বাঁধ যেন অনিয়ম দুর্নীতির ‘খেত’

আপলোড সময় : ০৮-০৩-২০২৬ ০১:৪৯:০১ পূর্বাহ্ন , আপডেট সময় : ০৮-০৩-২০২৬ ০১:৫২:৫৭ পূর্বাহ্ন
* লাখ টাকায় একেকটি পিআইসি বিক্রি
* উৎকোচ অনুযায়ী বরাদ্দ

বিশ্বজিত রায়, হাওর থেকে ফিরে ::
সুনামগঞ্জের হাওর রক্ষা বাঁধকে অনিয়ম-দুর্নীতির ‘খেত’ বানানো হয়েছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে মোটা অংকের টাকায় সাব্যস্ত হয়েছে বাঁধ, বরাদ্দ ও প্রকল্প। টেকসই কাজ ও নির্ধারিত সময়সীমার বিপরীতে কে কত টাকায় প্রকল্প বাগিয়ে নিয়েছে হাওর এলাকায় সেই আলোচনা তুঙ্গে। হাওর আন্দোলনের নেতারা বলছেন- বাঁধের নাম করে সরকারের কোটি কোটি টাকা লোপাটের জাল পাতা হয়েছে হাওরে। অনেকের দাবি, লেনদেনে বনিবনা না হওয়ায় বিগত দিনের অভিজ্ঞ পিআইসিদের বাদ দিয়ে টাকার বিনিময়ে অকৃষক ও জমি থেকে দূরবর্তী মানুষজনকে কাজ দেওয়া হয়েছে। স্থানীয় প্রশাসনের হস্তক্ষেপে হঠাৎ গজিয়ে ওঠা রাজনীতিক ও সাংবাদিক নামধারী কতিপয় লোকের যোগসাজশে পিআইসি বণ্টনে ফায়দা লুটছে পাউবোসহ কর্তাব্যক্তিরা। এতে বর্ধিত সময়েও বাঁধের কাজ শেষ হওয়া দূরের কথা, কিছু প্রকল্পে কাজ শুরু না হওয়ায় শঙ্কা তৈরি হয়েছে হাওরে। ২৮ ফেব্রুয়ারি সময়সীমার শেষ দিনে একাধিক হাওর ঘুরে ক্ষোভ ও হতাশার কথা জানা গেছে।
জেলার সর্বাধিক পিআইসিভুক্ত দিরাই ও শাল্লা উপজেলার উদগল, বরাম, ভান্ডা বিল ও ছায়ার হাওরের অন্তত ২০টি প্রকল্প ঘুরে দেখা যায়, সম্পূর্ণ কাবিটা নীতিমালা পরিপন্থী কাজ চলছে বাঁধে। উদগল হাওরের সন্তোষপুরের সন্নিকটে মাছুয়ার কাড়া ক্লোজার এলাকার ৯৩, ৯৪, ৯৫ নম্বর পিআইসির বাঁধে মাটি ফেলা হচ্ছে। একেবারে বাঁধের গোড়া থেকে মাটি কেটে দায়সারা গোছের কাজ সম্পাদনের চেষ্টা চলছে। এখানকার ৯৬ নম্বর পিআইসির কাজ এখনও শুরুই হয়নি দাবি স্থানীয়দের।
দিরাই উপজেলার উদগল হাওরের চরনাচর ইউনিয়নের জয়পুর গ্রামের আশেপাশে ৮৯ (ক), ৮৯ (খ), ৯০, ৯১ (ক) ও ৯১ (খ) পিআইসির বাঁধেও মাটি পড়ছে। দিরাইয়ের বরাম হাওরের তাড়ল ইউনিয়ন অংশের ৮৪ ও ৮৫ নম্বর পিআইসিসহ শাল্লা উপজেলার ভান্ডা বিল হাওরের একাধিক প্রকল্পে দেখা যায়, মাত্রাতিরিক্ত বরাদ্দে লুটপাটের ক্ষেত্র প্রসারিত হয়েছে। ভাগবাটোয়ারার মাধ্যমে একেকটি প্রকল্পে ২৫ থেকে প্রায় ৪০ লাখ টাকা পর্যন্ত বরাদ্দ দিয়েছে পাউবো। বরাম হাওরের হবিবপুর ইউনিয়নের ব্রাহ্মণগাঁও অংশের ৩০ নম্বর প্রকল্পে রফাদফা না হওয়ায় কাজ হয়নি অভিযোগ কৃষকের। সরেজমিনে কাজের গতিপ্রকৃতি ও ফলকে উল্লেখিত টাকার পরিমাণ দেখে সরকারি অর্থ তছরুপের বিষয়টি প্রতীয়মান হয়েছে।
গত ১৮ জানুয়ারি জামালগঞ্জের জোয়ালভাঙা হাওর অংশের একমাত্র বেড়িবাঁধ পরিদর্শনে গিয়ে পুকুরচুরির আলামত চোখে পড়েছে। ২৮ নম্বর ওই পিআইসিতে এ বছর বরাদ্দ ১৯ লাখ ৩ হাজার ৩৭৯ টাকা। বিগত বছরগুলোতে এ বাঁধে বরাদ্দ ছিল অনেক কম। অক্ষত বাঁধে ছোটখাটো ভাঙন দেখিয়ে বরাদ্দ তছরুপের ক্ষেত্র প্রশস্ত করেছে কর্তৃপক্ষ। সরেজমিনে প্রায় বাঁধে এমন দৃশ্য দেখা গেছে।
পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক জামালগঞ্জের এক কৃষক বলেন, এসও (পাউবোর শাখা কর্মকর্তা) আমার কাছে সরাসরি ৫০ হাজার টেকা চাইছে। আমি কইছি টেকা দিয়া পিআইসি নেই না। যারা দালালী করতে পারে তারারেই বেশি বরাদ্দের পিআইসি দিছে।
সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্রে জানা গেছে, ১২ উপজেলার ৪২টি হাওরে এ বছর ৭১০টি প্রকল্পে ৬০২ কিলোমিটার বাঁধ সংস্কার ও মেরামত কাজ হচ্ছে। এবারের প্রাক্কলন ব্যয় প্রায় ১৪৬ কোটি টাকা। তন্মধ্যে সর্বাধিক বরাদ্দ দিরাই উপজেলায় ১৩০টি পিআইসির অনুকূলে প্রায় ২৯ কোটি এবং শাল্লা উপজেলায় ১২৬টি পিআইসির অনুকূলে প্রায় ৩০ কোটি টাকা।
শাল্লা উপজেলার বরাম হাওর পারের জাতগাঁও গ্রামের কৃষক সবুজ মিয়া বলেন, ৩০ নম্বর পিআইসির ধারে-কাছে মাটি না থাকায় কাজ ছেড়ে দিয়েছি। বরাদ্দ কম তাই দূর থেকে মাটি এনে কাজ সম্ভব না। এসও অন্যদের দিয়ে কাজ করাবেন বললেও এই বাঁধের কাজ শুরুই হয়নি। কথোপকথনের একপর্যায়ে তিনি বলেন, ব্রাহ্মণগাঁওস্থ ওই বাঁধের কাজ ঘুষ দিয়ে হয়তো কেউ নেয়নি। জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলী টাকা চাইছিল। আমি জানিয়ে দিয়েছি টাকা দিয়ে পিআইসি নেই না। যারা লাখ লাখ টাকা দিয়েছে অক্ষত বাঁধে তারাই বেশি বরাদ্দ পেয়েছে দাবি তার। শাল্লা উপজেলা কাবিটা স্কীম বাস্তবায়ন ও মনিটরিং কমিটির সদস্য পাবেল মিয়া বলেন, ‘পিআইসি বণ্টনে বড় বাণিজ্য হয়েছে এটা একদম সঠিক। এ বাণিজ্যের মূলহোতা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলী রাশেদুল ইসলাম। এসও (পাউবোর শাখা কর্মকর্তা) বিল প্রদানের ক্ষেত্রেও টাকা নিচ্ছে। ইউএনও ও এসও দু’জনই সবকিছুর নিয়ন্ত্রক।’ কারও মতামতকে পাত্তা দেওয়া হয়নি জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এনজিও কর্মী, মামলার আসামিও ভিন্ন জায়গার মানুষকে এনে শাল্লায় পিআইসি দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়গুলো আসলে সমর্থনযোগ্য না।’ শাল্লার হাওর সচেতন হিসেবে পরিচিত এমন একজন জানিয়েছেন, কতিপয় সাংবাদিক ও এনসিপির ক’জন মিলে সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছে। প্রকল্প প্রতি দুই থেকে চার লাখ টাকা নেওয়া হয়েছে। যার বড় অংশ গেছে পাউবোর শাখা কর্মকর্তার পকেটে। পিআইসি থেকে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলীর টাকা নেওয়ার বিষয়টিও ‘ওপেন সিক্রেট’। টাকা লেনদেন সংক্রান্ত কথোপকথনের একাধিক রেকর্ড তার সংগ্রহে আছে বলে জানিয়েছেন তিনি। পিআইসি বেচাকেনায় অভিযুক্ত শাল্লার এনসিপি নেতা রাকিবুল ইসলাম বলেন, আমি পিআইসি কমিটির কেউ না। পিআইসি বিক্রির অধিকারও আমার নেই। এসব কাজের সাথে আমি জড়িত না।
সুনামগঞ্জ জেলা হাওর বাঁচাও আন্দোলনের সভাপতি মো. ইয়াকুব বখ্ত বাহলুল বলেন, বিগত বছরের তুলনায় এবার রেকর্ড দুর্নীতি হয়েছে। এক্ষেত্রে শাল্লা ও শান্তিগঞ্জ এগিয়ে। পিআইসি বিক্রি থেকে শুরু করে অক্ষত-শক্তিশালী বাঁধকে এসকেভেটর দিয়ে কুঁচিয়ে বরাদ্দ জায়েজের চেষ্টা হচ্ছে। প্রধান কর্তাব্যক্তিকে এসব বললে তিনি খোঁড়া যুক্তি দাঁড় করান। এ ব্যাপারে আমরা মামলার প্রস্তুতি নিচ্ছি।
শাল্লা কাবিটা স্কীম প্রণয়ন, বাস্তবায়ন, মনিটরিং কমিটির সভাপতি ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পিয়াস চন্দ্র দাস বলেন, সময়মতো বিল না দেওয়ায় কাজে মন্থর গতি আছে। দুর্নীতির সিন্ডিকেটের ব্যাপারে আমি কিছু জানি না। কিছু অভিযোগ সরজমিনে তদন্ত করে ব্যবস্থা নিয়েছি।
এ সপ্তাহে টাকা ছাড় হলেই কাজের গতি বাড়বে জানিয়ে সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মামুন হাওলাদার বলেন, অনিয়ম-দুর্নীতির বিষয়ে ইউএনও-এসও ভালো জানেন। আমরা এসবে সংশ্লিষ্ট না। এ ধরনের কোন অভিযোগ আমার কাছে নাই।

সম্পাদকীয় :

  • সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি : মো. জিয়াউল হক
  • সম্পাদক ও প্রকাশক : বিজন সেন রায়
  • বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : মোক্তারপাড়া রোড, সুনামগঞ্জ-৩০০০।

অফিস :

  • ই-মেইল : [email protected]
  • ওয়েবসাইট : www.sunamkantha.com