মোহাম্মদ আব্দুল হক::
বিচ্ছিন্ন কিছু সহিংসতার ঘটনা বাদ দিলে বলা যায় ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ এ বাংলাদেশের ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে যথেষ্ট নির্বিঘেœ হয়ে গেল ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। সারা দেশের জনগণের বহু দিনের আকাক্সক্ষা একটা ভোট হোক যেখানে মানুষ যেন নিজে ভোটকেন্দ্রে গিয়ে নিজের বুদ্ধি বিবেচনা খাটিয়ে ভোট দিতে পারে। বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন বিষয়ের আলোচনাটি এখন সময়ের দাবি। কেমন হলো এবারের নির্বাচন? বাংলাদেশে এর আগে কতোগুলো নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে? কেমন ফলাফল এসেছিলো? যেহেতু রাজনৈতিক বিষয় তাহলে আগের এবং সদ্য হয়ে যাওয়া সংসদ নির্বাচনে দেশের কোন রাজনৈতিক দল কোন সময় কেমন সাড়া পেয়েছে জনগণের কাছে, এ বিষয়ে আলোচনা দরকার। কারণ, এ থেকে আমাদের ভবিষ্যত দেশ পরিস্থিতির ভিত্তি ও গতি খুঁজে পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে। তবে এ আলোচনা বিস্তারিত নয়, বিষয় বিবেচনায় এটি নতুন প্রজন্মের কাছে ও দেশের জনগণের কাছে বাংলাদেশের সাধারণ নির্বাচন বিষয়ক একটা ছোট্ট ডায়েরি। চলুন সবকটি সাধারণ নির্বাচন একটু একটু করে ঘুরে আসি।
শুরু করা যায় এভাবে- ১৯৭০ খ্রীষ্টিয় সালের সাধারণ নির্বাচনে এ অঞ্চলের মানুষের বিপুল জনসমর্থন নিয়ে আওয়ামী লীগ বিজয়ী হলেও তৎকালীন পাকিস্তান সরকার মিলিটারি শাসক আওয়ামী লীগের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে টালবাহানা করে এবং পরবর্তী রাজনৈতিক পরিস্থিতি আমাদেরকে স্বাধীনতা সংগ্রামের দিকে মনোযোগ দিতে বাধ্য করে। ২৬ মার্চ থেকে শুরু হওয়া স্বাধীনতা যুদ্ধ দীর্ঘ প্রায় ৯ মাস চলে এবং ১৬ ডিসেম্বর বিজয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভ করে। তখন সত্তরের সাধারণ নির্বাচনের রায়ের ভিত্তিতে দেশে সরকার গঠন করে এবং এভাবেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে দেশ চলে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন বাংলাদেশের মানুষের কাছে অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে ব্যতিক্রম ও গুরুত্বপূর্ণ। স্বাধীন বাংলাদেশে এবার স্বাধীনতা সংগ্রামের নেতৃত্ব দানকারী দল আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক কর্মকা- নিষিদ্ধ হওয়ার কারণে নির্বাচনে অংশ নিতে পারেনি। এবার প্রায় এক চতুর্থাংশ ভোটার যারা বয়সে তরুণ-তরুণী তাদের জীবনের প্রথমবারের মতো ভোটটি দিয়ে দেশ পরিচালনায় তাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে পেরেছে। বাংলাদেশের ইতিহাসে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন স্মরণীয়, কারণ, এদেশে অতীতে গণভোট হলেও এবার প্রথম একই দিনে একই সাথে দুটি আলাদা ব্যালট পেপারে একটিতে পছন্দের সংসদ সদস্য প্রার্থীকে ভোট প্রদান এবং অন্য আরেকটি ব্যালট পেপারে গণভোট ‘হ্যাঁ’ কিংবা ‘না’ এর পক্ষে ভোট প্রদান হয়েছে। ভোট কেমন হয়েছে তা দেশের মানুষ প্রত্যেকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে সরাসরি দেখেছেন আবার বিভিন্ন গণমাধ্যমে সারাদেশের খবর রেখেছেন। শেষ পর্যন্ত চূড়ান্ত ফলাফল ঘোষণা হয়েছে নির্বাচন কমিশন থেকে। শতভাগ শুদ্ধ হয়েছে এমন নিশ্চয়তা দেয়া কঠিন হলেও গণতন্ত্রের বিধান এটাই নির্বাচন কমিশন ঘোষিত আনুষ্ঠানিক ফলাফল অনুযায়ী সরকারি দল ও বিরোধী দলের সমন্বয়ে পরবর্তী নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত দেশ চলবে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায়। এখন সংক্ষেপে জাতীয় সংসদ নির্বাচনী কথকতা।
১৯৭১ সালে দেশ স্বাধীন হওয়ার পরে বাংলাদেশে প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৭৩ সালের ৭ মার্চ। তখন ৩০০ আসনের মধ্যে ২৯৩টি আসনে আওয়ামী লীগ জয়ী হয়। ওই সংসদের মেয়াদ ছিলো ২ বছর ৬মাস। এখানে অনেক ঘটনা ঘটে গেছে এবং রাজনৈতিক পট পরিবর্তন হয়েছিলো। খুবই সংক্ষিপ্ত আলোচনায় থাকবো।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্মম হত্যা পরবর্তী সময়ে নানান ঘটনা পেরিয়ে দেশে দ্বিতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচন হয় ১৯৭৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি। এতে বিএনপি ২০৭টি আসন পেয়ে জয়ী হয়। ওই সংসদের মেয়াদ ছিলো তিন বছর। এখানেও রাজনৈতিক পরিস্থিতি ভিন্ন রকম আচরণ করে, স্বাভাবিক গতি হোঁচট খেয়ে আবারও রাজনৈতিক পট পরিবর্তন হয়। রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হত্যা পরবর্তী সময়ের অনেক ঘটনা শেষে তৃতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচন হয় ১৯৮৬ খ্রীষ্টিয় সালের ৭মে। ওই নির্বাচনে জাতীয় পার্টি ১৫৩টি আসনে জয় লাভ করে সরকার গঠন করে। ওই সংসদের মেয়াদ ছিল দুই বছরের কম মাত্র সতেরো মাস। চতুর্থ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৮৮ সালের ৩ মার্চ। আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি এবং আরও কয়েকটি বড়ো দল নির্বাচন বর্জন করে। এ সংসদও পূর্ণ মেয়াদ টিকেনি। এটির মেয়াদ ছিল দুই বছর সাত মাস।
দেশে তুমুল গণআন্দোলন গড়ে উঠে। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে তৎকালীন সরকার প্রধান হোসাইন মোহাম্মদ এরশাদ ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হন। এবারের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন শেষে দেশে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি। ওই নির্বাচনে ১৪০টি আসন পেয়ে জয়ী হয় বিএনপি। ওই সংসদের মেয়াদ ছিলো এ পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি সময় যা চার বছর আট মাস। এরপর ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি দলীয় সরকারের অধীনে হওয়া ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এ নির্বাচন আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি, জামায়াতে ইসলামীসহ প্রায় সকলেই বর্জন করে। ওই বর্জনের মধ্যে বিএনপি ২৭৮টি আসনে জয়লাভ করে। ফ্রিডম পার্টি ১টি আসন পায়। স্বতন্ত্র প্রার্থী ১০টি আসনে জয়লাভ করে। ওই নির্বাচনে ভোট পড়েছিলো মাত্র ২৬.৫৪ শতাংশ। অল্প সময়ের ক্ষোভ ও বিক্ষোভ এবং প্রতিবাদের মুখে ওই সংসদের মেয়াদ ছিল মাত্র ১১ দিন যা বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে কম সময়ের সংসদ এবং দেশে এটিই সবচেয়ে কম সময়ের আন্দোলনে কোনো সরকার পতন।
এরপর জাতীয় সংসদ নির্বাচন প্রক্রিয়া নিয়ে সকল রাজনৈতিক দলের মধ্যে কথা চলে এবং সিদ্ধান্ত হয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে হবে জাতীয় সংসদ নির্বাচন। শেষ পর্যন্ত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৯৬ সালের ১২ জুন। এটি ছিলো দেশের ইতিহাসে প্রথম তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন। তখন মোট ৮১টি রাজনৈতিক দল ওই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে। নির্বাচনে ভোট পড়েছিল ৭৪.৯৭ শতাংশ এবং আওয়ামী লীগ ১৪৬ আসনে জয়লাভ করে, বিএনপি পায় ১১৬ আসন, জাতীয় পার্টি ৩২টি, জামায়াতে ইসলামী পায় ৩টি আসন। দেশের সপ্তম সংসদ প্রথম বারের মতো পাঁচ বছরের মেয়াদ পূর্ণ করে। এরপর ২০০১ সালে দেশে অনুষ্ঠিত হয় অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচন যাতে অংশ গ্রহণ করে ৫৪টি রাজনৈতিক দল। এতে বিএনপি ১৯৩টি আসনে জয়লাভ করে সরকার গঠন করে। নির্বাচনে ভোট পড়েছিল ৭৫.৫৯ শতাংশ এবং ওই সংসদের মেয়াদ পাঁচ বছর ছিল। আবারও রাজনৈতিক উত্তেজনা ও ভিন্ন পরিস্থিতি কাটিয়ে দেশের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরে। তখন থেকে রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন পদ্ধতি চালু করা হয়। রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন পদ্ধতি চালু করার পরে এটি ছিল প্রথম নির্বাচন। ওই নির্বাচনে মোট নিবন্ধিত ৩৮টি রাজনৈতিক দল অংশ নেয়। আর এটাই ছিল তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে এ পর্যন্ত শেষ নির্বাচন। এ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ২৩০টি আসন পেয়ে জয়লাভ করে। তখন বিএনপি ৩০টি, জাতীয় পার্টি ২৭টি, জাসদ ৩টি, এলডিপি ১টি, জামায়াতে ইসলামী ২টি আসন পায়। নির্বাচনে ভোট পড়েছিল ৮৭.১৩ শতাংশ যা সর্বোচ্চ।
বাংলাদেশের দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় একটু পরে, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি। এ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে মোট ১২টি রাজনৈতিক দল। বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট ওই নির্বাচন বর্জন করে। ভোট পড়েছিল ৪৯.০৪ শতাংশ এবং আওয়ামী লীগ ২৩৪টি আসন পায়, জাতীয় পার্টি পায় ৩৪টি, ওয়ার্কার্স পার্টি ৬টি, জাসদ (ইনু) ৫টি আসন, তরিকত ফেডারেশন ২টি আসন পায়।
এরপর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বরে। রাজনৈতিক বিতর্ক বাংলাদেশের সাধারণ নির্বাচনকে ছাড়ে না। এ অবস্থায় ওই নির্বাচনে ভালো কিছু হবে এমন আশা নিয়ে মোট ৩৯টি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল অংশগ্রহণ করে। এখানে বিতর্ক ঘিরে থাকা ওই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ এককভাবে পায় ২৫৮টি আসন, জাতীয় পার্টি ২২টি আসন পায়, মহাজোট হয়েছিল যারা ৮টি আসন পায়। স্বতন্ত্র প্রার্থীও আসন পায়। দেশ চলেছে রাজনৈতিক অস্থিরতা নিয়ে।
ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টে আসে নতুন আরেক সংসদ নির্বাচন, দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারি। ১টি আসনে নির্বাচন হয়নি। ২৯৯টি সংসদীয় আসনের মধ্যে মোট ২২৩টি আসন পায় আওয়ামী লীগ। বিতর্ক পিছু ছাড়েনি। প্রথমে শিক্ষার্থীদের কোটা বাতিল আন্দোলন থেকে ভিন্ন ভিন্ন বিষয় নিয়ে আন্দোলন একসময় সরকারবিরোধী আন্দোলনের চেহারা পায়। খুব দ্রুত পরিস্থিতি পাল্টে যায়। মাত্র ছয় মাসের মাথায় ছাত্রজনতার সম্মিলিত গণআন্দোলনের মুখে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে চলে যান ৫ আগস্ট ২০২৪ এবং ভারতে আশ্রয় নেন।
পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে শান্তিতে নোবেলজয়ী প্রফেসর ডক্টর মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট বাংলাদেশে গঠিত হয় অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। যথেষ্ট সময় নিয়ে ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত হয় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এখানে এপর্যন্ত প্রকাশিত গেজেট অনুযায়ী বিএনপি জোট ২১২ আসনে জয়লাভ করে এবং জামাতে - এনসিপি জোট পায় ৭৭ আসন।
জনতার রায় মেনে নিতেই হয়- অভিনন্দন। জানা আছে, বাংলাদেশে দীর্ঘ অনেক বছর ধরে চলেছে মহিলা প্রধানমন্ত্রী নেতৃত্বাধীন সরকার। এবার পুরুষ প্রধান সরকার গঠন হলো। এ বিষয়টিও মানুষের আলোচনায় আছে।
অনেক কাজ আছে, আছে সংস্কার বিষয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ। শেষে বলবো, যাঁরা বাংলাদেশ পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছেন তাঁদের সামনে যেমন থাকবে ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, একাত্তরের স্বাধীনতা সংগ্রাম তেমনি থাকবে নব্বইয়ের গণআন্দোলন এবং ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট।
এখানে জনগণ তার অধিকার আদায়ের জন্য সংগ্রাম করে এবং চরম নৈরাজ্য করলে পরিণতি ভালো হয় না। রাজনৈতিক বক্তব্যে আমাদের দেশটা সিঙ্গাপুর বা আমেরিকা বা ইউরোপ বানানোর চিন্তা না - করে সবাই মিলে এমন একটা বাংলাদেশ গড়ে তোলার চেষ্টা অব্যাহত থাকুক, যে দেশে জন্মের পরপর শিশুরা পুষ্টিকর খাবার খেয়ে শারীরিক সৌন্দর্য নিয়ে বেড়ে উঠার পাশাপাশি জ্ঞানে সমৃদ্ধ হয়ে বিশ্বের উন্নত দেশের সাথে আমাদের তরুণ-তরুণী সব ধরনের প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকতে পারে আর বয়োজ্যেষ্ঠ যারা তারা যেনো একটা সুন্দর ও সমৃদ্ধ দেশে সুচিকিৎসা ও সেবা পেয়ে শান্তিতে বসবাস করে জীবন কাটাতে পারেন। আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সমুন্নত রেখে দেশ এগিয়ে যাক উৎকৃষ্ট উন্নয়নের ও প্রগতির ধারাবাহিকতায়।
[লেখক : কলামিস্ট ও কথাসাহিত্যিক]