সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলে বোরো ধান শুধু একটি মৌসুমি ফসল নয়, বরং এটি স্থানীয় অর্থনীতি ও কৃষকজীবনের প্রধান ভরসা। প্রতি বছর বোরো মৌসুমকে কেন্দ্র করেই হাওরাঞ্চলের হাজারো কৃষকের স্বপ্ন বোনা হয়। কিন্তু চলতি মৌসুমে প্রায় চার শতাধিক ধান কাটার মেশিন বিকল হয়ে পড়ার খবর কৃষকদের জন্য নতুন উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। গত কয়েক বছরে কৃষির আধুনিকায়নের অংশ হিসেবে কৃষি বিভাগ ভর্তুকি মূল্যে কম্বাইন হারভেস্টার ও রিপার মেশিন সরবরাহ করেছিল। এই উদ্যোগ নিঃসন্দেহে হাওরাঞ্চলের কৃষিতে ইতিবাচক পরিবর্তন এনেছিল। শ্রমিক সংকট ও সময়ের সীমাবদ্ধতার মধ্যে অল্প সময়ে ধান কাটার সুযোগ তৈরি হওয়ায় কৃষকের উৎপাদন ব্যয় কমেছে এবং ফসল ঘরে তোলাও সহজ হয়েছে। কিন্তু বর্তমানে এসব যন্ত্রের বড় একটি অংশ অচল হয়ে পড়া সেই অগ্রগতির ধারাবাহিকতাকে প্রশ্নের মুখে ফেলছে। যন্ত্রপাতি সরবরাহ করা যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে সেগুলোর নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও প্রযুক্তিগত সহায়তা নিশ্চিত করা। বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, ব্যয়বহুল এসব যন্ত্র নষ্ট হয়ে গেলে দ্রুত মেরামতের জন্য পর্যাপ্ত কারিগরি সহায়তা পাওয়া যায় না। দক্ষ প্রকৌশলী, খুচরা যন্ত্রাংশ এবং দ্রুত সার্ভিসিং ব্যবস্থার অভাবে অনেক মেশিন দীর্ঘদিন অচল পড়ে থাকে। ফলে কৃষকরা আবারও অনিশ্চয়তার মুখে পড়ছেন। হাওরাঞ্চলের কৃষি বাস্তবতা অন্য অনেক অঞ্চলের তুলনায় ভিন্ন। এখানে প্রাকৃতিক ঝুঁকি অত্যন্ত বেশি। আকস্মিক বন্যা বা আগাম পাহাড়ি ঢলের কারণে অনেক সময় অল্প কয়েক দিনের মধ্যেই ধান কাটতে না পারলে পুরো ফসল নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই ধান কাটার যন্ত্রের অচলাবস্থা শুধু প্রযুক্তিগত সমস্যা নয়; এটি কৃষকের জীবন-জীবিকার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এই পরিস্থিতিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। যেসব মেশিন মেরামতযোগ্য সেগুলো দ্রুত সচল করার পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে দক্ষ মেকানিক ও সার্ভিস সেন্টার গড়ে তোলা প্রয়োজন। একই সঙ্গে ভবিষ্যতের জন্য যন্ত্রপাতির রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করতে হবে, যাতে কৃষকরা যেকোনো সময় প্রয়োজনীয় সহায়তা পান। হাওরের কৃষি দেশের খাদ্য নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই কৃষকের উৎপাদন ব্যবস্থাকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে রাখা কোনোভাবেই কাম্য নয়। সময়মতো ধান কাটার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে সরকার, কৃষি বিভাগ এবং সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষকে সমন্বিতভাবে উদ্যোগ নিতে হবে। নইলে প্রযুক্তিনির্ভর কৃষির যে অগ্রযাত্রা শুরু হয়েছিল, তা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যাবে।