মুহাম্মদ হাবীবুল্লাহ হেলালী ::
রাজনীতিতে দীর্ঘ ২০ বছর একটি যুগের সমান। এই দীর্ঘ সময়ে একটি জনপদের আশা-আকাক্সক্ষা, উন্নয়ন এবং ভৌগোলিক সমীকরণ আমূল বদলে যায়। ২০২৬ সালের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সুনামগঞ্জ-৫ (ছাতক-দোয়ারাবাজার) আসনে বিএনপির কেন্দ্রীয় সহ-সাংগঠনিক স¤পাদক কলিম উদ্দিন আহমেদ মিলনের বিশাল জয় কেবল একটি দলীয় বিজয় নয়, বরং এটি দুই দশকের পুঞ্জীভূত বঞ্চনার বিরুদ্ধে এক গণবিস্ফোরণ। ১ লাখ ৫১ হাজার ৯১৫ ভোট পেয়ে তিনি যেভাবে ধানের শীষের গৌরব পুনরুদ্ধার করেছেন, তা উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজনীতিতে এক নতুন মাইলফলক।
সুনামগঞ্জ-৫ আসনের ৫ লাখ ২৭ হাজারের বেশি ভোটারের এই বিশাল জনপদে কলিম উদ্দিন আহমদ মিলনের প্রায় ৫০ হাজার ভোটের ব্যবধানে জয়লাভ করাটি আকস্মিক কোনো ঘটনা নয়। ১৯৯৬ সালে স্বতন্ত্র এবং ২০০১ সালে বিএনপির হয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়া এই নেতা দীর্ঘ ২০ বছর ক্ষমতার বাইরে থেকেও মাঠ ছাড়েননি। জেল-জুলুম আর প্রতিকূলতার মধ্যেও জেলা বিএনপির আহ্বায়ক হিসেবে তৃণমূলকে ঐক্যবদ্ধ রাখার পুরস্কার তিনি পেয়েছেন ব্যালট পেপারে। তার এই বিজয় প্রমাণ করে যে, ছাতক-দোয়ারাবাজারের মানুষ অভিজ্ঞ ও পরীক্ষিত নেতৃত্বের ওপরই আস্থা রাখতে চায়।
এই নির্বাচনের অন্যতম প্রধান টার্নিং পয়েন্ট ছিল দীর্ঘ দুই দশক ধরে পরিত্যক্ত টেংরাটিলা (দোয়ারাবাজার) গ্যাসক্ষেত্র পুনরায় চালু করার দাবি। ২০০৫ সালে কানাডিয়ান কো¤পানি নাইকোর অবহেলার কারণে সৃষ্ট ভয়াবহ অগ্নিকা-ের পর থেকে এই গ্যাসক্ষেত্রটি স্থবির হয়ে আছে। আইনি জটিলতা আর আন্তর্জাতিক আদালতের দীর্ঘসূত্রতায় এই অঞ্চলের অমূল্য প্রাকৃতিক স¤পদ মাটির নিচেই পড়ে রয়েছে।
কলিম উদ্দিন আহমদ মিলনের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো এই টেংরাটিলা গ্যাসক্ষেত্রকে পুনরায় কার্যকর করা। স্থানীয়দের প্রত্যাশা, নতুন সরকারে তার শক্তিশালী অবস্থান এই অঞ্চলের জ্বালানি খাতে বিপ্লব ঘটাতে পারে। টেংরাটিলা গ্যাসক্ষেত্রটি পুরোদমে চালু হলে কেবল জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ বাড়বে না, বরং ছাতকের সিমেন্ট কারখানা ও অন্যান্য ভারী শিল্পে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি নিশ্চিত হবে। এটি হাজার হাজার বেকারের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করবে, যা ছাতক-দোয়ারাবাজারের ঝিমিয়ে পড়া অর্থনীতিকে চাঙ্গা করার প্রধান হাতিয়ার হতে পারে।
ছাতক বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান শিল্প ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। কিন্তু যথাযথ রাজনৈতিক তদারকির অভাবে সুরমাপাড়ের এই জনপদ তার জৌলুস হারিয়েছে। ছাতক সিমেন্ট ফ্যাক্টরির আধুনিকায়ন, কাগজ কলের পুনরুজ্জীবন এবং পাথর কোয়ারিগুলোর বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনার জন্য একজন ‘ভয়েস অ্যাট দ্য টপ’ বা নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নেতার অভাব দীর্ঘদিনের।
এই প্রেক্ষাপটেই কলিম উদ্দিন আহমদ মিলনকে পূর্ণ মন্ত্রী হিসেবে দেখার জোরালো দাবি উঠেছে। এলাকাবাসীর যুক্তি হলো, বিগত ২০ বছরে অবকাঠামোগত যে উন্নয়ন গ্যাপ তৈরি হয়েছে, তা সাধারণ একজন সংসদ সদস্যের পক্ষে পূরণ করা প্রায় অসম্ভব। তাকে মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত করা হলে ছাতক-দোয়ারাবাজারের উন্নয়ন বাজেটে যেমন বিশেষ বরাদ্দ নিশ্চিত হবে, তেমনি টেংরাটিলার মতো জাতীয় গুরুত্বস¤পন্ন প্রকল্পের ফাইলগুলো দ্রত গতি পাবে।
সীমান্তঘেঁষা দোয়ারাবাজারের নিরাপত্তা এবং চোরাচালান রোধে মিলনের জিরো টলারেন্স নীতি ভোটারদের আকৃষ্ট করেছে। ৫ লাখ মানুষের এই জনপদে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের যে নাজুক দশা, তা কাটাতে তিনি যে মহাপরিকল্পনা হাতে নিয়েছেন, তার বাস্তবায়নই এখন সাধারণ মানুষের মূল দেখার বিষয়। প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের বিশাল ভোট প্রাপ্তি এটিও স্মরণ করিয়ে দেয় যে, রাজনৈতিক বিভেদ ভুলে উন্নয়ন ও সুশাসনের প্রশ্নে তাকে দল-মতের ঊর্ধ্বে উঠতে হবে।
সুনামগঞ্জ-৫ আসনে কলিম উদ্দিন আহমদ মিলনের বিজয় কেবল একটি রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তন নয়, এটি একটি জনপদের অর্থনৈতিক মুক্তির সনদ। টেংরাটিলার আগুনের শিখা যেমন একসময় এই জনপদকে বিষাদগ্রস্ত করেছিল, মিলনের নেতৃত্বে সেই গ্যাস ক্ষেত্রই যেন আগামীর সমৃদ্ধির আলো হয়ে জ্বলে ওঠে - এটাই এখন সাধারণ মানুষের কামনা। ২০২৬ সালের এই রায় কেবল ধানের শীষের জয় নয়, এটি উন্নয়নের মূলধারায় ছাতক-দোয়ারাবাজারের ফিরে আসার অঙ্গীকার।