হাসান হামিদ::
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফল আমাদের আবারও স্মরণ করিয়ে দিল বাংলাদেশের রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ এখনো কাক্সিক্ষত উচ্চতায় পৌঁছায়নি। সরাসরি নির্বাচনে মাত্র সাতজন নারী জয়ী হয়েছেন; সংরক্ষিত আসন মিলিয়ে মোট নারী প্রতিনিধিত্ব দাঁড়াবে ১৬ শতাংশে। অথচ প্রার্থী মনোনয়নের ক্ষেত্রে নারীদের সংখ্যা ছিল আরও কম; মনোনয়ন পেয়েছেন পুরুষের তুলনায় বহু গুণ কম নারী। এই বাস্তবতায় সুনামগঞ্জ-১ আসনের হাওরাঞ্চলের প্রেক্ষাপটে সালমা নজিরকে সংরক্ষিত মহিলা আসনে মনোনীত করার দাবি উঠেছে। এই দাবি কেবল আবেগের নয়, এটি প্রতিনিধিত্বের ন্যায্যতার প্রশ্ন, উন্নয়নের ধারাবাহিকতার প্রশ্ন এবং একটি অসমাপ্ত স্বপ্ন পূরণের প্রশ্ন। সুনামগঞ্জের হাওরভূমি বাংলাদেশের এক অনন্য ভূপ্রকৃতি। বর্ষায় যেখানে দিগন্তজোড়া জলরাশি, শুষ্ক মৌসুমে সেখানে বিস্তীর্ণ ফসলের মাঠ। এই অঞ্চল একই সঙ্গে সম্ভাবনার এবং ঝুঁকির। আগাম বন্যা, ফসলহানি, নৌ-যোগাযোগের সীমাবদ্ধতা, স্বাস্থ্যসেবার ঘাটতি, উচ্চশিক্ষার সুযোগের অভাব এই সবকিছু মিলিয়ে হাওরবাসীর জীবন সংগ্রামমুখর। এই সংগ্রামের ভেতর থেকেই উঠে এসেছিলেন নজির হোসেন; যিনি একাধিকবার সংসদ সদস্য হিসেবে সুনামগঞ্জের মানুষের প্রতিনিধিত্ব করেছেন এবং হাওর উন্নয়নের প্রশ্নকে জাতীয় পরিসরে তুলে ধরেছেন। আমাদের জানা আছে, নজির হোসেনের রাজনৈতিক জীবন ছিল বহুমাত্রিক। নব্বইয়ের গণআন্দোলন থেকে শুরু করে হাওরের পানিবন্দি মানুষের অধিকারের প্রশ্নে তাঁর সক্রিয়তা তাঁকে আলাদা পরিচিতি দিয়েছে। তিনি পঞ্চম সংসদে নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য এবং অষ্টম সংসদে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর রাজনৈতিক পথচলায় সুনামগঞ্জ-১ আসনের উন্নয়ন প্রশ্নে তাঁর অবস্থান ছিল সুস্পষ্ট। বাঁধে বাঁধে পথসভা, অকাল বন্যা প্রতিরোধের দাবি, নদী খনন, মৎস্যসম্পদ রক্ষা, কৃষিতে প্রণোদনা এই বিষয়গুলো তিনি ধারাবাহিকভাবে সামনে এনেছেন। আজ যখন আমরা নারী প্রতিনিধিত্বের সংকট নিয়ে কথা বলি, তখন সালমা নজিরের নাম সামনে আসে স্বাভাবিকভাবেই। তিনি কেবল একজন রাজনীতিকের সহধর্মিণী নন; তিনি নিজে শিক্ষিত, সৎ এবং মাঠপর্যায়ে সক্রিয়। সাম্প্রতিক সময়ে ‘গ্রাম থেকে হাটে’ কর্মসূচির মাধ্যমে তিনি যে গণসংযোগ শুরু করেছেন, তা প্রমাণ করে তিনি সংগঠক হিসেবেও সক্ষম। হাওরাঞ্চলের পাঁচটি প্রধান সমস্যা যথা শিক্ষা, যোগাযোগ, কৃষি, মৎস্য ও স্বাস্থ্য এগুলো নিয়ে যে বিশেষ বুকলেট প্রচার করা হয়েছে, সেখানে স্থানীয় বাস্তবতার ভিত্তিতে সমাধানের রূপরেখা তুলে ধরা হয়েছে। প্রত্যেক গ্রামে প্রাথমিক বিদ্যালয়, তিনটি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে একটি উচ্চবিদ্যালয়, প্রতি ইউনিয়নে কলেজ ও কারিগরি প্রতিষ্ঠান, হাওর বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন; এসব কেবল নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি নয়; এগুলো একটি অঞ্চলকে দীর্ঘমেয়াদে এগিয়ে নেওয়ার কৌশল। যোগাযোগ ব্যবস্থায় উড়াল সড়ক, সাবমারসিবল রাস্তা, বর্ষায় নিরাপদ নৌযান এবং শিক্ষার্থী-রোগীর জন্য সরকারি নৌপরিবহন চালুর প্রস্তাব হাওরবাসীর দৈনন্দিন দুর্ভোগের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। কৃষিতে বর্ষাকালীন ধানচাষে প্রণোদনা এবং বারোমাসি চাষের পরিকল্পনা খাদ্যনিরাপত্তা জোরদার করবে। মৎস্যখাতে নীতিমালা যুগোপযোগী সংশোধন এবং প্রজনন মৌসুমে আহরণ নিষিদ্ধকরণ পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় সহায়ক হবে। স্বাস্থ্যখাতে ইউনিয়নভিত্তিক ২০ শয্যার হাসপাতাল এবং কমিউনিটি স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের প্রতিশ্রুতি গ্রামীণ স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে পারে। এই প্রস্তাবগুলোর পেছনে রয়েছে নজির হোসেনের দীর্ঘ গবেষণাধর্মী চিন্তাভাবনার উত্তরাধিকার। তিনি হাওর উন্নয়নকে দেখেছিলেন সমন্বিত কাঠামোয় বন্যা নিয়ন্ত্রণ, কৃষি উৎপাদন, মৎস্যসম্পদ সংরক্ষণ, পরিবেশ রক্ষা, শিল্পায়ন ও পর্যটনের সম্ভাবনাকে একসঙ্গে বিবেচনা করে। তাঁর অসমাপ্ত স্বপ্নগুলো পূরণ করতে হলে এমন একজন প্রতিনিধি প্রয়োজন, যিনি একই সঙ্গে এই উত্তরাধিকারকে ধারণ করবেন এবং নতুন প্রজন্মের প্রত্যাশাকেও প্রতিফলিত করবেন। সালমা নজির সেই সেতুবন্ধ হতে পারেন। সংরক্ষিত মহিলা আসনের ধারণা নিয়ে নানা বিতর্ক আছে। কেউ বলেন, এটি নারীর ক্ষমতায়নের কার্যকর পথ; কেউ বলেন, এটি প্রতিযোগিতামূলক রাজনীতিতে নারীদের সরাসরি অংশগ্রহণ কমিয়ে দেয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো, যখন মনোনয়নের ক্ষেত্রেই নারীরা বঞ্চিত হন এবং সামাজিক-রাজনৈতিক কাঠামো নারীবিদ্বেষী প্রচারণায় প্রভাবিত হয়, তখন সংরক্ষিত আসন নারীদের জন্য একটি প্রয়োজনীয় প্ল্যাটফর্ম তৈরি করে। সুনামগঞ্জ-১ আসনের মতো ভৌগোলিকভাবে চ্যালেঞ্জপূর্ণ এলাকায় একজন নারীর প্রতিনিধিত্ব স্থানীয় নারীদের অংশগ্রহণ ও নেতৃত্বে অনুপ্রেরণা যোগাতে পারে। হাওরাঞ্চলে নারীরা কৃষিকাজ, মাছ প্রক্রিয়াজাতকরণ, গৃহভিত্তিক উৎপাদন ও পরিবার পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। কিন্তু নীতিনির্ধারণী স্তরে তাঁদের কণ্ঠস্বর খুব কমই শোনা যায়। সালমা নজির যদি সংরক্ষিত মহিলা আসনে সংসদ সদস্য হন, তবে তিনি এই নীরব শক্তিকে দৃশ্যমান করতে পারেন। স্থানীয় নারীদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন নিয়ে বিশেষ কর্মসূচি গ্রহণের সুযোগ তৈরি হবে। একই সঙ্গে তিনি হাওরের উন্নয়ন ইস্যুকে জাতীয় আলোচনায় ধারাবাহিকভাবে তুলতে পারবেন। রাজনীতিতে ধারাবাহিকতা গুরুত্বপূর্ণ। নজির হোসেনের রাজনৈতিক জীবন দেখিয়েছে, ব্যক্তিগত সুবিধার চেয়ে জনস্বার্থকে অগ্রাধিকার দিলে একটি অঞ্চল দীর্ঘমেয়াদে লাভবান হয়। তাঁর সময়কালে যে উন্নয়ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, সেগুলোর অনেকই পরবর্তী সময়ে থেমে গেছে বা গতি হারিয়েছে। উন্নয়ন প্রকল্পের ধারাবাহিকতা রক্ষা এবং নতুন পরিকল্পনা বাস্তবায়নে একজন অভিজ্ঞ ও স্থানীয়ভাবে গ্রহণযোগ্য প্রতিনিধি অপরিহার্য। সালমা নজির সেই ধারাবাহিকতার প্রতীক হতে পারেন। এখানে আবেগের একটি দিক অবশ্যই আছে; স্বামীর অসমাপ্ত স্বপ্ন পূরণের আকাক্সক্ষা। কিন্তু বিষয়টি কেবল পারিবারিক উত্তরাধিকারের নয়; এটি রাজনৈতিক ও সামাজিক দায়বদ্ধতার। যদি তিনি নিজ যোগ্যতায়, সাংগঠনিক দক্ষতায় এবং জনস¤পৃক্ততার মাধ্যমে নিজেকে প্রমাণ করতে পারেন, তবে সংরক্ষিত আসনে তাঁকে মনোনীত করা হবে হাওরবাসীর প্রতি একটি দায়িত্বশীল সিদ্ধান্ত। হাওর কেবল একটি ভৌগোলিক অঞ্চল নয়; এটি একটি জীবনধারা, একটি সংগ্রামের প্রতীক। এই সংগ্রামকে নীতিনির্ধারণের কেন্দ্রে নিয়ে যেতে হলে প্রয়োজন এমন কণ্ঠস্বর, যা একই সঙ্গে অভিজ্ঞ, প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক। সালমা নজিরকে সংরক্ষিত মহিলা আসনে সংসদ সদস্য করা হলে তা হবে নারী প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধির একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ, হাওর উন্নয়নের ধারাবাহিকতা রক্ষার একটি বাস্তবসম্মত উদ্যোগ এবং নজির হোসেনের অসমাপ্ত স্বপ্ন পূরণের একটি দায়িত্বশীল অঙ্গীকার। অতএব, প্রশ্নটি কেবল একজন ব্যক্তিকে সংসদে পাঠানোর নয়; প্রশ্নটি হলো হাওরের স্বপ্নকে আমরা কতটা গুরুত্ব দিতে প্রস্তুত, এবং নারীর প্রতিনিধিত্বের ঘাটতি পূরণে আমরা কতটা আন্তরিক। সুনামগঞ্জের হাওর যদি সত্যিই জাতীয় উন্নয়নের মূলধারায় জায়গা পেতে চায়, তবে সালমা নজিরের মতো নেতৃত্বকে সামনে আনা সময়োপযোগী এবং যৌক্তিক সিদ্ধান্ত হতে পারে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফল আমাদের আবারও স্মরণ করিয়ে দিল বাংলাদেশের রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ এখনো কাক্সিক্ষত উচ্চতায় পৌঁছায়নি। সরাসরি নির্বাচনে মাত্র সাতজন নারী জয়ী হয়েছেন; সংরক্ষিত আসন মিলিয়ে মোট নারী প্রতিনিধিত্ব দাঁড়াবে ১৬ শতাংশে। অথচ প্রার্থী মনোনয়নের ক্ষেত্রে নারীদের সংখ্যা ছিল আরও কম; মনোনয়ন পেয়েছেন পুরুষের তুলনায় বহু গুণ কম নারী। এই বাস্তবতায় সুনামগঞ্জ-১ আসনের হাওরাঞ্চলের প্রেক্ষাপটে সালমা নজিরকে সংরক্ষিত মহিলা আসনে মনোনীত করার দাবি উঠেছে। এই দাবি কেবল আবেগের নয়, এটি প্রতিনিধিত্বের ন্যায্যতার প্রশ্ন, উন্নয়নের ধারাবাহিকতার প্রশ্ন এবং একটি অসমাপ্ত স্বপ্ন পূরণের প্রশ্ন। সুনামগঞ্জের হাওরভূমি বাংলাদেশের এক অনন্য ভূপ্রকৃতি। বর্ষায় যেখানে দিগন্তজোড়া জলরাশি, শুষ্ক মৌসুমে সেখানে বিস্তীর্ণ ফসলের মাঠ। এই অঞ্চল একই সঙ্গে সম্ভাবনার এবং ঝুঁকির। আগাম বন্যা, ফসলহানি, নৌ-যোগাযোগের সীমাবদ্ধতা, স্বাস্থ্যসেবার ঘাটতি, উচ্চশিক্ষার সুযোগের অভাব এই সবকিছু মিলিয়ে হাওরবাসীর জীবন সংগ্রামমুখর। এই সংগ্রামের ভেতর থেকেই উঠে এসেছিলেন নজির হোসেন; যিনি একাধিকবার সংসদ সদস্য হিসেবে সুনামগঞ্জের মানুষের প্রতিনিধিত্ব করেছেন এবং হাওর উন্নয়নের প্রশ্নকে জাতীয় পরিসরে তুলে ধরেছেন। আমাদের জানা আছে, নজির হোসেনের রাজনৈতিক জীবন ছিল বহুমাত্রিক। নব্বইয়ের গণআন্দোলন থেকে শুরু করে হাওরের পানিবন্দি মানুষের অধিকারের প্রশ্নে তাঁর সক্রিয়তা তাঁকে আলাদা পরিচিতি দিয়েছে। তিনি পঞ্চম সংসদে নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য এবং অষ্টম সংসদে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর রাজনৈতিক পথচলায় সুনামগঞ্জ-১ আসনের উন্নয়ন প্রশ্নে তাঁর অবস্থান ছিল সুস্পষ্ট। বাঁধে বাঁধে পথসভা, অকাল বন্যা প্রতিরোধের দাবি, নদী খনন, মৎস্যসম্পদ রক্ষা, কৃষিতে প্রণোদনা এই বিষয়গুলো তিনি ধারাবাহিকভাবে সামনে এনেছেন। আজ যখন আমরা নারী প্রতিনিধিত্বের সংকট নিয়ে কথা বলি, তখন সালমা নজিরের নাম সামনে আসে স্বাভাবিকভাবেই। তিনি কেবল একজন রাজনীতিকের সহধর্মিণী নন; তিনি নিজে শিক্ষিত, সৎ এবং মাঠপর্যায়ে সক্রিয়। সাম্প্রতিক সময়ে ‘গ্রাম থেকে হাটে’ কর্মসূচির মাধ্যমে তিনি যে গণসংযোগ শুরু করেছেন, তা প্রমাণ করে তিনি সংগঠক হিসেবেও সক্ষম। হাওরাঞ্চলের পাঁচটি প্রধান সমস্যা যথা শিক্ষা, যোগাযোগ, কৃষি, মৎস্য ও স্বাস্থ্য এগুলো নিয়ে যে বিশেষ বুকলেট প্রচার করা হয়েছে, সেখানে স্থানীয় বাস্তবতার ভিত্তিতে সমাধানের রূপরেখা তুলে ধরা হয়েছে। প্রত্যেক গ্রামে প্রাথমিক বিদ্যালয়, তিনটি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে একটি উচ্চবিদ্যালয়, প্রতি ইউনিয়নে কলেজ ও কারিগরি প্রতিষ্ঠান, হাওর বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন; এসব কেবল নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি নয়; এগুলো একটি অঞ্চলকে দীর্ঘমেয়াদে এগিয়ে নেওয়ার কৌশল। যোগাযোগ ব্যবস্থায় উড়াল সড়ক, সাবমারসিবল রাস্তা, বর্ষায় নিরাপদ নৌযান এবং শিক্ষার্থী-রোগীর জন্য সরকারি নৌপরিবহন চালুর প্রস্তাব হাওরবাসীর দৈনন্দিন দুর্ভোগের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। কৃষিতে বর্ষাকালীন ধানচাষে প্রণোদনা এবং বারোমাসি চাষের পরিকল্পনা খাদ্যনিরাপত্তা জোরদার করবে। মৎস্যখাতে নীতিমালা যুগোপযোগী সংশোধন এবং প্রজনন মৌসুমে আহরণ নিষিদ্ধকরণ পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় সহায়ক হবে। স্বাস্থ্যখাতে ইউনিয়নভিত্তিক ২০ শয্যার হাসপাতাল এবং কমিউনিটি স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের প্রতিশ্রুতি গ্রামীণ স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে পারে। এই প্রস্তাবগুলোর পেছনে রয়েছে নজির হোসেনের দীর্ঘ গবেষণাধর্মী চিন্তাভাবনার উত্তরাধিকার। তিনি হাওর উন্নয়নকে দেখেছিলেন সমন্বিত কাঠামোয় বন্যা নিয়ন্ত্রণ, কৃষি উৎপাদন, মৎস্যসম্পদ সংরক্ষণ, পরিবেশ রক্ষা, শিল্পায়ন ও পর্যটনের সম্ভাবনাকে একসঙ্গে বিবেচনা করে। তাঁর অসমাপ্ত স্বপ্নগুলো পূরণ করতে হলে এমন একজন প্রতিনিধি প্রয়োজন, যিনি একই সঙ্গে এই উত্তরাধিকারকে ধারণ করবেন এবং নতুন প্রজন্মের প্রত্যাশাকেও প্রতিফলিত করবেন। সালমা নজির সেই সেতুবন্ধ হতে পারেন। সংরক্ষিত মহিলা আসনের ধারণা নিয়ে নানা বিতর্ক আছে। কেউ বলেন, এটি নারীর ক্ষমতায়নের কার্যকর পথ; কেউ বলেন, এটি প্রতিযোগিতামূলক রাজনীতিতে নারীদের সরাসরি অংশগ্রহণ কমিয়ে দেয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো, যখন মনোনয়নের ক্ষেত্রেই নারীরা বঞ্চিত হন এবং সামাজিক-রাজনৈতিক কাঠামো নারীবিদ্বেষী প্রচারণায় প্রভাবিত হয়, তখন সংরক্ষিত আসন নারীদের জন্য একটি প্রয়োজনীয় প্ল্যাটফর্ম তৈরি করে। সুনামগঞ্জ-১ আসনের মতো ভৌগোলিকভাবে চ্যালেঞ্জপূর্ণ এলাকায় একজন নারীর প্রতিনিধিত্ব স্থানীয় নারীদের অংশগ্রহণ ও নেতৃত্বে অনুপ্রেরণা যোগাতে পারে। হাওরাঞ্চলে নারীরা কৃষিকাজ, মাছ প্রক্রিয়াজাতকরণ, গৃহভিত্তিক উৎপাদন ও পরিবার পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। কিন্তু নীতিনির্ধারণী স্তরে তাঁদের কণ্ঠস্বর খুব কমই শোনা যায়। সালমা নজির যদি সংরক্ষিত মহিলা আসনে সংসদ সদস্য হন, তবে তিনি এই নীরব শক্তিকে দৃশ্যমান করতে পারেন। স্থানীয় নারীদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন নিয়ে বিশেষ কর্মসূচি গ্রহণের সুযোগ তৈরি হবে। একই সঙ্গে তিনি হাওরের উন্নয়ন ইস্যুকে জাতীয় আলোচনায় ধারাবাহিকভাবে তুলতে পারবেন। রাজনীতিতে ধারাবাহিকতা গুরুত্বপূর্ণ। নজির হোসেনের রাজনৈতিক জীবন দেখিয়েছে, ব্যক্তিগত সুবিধার চেয়ে জনস্বার্থকে অগ্রাধিকার দিলে একটি অঞ্চল দীর্ঘমেয়াদে লাভবান হয়। তাঁর সময়কালে যে উন্নয়ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, সেগুলোর অনেকই পরবর্তী সময়ে থেমে গেছে বা গতি হারিয়েছে। উন্নয়ন প্রকল্পের ধারাবাহিকতা রক্ষা এবং নতুন পরিকল্পনা বাস্তবায়নে একজন অভিজ্ঞ ও স্থানীয়ভাবে গ্রহণযোগ্য প্রতিনিধি অপরিহার্য। সালমা নজির সেই ধারাবাহিকতার প্রতীক হতে পারেন। এখানে আবেগের একটি দিক অবশ্যই আছে; স্বামীর অসমাপ্ত স্বপ্ন পূরণের আকাক্সক্ষা। কিন্তু বিষয়টি কেবল পারিবারিক উত্তরাধিকারের নয়; এটি রাজনৈতিক ও সামাজিক দায়বদ্ধতার। যদি তিনি নিজ যোগ্যতায়, সাংগঠনিক দক্ষতায় এবং জনস¤পৃক্ততার মাধ্যমে নিজেকে প্রমাণ করতে পারেন, তবে সংরক্ষিত আসনে তাঁকে মনোনীত করা হবে হাওরবাসীর প্রতি একটি দায়িত্বশীল সিদ্ধান্ত। হাওর কেবল একটি ভৌগোলিক অঞ্চল নয়; এটি একটি জীবনধারা, একটি সংগ্রামের প্রতীক। এই সংগ্রামকে নীতিনির্ধারণের কেন্দ্রে নিয়ে যেতে হলে প্রয়োজন এমন কণ্ঠস্বর, যা একই সঙ্গে অভিজ্ঞ, প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক। সালমা নজিরকে সংরক্ষিত মহিলা আসনে সংসদ সদস্য করা হলে তা হবে নারী প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধির একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ, হাওর উন্নয়নের ধারাবাহিকতা রক্ষার একটি বাস্তবসম্মত উদ্যোগ এবং নজির হোসেনের অসমাপ্ত স্বপ্ন পূরণের একটি দায়িত্বশীল অঙ্গীকার। অতএব, প্রশ্নটি কেবল একজন ব্যক্তিকে সংসদে পাঠানোর নয়; প্রশ্নটি হলো হাওরের স্বপ্নকে আমরা কতটা গুরুত্ব দিতে প্রস্তুত, এবং নারীর প্রতিনিধিত্বের ঘাটতি পূরণে আমরা কতটা আন্তরিক। সুনামগঞ্জের হাওর যদি সত্যিই জাতীয় উন্নয়নের মূলধারায় জায়গা পেতে চায়, তবে সালমা নজিরের মতো নেতৃত্বকে সামনে আনা সময়োপযোগী এবং যৌক্তিক সিদ্ধান্ত হতে পারে।