কেমন হলো নির্বাচন, কেমন হবে সরকার

আপলোড সময় : ১৪-০২-২০২৬ ০৯:৫২:৫৬ পূর্বাহ্ন , আপডেট সময় : ১৪-০২-২০২৬ ০৯:৫২:৫৬ পূর্বাহ্ন
সালেহ উদ্দিন আহমদ:: ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোট ছিল তুলনামূলকভাবে শান্তিপূর্ণ, নিরপেক্ষ এবং সুপরিচালিত। নির্বাচন কমিশন প্রতিটা বিষয়ে দক্ষতার পরিচয় দিয়েছে। এমনকি সরকার যখন সরকারি কর্মচারীদের গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে প্রচারে নামাতে যাচ্ছিল, নির্বাচন কমিশন তা শক্তভাবে প্রতিহত করেছে। নির্বাচন কেমন হলো? ভোটের ফল কী হবে তা নিয়ে বেশ অনিশ্চয়তা ছিল। বিভিন্ন জরিপ বলছিল বিএনপি বিপুল ভোটে জয়ী হবে। আবার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে জামায়াতে ইসলামীর পক্ষে এক তীব্র জনজোয়ারের আভাস তুলে ধরা হয়েছিল। অনেকের বদ্ধমূল ধারণা ছিল, জামায়াতের জোয়ারে পুরো দেশ ভেসে যাবে। জামায়াতের জোটসঙ্গী এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম ভোটের পরপরই বললেন, ‘আমরা সরকার গঠন করতে যাচ্ছি।’ তবে এইটুকু বলা যায়, জনগণ কাউকে নিরাশ করেনি। বিএনপি বিরাট সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে। বিএনপির জন্য এটা নতুন কিছু নয়; খালেদা জিয়াও আগে দুই-তৃতীয়াংশ আসন পেয়ে সরকার গঠন করেছিলেন। জামায়াত-সুনামি না হলেও, জামায়াতের জন্য এটা বিরাট বিষয়। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে তারা ৩০ শতাংশের মতো ভোট পেয়েছে। ১৯৯১ সালে তারা পেয়েছিল ১৮টি আসন (১২.১৩ শতাংশ ভোট), ১৯৯৬ সালে ৩টি (৮.৬১ শতাংশ), ২০০১ সালে ১৭টি (৪.২৮ শতাংশ), ২০০৮ সালে মাত্র ২টি (৪.৬ শতাংশ)। নিবন্ধন না থাকার ফলে ২০১৮ সালে বিএনপির সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করে জামায়াতের প্রার্থীরা কোন আসনে জয়লাভ করতে পারেনি। জামায়াতের ইতিহাসভিত্তিক গড় ভোটের হার প্রায় ৭.৪ শতাংশ। প্রায় পাঁচ গুণ বেশি ভোট পাওয়া কম কথা নয়। পাকিস্তানের কোনো নির্বাচনেও জামায়াত পাঁচ শতাংশের বেশি ভোট কখনো পায়নি। আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে দেশে বিরাট রাজনৈতিক শূন্যতা বিরাজ করছে। অনেকে মনে করেন আওয়ামী লীগের ভোট দুই ভাগে ভাগ হয়েছে, যা জামায়াতের ভোট বাড়ার একটা বড় কারণ। আওয়ামী লীগের অনেকের মধ্যেই ঐতিহাসিকভাবে বিএনপির প্রতি একটা অনীহা আছে। তাছাড়া স্থানীয় পর্যায়ে আওয়ামী লীগের যেসব ইজারা এবং কর্তৃত্ব ছিল, সেগুলো এখন বিএনপির দখলে। সেটাও একটা অনেক আওয়ামী লীগারের জামায়াতকে ভোট দেওয়ার একটা কারণ হতে পারে। অনেকে ভেবেছিলেন আওয়ামী লীগের ভোটাররা কিছু আসনে জাতীয় পার্টিকে জিতিয়ে দেবেন, সেটাও ঘটেনি। আওয়ামী লীগের ভোট পেলে জিএম কাদের ও ব্যারিস্টার শামীম পাটোয়ারী এত বিপুল ভোটে হারতেন না। আবার জামায়াত ধর্মীয় স¤পৃক্ততা নিয়ে অনেকের মন জয় করেছে। মোটকথা, এই নির্বাচনটা ছিল জামায়াতের জন্য সবচেয়ে অনুকূল পরিবেশে অনুষ্ঠিত নির্বাচন। কিছু ব্যতিক্রমী জয়-পরাজয় : ভোটের এত খবরের মধ্যে কিছু কিছু ব্যতিক্রমী জয়-পরাজয় এবং ঘটনা অনেকের চোখ এড়িয়ে গেছে। রুমিন ফারহানা বিএনপির জোট-কৌশলে ছিটকে পড়েন মনোনয়ন থেকে। পরে স্বতন্ত্র নির্বাচনে নেমে তিনি বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত হয়েছেন। রুমিন ‘হাঁস’ প্রতীক নিয়ে জয়লাভ করেছেন। অবশ্য ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ এলাকার বিপুলসংখ্যক বিএনপি নেতা-কর্মী প্রথম থেকেই তার সঙ্গে ছিলেন। ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানার বাবা অলি আহাদ ছিলেন ভাষা আন্দোলনের অগ্রগামী সৈনিক। রুমিন বিএনপির সংকটময় সময়ে অনেকভাবে বিএনপিকে প্রতিনিধিত্ব করেছেন। তিনি যদি সসম্মানে আবার বিএনপিতে ফিরে আসেন, তাতে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই। মাহমুদুর রহমান মান্না গত পনেরো বছর ধরে বিএনপির জোটে ছিলেন। নির্বাচনের সপ্তাহ দুয়েক আগে তিনি বিএনপির জোট ত্যাগ করেন। তিনি যখন অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ছিলেন, তার কাছে বিএনপি প্রস্তাব করে- অসুস্থ শরীরে নির্বাচনের ধকল নেওয়া তার ঠিক হবে না। তিনি যদি নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ান, তাহলে তাকে পরে মন্ত্রিসভায় স্থান দেওয়া হবে। একজন রাজনীতিবিদের জন্য এটা ছিল দারুণ অপমানকর। মান্না বলেছেন, ‘আগে রাজনীতি, পরে মন্ত্রিত্ব।’ এককালের তুখোড় ছাত্রনেতা বগুড়া-২ (শিবগঞ্জ) আসনে নির্বাচন করে শেষ পর্যন্ত বিএনপি প্রার্থীর কাছে জামানত হারিয়েছেন। তিনি ‘কেটলি’ প্রতীকে ভোট পেয়েছেন ৩ হাজার ৪২৬ ভোট। পঞ্চগড়-১ আসনে নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার পর পরাজিত প্রার্থী ও এনসিপি নেতা সারজিস আলমকে নিয়ে সবার চিন্তা ছিল; না জানি তিনি কী অভিযোগ তুলে কী কা- ঘটান। কিন্তু না, তিনি নিজেই বিজয়ী প্রার্থী মুহাম্মদ নওশাদ জমিরকে অভিনন্দন জানালেন। সুন্দর নির্বাচন উপহার দেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট সবাইকে ধন্যবাদ জানান। তার গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ভবিষ্যতে অনেকেই মনে রাখবে। কিন্তু এনসিপির আরেক নেতা নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী হারটা সহজে মেনে নিতে পারেননি। মির্জা আব্বাসের কাছে পাঁচ হাজারের একটু বেশি ভোটে হেরে নানান অভিযোগ করে তার দলের লোকদের ডাক দিলেন প্রতিবাদ জানাতে। বিএনপি ও জামায়াতের বড় নেতারা সবাই এই নির্বাচনে জয়লাভ করেছেন, একমাত্র ব্যতিক্রম জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষ নেতা গোলাম পরওয়ার। খুলনা-৫ আসনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী দলের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার পরাজিত হয়েছেন। মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষে সুদৃঢ় অবস্থান নেওয়ার জন্য বীর মুক্তিযোদ্ধা ফজলুর রহমানকে কম হেনস্তা সইতে হয়নি। একসময় তার বাড়ি ঘেরাও করে তার বিরুদ্ধে ‘মব’ করা হয়। এনসিপির যেসব নেতা মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে কথা বলেছেন, তাদের সমালোচনা করে তিনি বিএনপি থেকে তার সদস্যপদও হারাতে বসেছিলেন। মনোনয়ন প্রক্রিয়ায় তিনি আবার বিএনপিতে ফিরে আসেন। নির্বাচনে কিশোরগঞ্জ-৪ আসনে ফজলুর রহমান প্রায় ৭২ হাজার ভোটের ব্যবধানে জামায়াতের প্রার্থী রোকন রেজা শেখকে পরাজিত করেছেন। অনেকে বলবেন, জামায়াত প্রার্থীকে হারানো একজন মুক্তিযোদ্ধার পক্ষে একটা উপযুক্ত বিজয়। বিএনপি সরকার কেমন হবে? : খালেদা জিয়া যখন ক্ষমতায় ছিলেন, তারেক রহমানের সঙ্গে বিএনপির প্রবীণ সদস্যদের বিরোধের কথা অজানা কিছু নয়। তখন বলা হয়েছিল, তারেক রহমান চাচ্ছিলেন পুরনোদের বিদায় দিয়ে নবীন নেতৃবৃন্দকে ক্ষমতায় আনতে। খালেদা জিয়ার অসম্মতির কারণে সেইবার প্রবীণেরা টিকে যান। এইবার তারেক রহমান দেশে আসার পর তার অনেক পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেছে। তার একটি হলো, তিনি দলের নেতৃত্বে প্রবীণদের ওপর পুরো আস্থা রেখেছেন এবং তাদের সবাইকে মনোনয়ন দিয়েছেন। মন্ত্রিসভা গঠন করার পর বোঝা যাবে দলে প্রবীণদের প্রভাব কতটুকু বজায় থাকে। বিএনপি আগেও অনেকবার ক্ষমতায় ছিল। তারা কোনো বৈপ্লবিক দল নয়, আবার জামায়াতের মতো এমন কোনো অটল কর্মসূচিও তাদের নেই। তারা মধ্যপন্থী দল হিসেবে নমনীয় কর্মসূচি নিয়ে দেশ পরিচালনা করবে। তবে নির্বাচনি সভাগুলোতে তারেক রহমান বারবার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি তিনি শক্ত হাতে সামাল দেবেন। তাকে ‘লেজার-দক্ষতা’ নিয়ে আইনশৃঙ্খলা সহনীয় পর্যায়ে ফিরিয়ে আনার জন্য কাজ করতে হবে। অনেকে আশা করবেন ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক ভালো হবে। তবে সম্ভবত যতক্ষণ শাহবাগে ‘ভারতের আধিপত্যের’ বিরোধিতা থাকবে, তারেকের পক্ষে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার কোনো পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হবে না। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে তারেক রহমান কী উদ্যোগ নেন, তার ওপর সবার নজর থাকবে। এখন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যেসব জামায়াতের ক্যাডার নেতৃত্বে আছেন, তাদেরকে সরিয়ে তিনি নিরপেক্ষ শিক্ষাবিদদের সেখানে নিয়োগ দেন, নাকি ‘সাদা দলের’ শিক্ষকদের ঢুকিয়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে কব্জায় রাখতে চেষ্টা করেন - সেটাই হবে তার প্রথম পরীক্ষা। সংস্কারের কী হবে? : গণভোটে সম্ভবত ‘হ্যাঁ’ জয়ী হয়েছে। ‘হ্যাঁ’ জয়ী হওয়ায় সংসদ গণপরিষদের কাজ করবে। একটা ভয় আছে, সরকারি ও বিরোধী দল সনদ নিয়ে আবার বাকবিত-ায় লেগে যায় কিনা। রাজনীতিবিদরা উচ্চ পরিষদ গঠন করার জন্য উঠেপড়ে লাগবেন, যদিও তার প্রয়োজনীয়তা কেউ ভালোভাবে কখনো ব্যাখ্যা করতে পারেনি। বিএনপি চাইবে নিচের পরিষদের আনুপাতিক হারে, জামায়াত চাইবে ‘পিআর’ বা ভোটের অনুপাতে উচ্চ পরিষদ গড়তে। সনদ নিয়ে যত কম বাকবিত-া হবে এবং যত তাড়াতাড়ি গণপরিষদ তার কাজ শেষ করে, ততই শাসনকার্য পরিচালনার জন্য বিএনপি বেশি সময় পাবে। এই নির্বাচনই যেন শেষ ভালো নির্বাচন না হয়। দেশে একটা নিয়মতান্ত্রিক ও গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা চালাতে আমাদেরকে প্রতি পাঁচ বছর পরপর এই ধরণের নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের আয়োজন করতে হবে। আশা করব সামনের নির্বাচন হবে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং আরও সুচারু। এই নির্বাচনে যেসব ভুলত্রুটি ধরা পড়েছে, সেগুলোকে শুধরানো হবে।

সম্পাদকীয় :

  • সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি : মো. জিয়াউল হক
  • সম্পাদক ও প্রকাশক : বিজন সেন রায়
  • বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : মোক্তারপাড়া রোড, সুনামগঞ্জ-৩০০০।

অফিস :

  • ই-মেইল : [email protected]
  • ওয়েবসাইট : www.sunamkantha.com