সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চল দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধান উৎপাদন এলাকা। প্রতি বছর বোরো মৌসুমে লাখো কৃষকের ঘাম ঝরে এই হাওরে, আর সেই ফসল রক্ষার প্রধান ভরসা হলো হাওর রক্ষা বাঁধ। কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, যে বাঁধ কৃষকের জীবন ও অর্থনীতিকে রক্ষা করার কথা, সেটিই এখন অনিয়ম ও দুর্নীতির ‘খেত’ হয়ে উঠছে।
সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন হাওর পরিদর্শনে যে চিত্র উঠে এসেছে তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। অভিযোগ রয়েছে, প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি (পিআইসি) গঠন ও বরাদ্দ প্রদানে স্বচ্ছতার অভাব রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে অভিজ্ঞ কৃষক বা স্থানীয়দের বাদ দিয়ে টাকার বিনিময়ে অকৃষক কিংবা দূরবর্তী এলাকার ব্যক্তিদের পিআইসি দেওয়া হয়েছে। ফলে প্রকল্প বাস্তবায়নে দায়িত্বশীলতার ঘাটতি দেখা যাচ্ছে এবং অনেক বাঁধে কাজ ধীরগতিতে চলছে কিংবা শুরুই হয়নি।
আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, অনেক প্রকল্পে দায়সারা কাজের অভিযোগ রয়েছে। কোথাও বাঁধের গোড়া থেকেই মাটি কেটে আবার সেই মাটি দিয়েই কাজ দেখানো হচ্ছে। কোথাও আবার অক্ষত বাঁধে সামান্য ভাঙন দেখিয়ে বড় অঙ্কের বরাদ্দ নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এতে সরকারি অর্থের অপচয় যেমন হচ্ছে, তেমনি হাওরাঞ্চলের কৃষকরাও চরম ঝুঁকিতে পড়ছেন।
সরকার প্রতিবছর হাওর রক্ষা বাঁধ নির্মাণ ও সংস্কারে বিপুল অর্থ বরাদ্দ দেয়। চলতি বছরও শত শত প্রকল্পে শতকোটি টাকার বেশি বরাদ্দ হয়েছে। কিন্তু যদি এই অর্থ সঠিকভাবে ব্যয় না হয়, তাহলে শুধু সরকারি অর্থের অপচয়ই হবে না - বরং সময়মতো বাঁধের কাজ শেষ না হলে আকস্মিক বন্যা বা পাহাড়ি ঢলে কৃষকের সারা বছরের ফসল এক রাতেই তলিয়ে যেতে পারে।
হাওরাঞ্চলের মানুষের অভিজ্ঞতা বলছে, দুর্নীতির অভিযোগ নতুন নয়। প্রায় প্রতিবছরই বাঁধ নির্মাণ ও সংস্কার নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তদন্ত বা জবাবদিহির কার্যকর ব্যবস্থা দেখা যায় না। ফলে একই ধরনের অনিয়ম বছরের পর বছর চলতেই থাকে।
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য কয়েকটি বিষয় অত্যন্ত জরুরি। প্রথমত, পিআইসি গঠন ও প্রকল্প বরাদ্দে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। প্রকৃত কৃষক ও স্থানীয়দের অগ্রাধিকার দিতে হবে। দ্বিতীয়ত, কাজের প্রতিটি ধাপে কঠোর মনিটরিং ও সামাজিক নজরদারি বাড়াতে হবে। তৃতীয়ত, দুর্নীতির অভিযোগ উঠলে নিরপেক্ষ তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা নিতে হবে।
আমরা বারবারই বলছি, হাওর রক্ষা বাঁধ শুধু একটি অবকাঠামো নয়; এটি লাখো কৃষকের জীবিকা ও খাদ্য নিরাপত্তার সাথে সরাসরি জড়িত। তাই এই বাঁধকে দুর্নীতির উৎসে পরিণত হতে দেওয়া যায় না। সরকার, প্রশাসন ও স্থানীয় জনগণের সম্মিলিত উদ্যোগেই কেবল হাওর রক্ষা বাঁধকে সত্যিকার অর্থে কৃষকের নিরাপত্তা বলয়ে পরিণত করা সম্ভব।