রাষ্ট্রের অগ্রযাত্রায় জ্ঞানী, সৃজনশীল ও কৃতী মানুষের অবদান চিরকালই অপরিসীম। একটি সমাজের নৈতিক ভিত্তি, সাংস্কৃতিক শক্তি এবং মানবিক
মূল্যবোধের গভীরতা নির্ভর করে সেই সমাজ কতটা তার গুণীজনদের সম্মান দিতে পারে এবং তাদের দিকনির্দেশনা অনুসরণ করতে পারে তার ওপর। রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তন-এ অনুষ্ঠিত ‘একুশে পদক ২০২৬’ প্রদান অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যে বক্তব্য দিয়েছেন, তা এই চিরন্তন সত্যকেই পুনরায় স্মরণ করিয়ে দিয়েছে।
তিনি যথার্থই বলেছেন, রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব রাজনীতিবিদদের হাতে থাকলেও প্রকৃত দিকনির্দেশক হচ্ছেন জ্ঞানী ও গুণীজনরা। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, ভাষা আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীনতা-উত্তর রাষ্ট্র নির্মাণ - প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ে দেশের বুদ্ধিজীবী, শিল্পী, সাহিত্যিক, গবেষক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বদের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাদের চিন্তা, সৃজনশীলতা ও ত্যাগ জাতিকে আলোকিত পথ দেখিয়েছে।
একুশে পদক সেই গুণীজনদের অবদানের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি। ১৯৭৬ সালে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এই পদক প্রবর্তনের মাধ্যমে একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন। এই পদক কেবল সম্মান নয়, এটি একটি মূল্যবোধের প্রতীক। এটি নতুন প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করে, সমাজকে সৃজনশীলতার পথে এগিয়ে যেতে উৎসাহিত করে এবং রাষ্ট্রকে তার মেধাবীদের মর্যাদা দেওয়ার দায়িত্ব স্মরণ করিয়ে দেয়।
এবারের পদকপ্রাপ্তদের তালিকায় বিভিন্ন ক্ষেত্রে অসামান্য অবদান রাখা ব্যক্তিত্বদের অন্তর্ভুক্তি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। অভিনয়ে ফরিদা আক্তার ববিতা, সংগীতে মরণোত্তর সম্মাননায় আইয়ুব বাচ্চু, স্থাপত্যে মেরিনা তাবাসসুম এবং সাংবাদিকতায় শফিক রেহমান-এর মতো গুণীজনদের স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে জনপ্রিয় ব্যান্ড ওয়ারফেজ-এর সম্মাননা প্রমাণ করে যে রাষ্ট্র সংস্কৃতির প্রতিটি ধারাকেই গুরুত্ব দিচ্ছে।
তবে শুধু পদক প্রদানই যথেষ্ট নয়। গুণীজনদের চিন্তা, গবেষণা ও অভিজ্ঞতাকে রাষ্ট্রীয় নীতি নির্ধারণে কার্যকরভাবে অন্তর্ভুক্ত করাও জরুরি। একটি সত্যিকারের আলোকিত সমাজ গড়ে তুলতে হলে শিক্ষা, সংস্কৃতি, গবেষণা ও মানবিক মূল্যবোধকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। একই সঙ্গে গুণীজনদের জন্য সম্মানজনক পরিবেশ নিশ্চিত করা এবং নতুন প্রতিভা বিকাশের সুযোগ সৃষ্টি করাও রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
একুশ আমাদের চেতনার উৎস, আত্মপরিচয়ের ভিত্তি এবং ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনের প্রেরণা। এই চেতনা ধারণ করে যদি রাষ্ট্র গুণীজনদের সম্মানিত করে এবং তাদের দিকনির্দেশনা অনুসরণ করে, তবে একটি নৈতিক, মানবিক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গঠন করা সম্ভব।
রাষ্ট্রের উন্নয়ন শুধু অবকাঠামো নির্মাণে নয়, মানুষের মনন ও মূল্যবোধের বিকাশেও নিহিত। আর সেই বিকাশের পথ দেখান গুণীজনরাই। তাই তাদের সম্মান দেওয়া মানে কেবল ব্যক্তি নয়, জাতির ভবিষ্যৎকেই সম্মান জানানো।