তা খুঁজে পেয়েছি। আংশিক তুলে দিলাম এখানে- “সুন্দর বর্ণনা করেছো স্বপন। এই বাড়ীটা দেখতে আমারও খুব ভালো লাগতো। পরবর্তী সময়ে যখন আমার মামা-খালারা এই বাড়ীতে উঠলেন, তখন টিফিন ব্রেকে প্রত্যেক দিনই যেতাম, ছোট বড় ঘরগুলো ঘুরে দেখতাম, লিচুতলা আর বরই তলায়ও (মৌসুমে) একটা চক্কর দিয়ে নিতাম.....।” ঝর্ণা আপা মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক থাকাকালীন সুনামগঞ্জের জন্য বিশেষ অবদান রাখেন। উনার বন্ধু সার্কেল অনেক বড় ছিল। দেশে দেশে বেড়াতে খুব ভালোবাসতেন। অনেক দেশ ভ্রমণ করেছেন। ঝর্ণা আপার স্মৃতি আমার কাছে চিরদিন জীবন্ত থাকবে। স্নেহময়ী ও মমতাময়ী ঝর্ণা আপা, আপনি জান্নাতবাসী হোন।