হাওর অধ্যুষিত সুনামগঞ্জের দীর্ঘদিনের যোগাযোগ বঞ্চনা দূর করার স্বপ্ন নিয়ে এগোচ্ছে দিরাই-শাল্লা আঞ্চলিক মহাসড়ক প্রকল্প। এটি বৃহত্তর মদনপুর-দিরাই-শাল্লা-জলসুখা-আজমিরিগঞ্জ আঞ্চলিক মহাসড়ক প্রকল্পের অংশ - যা বাস্তবায়িত হলে দিরাই, শাল্লা ও হবিগঞ্জ হয়ে রাজধানী ঢাকার সঙ্গে সরাসরি সড়ক যোগাযোগে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে। কৃষি, মৎস্য, পর্যটন ও ক্ষুদ্র শিল্পের বিকাশ - সব মিলিয়ে এই সড়ক কেবল ইট-বালুর নির্মাণ নয়; এটি একটি পশ্চাৎপদ অঞ্চলের সম্ভাবনার মহাসড়ক। তবে আশার আলোয় যেমন সম্ভাবনা আছে, তেমনি আছে উদ্বেগের ছায়াও। প্রকল্পে ধীরগতি, নকশা পরিবর্তনের অভিযোগ, ভূমি অধিগ্রহণ সংক্রান্ত জটিলতা এবং নির্মাণসামগ্রীর মান নিয়ে প্রশ্ন - এসব বিষয় স্থানীয়দের মধ্যে আস্থার ঘাটতি তৈরি করেছে। হাওরাঞ্চলে কাজের মৌসুমি সীমাবদ্ধতা, বর্ষাকালে দীর্ঘ জলাবদ্ধতা এবং নির্মাণসামগ্রী পরিবহনের দুর্ভোগ, এসব বাস্তবতা অস্বীকার করা যায় না। কিন্তু বাস্তবতার আড়ালে যদি অনিয়ম বা শৈথিল্য ঢুকে পড়ে, তবে তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
ভূমি অধিগ্রহণের বিষয়টি বিশেষভাবে স্পর্শকাতর। অভিযোগ আছে, রেকর্ডীয় জায়গা ছেড়ে দিলেও ক্ষতিপূরণ অনিশ্চিত, এমনকি কারও কারও ক্ষেত্রে যথাযথ প্রক্রিয়া স¤পন্ন না করেই কাজ শুরু হয়েছে। উন্নয়নের নামে স্থানীয় মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হলে সেই উন্নয়ন টেকসই হয় না। ন্যায়সংগত ক্ষতিপূরণ ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
নির্মাণসামগ্রীর মান নিয়েও যে প্রশ্ন উঠেছে, তা গুরুত্বসহকারে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। নি¤œমানের ইটের খোয়া, বালু বা পাথর ব্যবহার হলে অদূর ভবিষ্যতে সড়কটি ক্ষতিগ্রস্ত হবে, ফলে জনগণের অর্থ অপচয় এবং ভোগান্তি দুটোই বাড়বে। সড়ক ও জনপথ বিভাগকে (সওজ) নিয়মিত তদারকি জোরদার করতে হবে; প্রয়োজনে স্বাধীন কারিগরি অডিটের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
এই প্রকল্পের ব্যয় কয়েকশ’ কোটি টাকা; সময়সীমাও ইতোমধ্যে একাধিকবার বাড়ানো হয়েছে। বারবার সময় বৃদ্ধি উন্নয়ন ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলার প্রশ্ন তোলে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে মানস¤পন্ন কাজ শেষ করতে হলে প্রকল্প ব্যবস্থাপনায় জবাবদিহি ও সমন্বয় বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে স্থানীয় জনগণকে স¤পৃক্ত করে সামাজিক নজরদারির সুযোগ তৈরি করা জরুরি।
দিরাই-শাল্লা সড়ক শুধু দূরত্ব কমাবে না; এটি একটি অঞ্চলের মানসিক দূরত্বও কমাবে, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বাজারব্যবস্থা ও কর্মসংস্থানের পথ খুলে দেবে। হাওরের মানুষ বছরের পর বছর “বর্ষায় নাও, হেমন্তে পাও” বাস্তবতায় জীবন কাটিয়েছে। এখন তারা স্থায়ী সড়ক যোগাযোগের স্বপ্ন দেখছে। সেই স্বপ্ন যেন অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা বা গাফিলতিতে ভেঙে না যায় - এ দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট সবার।
অতএব, উন্নয়নের এই মহাসড়ককে কেবল দৃশ্যমান অবকাঠামো নয়, সুশাসনের প্রতীক হিসেবেও গড়ে তুলতে হবে। স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও গুণগত মান নিশ্চিত করে দ্রুত কাজ শেষ করা গেলে দিরাই-শাল্লা সড়ক সত্যিই হয়ে উঠবে সম্ভাবনার হাতছানি থেকে বাস্তব অগ্রযাত্রার পথ।