৭ই মার্চের রাজনীতিকরণ

আপলোড সময় : ০৬-০৩-২০২৬ ১১:৩৮:০৫ অপরাহ্ন , আপডেট সময় : ০৬-০৩-২০২৬ ১১:৩৮:০৫ অপরাহ্ন
আমীন আল রশীদ:: বিরোধী দল জামায়াতের ইফতার মাহফিলে গিয়ে প্রশংসিত হয়েছেন বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এটাকে মূলত রাজনৈতিক সহনশীলতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধা হিসেবেই দেখা হচ্ছে। অর্থাৎ রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যে একটা সৌজন্যমূলক আন্তঃসম্পর্ক থাকা জরুরি, সেটি প্রধানমন্ত্রীর এই দাওয়াত কবুলের মধ্য দিয়ে স্পষ্ট হয়েছে বলে অনেকেই মনে করেন। কিন্তু বাংলাদেশের রাজনীতিতে আদর্শিক মতভিন্নতা এতটাই বিরোধে পর্যবসিত হয় যে, সেটি একসময়ে শত্রুতায় রূপ নেয়। অর্থাৎ রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ হয়ে ওঠে শত্রুপক্ষ - যা গত অর্ধ শতাব্দী ধরে দেশে একটি সুস্থ ও সহনশীল রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরিতে অন্তরায় সৃষ্টি করেছে। আর এ কারণেই ঐতিহাসিকভাবে মীমাংসিত বিষয়গুলো, বিশেষ করে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় অর্জন মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আরও অনেক বিষয় বিতর্কমুক্ত থাকেনি বা বিতর্কের ঊর্ধ্বে রাখা যায়নি। ৭ মার্চও তার ব্যতিক্রম নয়। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চকে বাদ দিয়ে বাঙালির ইতিহাস লেখা সম্ভব নয়। দেশের প্রধান দুটি দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে রাজনৈতিক মতপার্থক্য, মতবিরোধ এমনকি সংঘাতময় সম্পর্ক থাকার পরও ৭ মার্চ ইস্যুতে কোনও বিভেদ বা মতানৈক্য থাকার সুযোগ নেই। কারণ ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ বিএনপির জন্ম হয়নি। এই দলটির জন্ম পঁচাত্তরের পট পরিবর্তনের পরে। এই দলটির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান একজন খেতাবপ্রাপ্ত বীর মুক্তিযোদ্ধা। সুতরাং মুক্তিযুদ্ধ প্রশ্নে বিএনপির সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী দল আওয়ামী লীগের দর্শনগত কোনও পার্থক্য থাকার কথা ছিল না। কিন্তু দুঃখজনক বিষয় হলো, এই পার্থক্যটা ছিল এবং বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন আওয়ামী লীগ ও বিএনপির অবস্থান এতটাই মুখোমুখি হয়ে গিয়েছিল যে, এই দুটি দলের শীর্ষ নেতার মধ্যে সাধারণ ও স্বাভাবিক সৌজন্যমূলক কথাবার্তা ও দেখাসাক্ষাৎও একপর্যায়ে বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু ৫ আগস্টের অভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশেও কি রাজনৈতিক মতপার্থক্যের কারণে শত্রুতামূলক সম্পর্ক বজায় থাকবে? অন্তত জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ তথা মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোর ব্যাপারে কি একটি জাতীয় ঐকমত্য গড়ে তোলা সত্যিই অসম্ভব? ২০২১ সালের ৭ মার্চ ঐতিহাসিক এই দিনটি আনুষ্ঠানিকভাবে পালন করেছিল বিএনপি। যদিও এটি নিয়ে আওয়ামী লীগের ভেতরে মিশ্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়। মূলত বাংলাদেশে স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী পালনের অংশ হিসেবে প্রথমবারের মতো ঐতিহাসিক ৭ মার্চ পালন করেছিল বিএনপি। স্বাধীনতার ৫০ বছরপূর্তি উপলক্ষে মার্চ মাসজুড়ে যে ১৯ দিনের কর্মসূচি ঘোষণা করে বিএনপি - তারমধ্যে ৭ই মার্চকেও রাখা হয়। এদিন বিকালে জাতীয় প্রেস ক্লাবে এক আলোচনা সভায় বিএনপি নেতারা বলেন, “১৯৭১ সালের ৭ই মার্চের ভাষণ ঐতিহাসিক এবং জনগণকে উদ্দীপ্ত করেছিল। সেই সময়ের অবিসংবাদিত নেতা জনাব মরহুম শেখ মুজিবুর রহমানের ভাষণে মানুষকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার নির্দেশনা ছিল, আমরা তা অস্বীকার করি না। (বিবিসি বাংলা, ০৭ মার্চ ২০২১)।” যদিও বিএনপির এই কর্মসূচি পালনকে তৎকালীন তথ্যমন্ত্রী হাছান মাহমুদ স্বাগত জানালেও একে ‘ভ-ামি’ বলে আখ্যা দিয়েছিলেন আওয়ামী লীগের সাধারণ স¤পাদক ওবায়দুল কাদের। এর কারণ হিসেবে ওবায়দুল কাদের বলেন, “বিএনপির শাসনামলে শেখ মুজিবুর রহমানের এই ঐতিহাসিক ভাষণ প্রচার করা কার্যত নিষিদ্ধ ছিল। ওই ভাষণ প্রচারের দায়ে অনেককে নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছিল।” প্রসঙ্গত, ৭ মার্চ ঘিরে আলোচনার করলেও বিএনপির ওই অনুষ্ঠানে দলীয় নেতাদের বক্তব্যের বড় অংশজুড়েই ছিল তৎকালীন ক্ষমতাসীন সরকারের সমালোচনা। বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, “আওয়ামী লীগ অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে এই নতুন প্রজন্মকে সঠিক ইতিহাস থেকে বঞ্চিত করে একটি ভ্রান্ত ইতিহাস দিচ্ছে। তারা ধারণা দিচ্ছে যে, এই দেশে একটাই দল, একটাই ব্যক্তি - যারা এই দেশের সব এনে দিয়েছে। আমরা নতুন প্রজন্মকে সঠিক ইতিহাস জানাতে চাই। এই দেশ গঠনের পেছনে তাদের আত্মত্যাগ ও সংগ্রাম ছিল।” ২০২৩ সালেও ৭ মার্চ উপলক্ষে বিএনপির কমূর্সচি ছিল। এদিন রাজধানীর নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এ দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা হয়। সেখানে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান প্রার্থনা করেন, যারা গুম-খুন করে নির্যাতন করছে, তাদের যেন সৃষ্টিকর্তা শাস্তির আওতায় আনেন। এ সময় বিএনপির এ নেতা দাবি করেন, দুর্নীতি আর প্রকাশ্যে লুটপাটের কারণে জনগণ বর্তমান সরকারের হাত থেকে মুক্তি চায়। এরপর ২০২৪ সালে এবং গত বছর ৭ মার্চ নিয়ে বিএনপির কোনও কর্মসূচি ছিল না। অন্তত এ সম্পর্কিত কোনও সংবাদ চোখে পড়েনি। প্রশ্ন হলো, এ বছর এই ঐতিহাসিক দিনে কি বিএনপির কোনও কর্মসূচি থাকবে? বিশেষ করে যখন তারা ক্ষমতায় এবং একটি বিরাট অভ্যুত্থানের পরে দেড় বছর একধরনের অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকার পরে অবশেষে একটি নির্বাচনের মধ্য দিয়ে দেশ গণতন্ত্র ও স্থিতিশীলতার দিকে যাত্রা শুরু করেছে বলে মনে করা হয়। বিএনপি এখন সরকারি দল। সুতরাং, তার দায়িত্ব অন্য দলগুলোর চেয়ে বেশি। তার সহনশীলনতা ও আন্তরিকতা অন্যদের জন্য অনুকরণীয় হতে হবে। অভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশে বিএনপির প্রধান প্রতিপক্ষ এখন আর আওয়ামী লীগ নয়, বরং জামায়াতে ইসলামী। তারা সংসদের বিরোধী দল। তাছাড়া জাতীয় নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাও হয়েছে এই দুটি দলের মধ্যে। দীর্ঘদিন ধরে বিএনপির প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগ এবার নির্বাচনের মাঠেই ছিল না। কিন্তু ১৯৭১, মুক্তিযুদ্ধ এবং এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য দিবসগুলোকে যদি রাজনৈতিক মত ও আদর্শের বাইরে রাখা যায়, তাহলে ৭ মার্চ নিয়েও বিএনপির কোনও ‘অ্যালার্জি’ থাকার কথা নয়। কিন্তু এ বছর তারা এই দিবসে কোনও কর্মসূচি রেখেছে কিনা, তা এখনও পরিষ্কার নয়। তবে সদ্য সমাপ্ত জাতীয় নির্বাচনে ভেতরে ভেতরে আওয়ামী লীগের ভোটাররা বিএনপিকে সমর্থন দিয়েছে বা আওয়ামী লীগের সঙ্গে বিএনপির একটা গোপন সমঝোতা হয়েছে বলে বিরোধীদের পক্ষ থেকে যেহেতু ইঙ্গিত করা হয় এবং আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে যেহেতু ট্রাইব্যুনালে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলা চলমান, যেহেতু বঙ্গবন্ধুকে আওয়ামী লীগ ‘নিজস্ব সম্পত্তি’ বলে মনে করে, ফলে এসব বিবেচনায় নিয়ে এ বছর বিএনপি ৭ মার্চ উপলক্ষে কোনও কর্মসূচি দেবে কিনা, তা নিশ্চিত নয়। বাস্তবতা হলো, রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে ঐতিহাসিকভাবে মীমাংসিত বিষয়গুলো নিয়েও ঐকমত্য গড়ে ওঠেনি। যেমন- বিএনপি জিয়াউর রহমানকে স্বাধীনতার ঘোষক প্রমাণ করতে গিয়ে ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ মধ্যরাতে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণাকে কৌশলে এড়িয়ে যায়। যদিও জিয়াউর রহমান নিজেকে কখনও স্বাধীনতার ঘোষক দাবি করেননি। আবার এটিও ঐতিহাসিকভাবে মীমাংসিত সত্য যে, কালুরঘাট বেতারকেন্দ্র থেকে জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণা (এককভাবে এবং পরে বঙ্গবন্ধুর পক্ষে) ওই সময়ে মুক্তিযোদ্ধাদের অনুপ্রেরণা ছিল। বিশেষ করে সেনাবাহিনীকে উজ্জীবিত করেছিল। বলা হয়, জিয়াউর রহমানের এই ঘোষণার মধ্য দিয়েই আনুষ্ঠানিকভাবে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়। অথচ আওয়ামী লীগ বছরের পর বছর ধরে জিয়াউর রহমানের এই অবদানকে অস্বীকার করেছে। তারা এমনকি জিয়াকে ‘পাকিস্তানের চর’ আখ্যাও দিয়েছে। জিয়া উদ্যানে থাকা জিয়াউর রহমানের কবর সরিয়ে ফেলার দাবিও জানিয়েছে জাতীয় সংসদে। অথচ এর কোনোটিরই প্রয়োজন ছিল না এবং এগুলো রাজনীতিতে ইতিবাচক কিছুই যুক্ত করেনি। বরং দেশের প্রধান দুটি রাজনৈতিক শক্তিকে শত্রুতে পরিণত করেছে - যার সুযোগ নিয়েছে তৃতীয় পক্ষ। এটা বিশ্বাস করার যথেষ্ট কারণ আছে যে, আওয়ামী লীগ যদি ২০০৯ সালের পর থেকে টানা ১৫ বছর বিএনপিকে নির্মূলের রাজনীতি না করে একটা সহনশীল ও গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক আবহ তৈরি করতে পারতো, তাহলে স্বাধীনতবিরোধী শক্তি ফুলেফেঁপে বলিয়ান হতো না। আওয়ামী লীগকেও অভ্যুত্থানের মুখে পালিয়ে যেতে হতো না। এখন সময় বদলেছে। একটা বিরাট অভ্যুত্থানের অভিজ্ঞতা হয়েছে সাধারণ মানুষের। রাজনৈতিক দলগুলোর তো বটেই। অভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশে ধর্মীয় উগ্রবাদ ও কট্টরপন্থা যেভাবে মাথাচাড়া দিয়েছিল, তাতে অনেকে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়েই শঙ্কিত হয়ে পড়েছিলেন। কিন্তু নির্বাচনের পরে নতুন সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের মধ্য দিয়ে সেই শঙ্কা আপাতত দূর হলো বলে ধরে নেওয়া যায়। তবে অভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশ যদি অতীতের প্রতিহিংসামূলক রাজনীতি তথা রাজনৈতিক মতভিন্নতার নামে শত্রুতার চর্চা অব্যাহত থাকে, তাহলে ভেতরে ভেতরে আরেকটি অভ্যুত্থানের পটভূমি রচিত হবে, তাতে কোনও সন্দেহ নেই। অতএব, রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তন আনতে হবে। ঐতিহাসিকভাবে মীমাংসিত সত্যগুলো অস্বীকার করার মধ্য দিয়ে নিজেদের ছোট না করে বরং বাঙালির সবচেয়ে বড় অর্জন মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য বিষয়ে রাজনৈতিক ঐক্য স্থাপনের কোনও বিকল্প নেই। ৭ মার্চ, ২৫ ও ২৬ মার্চ, ১৬ ডিসেম্বরসহ জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রতিটি বিষয়ে একটি অভিন্ন অবস্থান রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে থাকা বাঞ্ছনীয়। মুক্তিযুদ্ধের একটি অভিন্ন ইতিহাস থাকা জরুরি। মুক্তিযুদ্ধের কোনও বিতর্কিত বয়ান যেমন কাম্য নয়, তেমনই মুক্তিযুদ্ধ যে শুধু একটি দলের সম্পত্তি নয়, সেটিও বুঝতে হবে। এই বোঝাপড়ায় ঘাটতি থাকলে দেশ এগোবে না। বরং পদ্মা সেতু ও মেট্রোরেলের মতো অবকাঠামো গড়ে উঠবে, মানুষের মাথাপিছু আয় বাড়বে - কিন্তু ভেতরে ভেতরে রাজনীতি যেই তিমিরে ছিল, সেখানেই থাকবে। [সংকলিত] লেখক: সাংবাদিক ও লেখক

সম্পাদকীয় :

  • সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি : মো. জিয়াউল হক
  • সম্পাদক ও প্রকাশক : বিজন সেন রায়
  • বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : মোক্তারপাড়া রোড, সুনামগঞ্জ-৩০০০।

অফিস :

  • ই-মেইল : [email protected]
  • ওয়েবসাইট : www.sunamkantha.com