বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাস সংগ্রাম, ত্যাগ এবং গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আকাক্সক্ষায় উজ্জ্বল। মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় যে রাষ্ট্রের জন্ম, সেই রাষ্ট্রের মূল ভিত্তিই ছিল জনগণের অধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং আইনের শাসন। কিন্তু সময়ের নানা ঘাত-প্রতিঘাতে গণতান্ত্রিক চর্চা বারবার বাধাগ্রস্ত হয়েছে। তাই আজ সবচেয়ে জরুরি প্রত্যাশা- দেশ গণতান্ত্রিক ধারায় দৃঢ়ভাবে ফিরুক।
গণতন্ত্র কেবল একটি নির্বাচনকেন্দ্রিক প্রক্রিয়া নয়; এটি একটি অবিচ্ছিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংস্কৃতি। সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন গণতন্ত্রের প্রধান শর্ত হলেও এর সঙ্গে সমান গুরুত্বপূর্ণ হলো স্বাধীন বিচারব্যবস্থা, কার্যকর সংসদ, জবাবদিহিমূলক সরকার এবং স্বাধীন গণমাধ্যম। বিরোধী মতকে দমনের পরিবর্তে সহনশীলতা ও সংলাপের মাধ্যমে রাজনৈতিক সমস্যার সমাধানই গণতান্ত্রিক মানসিকতার পরিচায়ক।
গণতান্ত্রিক পরিবেশ সংকুচিত হলে কেবল রাজনৈতিক দল নয়, সাধারণ নাগরিকও ক্ষতিগ্রস্ত হন। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সীমিত হলে সৃজনশীলতা বাধাগ্রস্ত হয়, নাগরিক আস্থা কমে যায় এবং রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের বিশ্বাস দুর্বল হয়ে পড়ে। একটি সুস্থ গণতন্ত্রে সরকার যেমন দায়িত্বশীল, তেমনি বিরোধী দলও গঠনমূলক ভূমিকা পালন করে - এটাই হওয়া উচিত রাজনৈতিক সংস্কৃতির ভিত্তি।
দেশকে গণতান্ত্রিক ধারায় ফিরিয়ে আনতে হলে প্রথমেই প্রয়োজন আন্তরিক রাজনৈতিক সদিচ্ছা। নির্বাচন ব্যবস্থা শক্তিশালী ও বিশ্বাসযোগ্য করতে হবে, নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা ও সক্ষমতা নিশ্চিত করতে হবে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করতে হবে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত সংলাপের দ্বার উন্মুক্ত রাখা এবং সহিংসতার পথ পরিহার করা।
গণতন্ত্রের বিকাশে নাগরিক সমাজ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং গণমাধ্যমের ভূমিকাও অপরিসীম। সচেতন নাগরিকই পারে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে সমুন্নত রাখতে। তরুণ প্রজন্মের মধ্যে গণতন্ত্রচর্চা, মানবাধিকার ও সহনশীলতার শিক্ষা জোরদার করা জরুরি। কারণ গণতন্ত্র কেবল শাসকদের দায় নয়; এটি প্রতিটি নাগরিকের দায়িত্ব ও অধিকার।
বাংলাদেশ উন্নয়ন-অগ্রগতির পথে এগিয়ে যাচ্ছে- অর্থনীতি, অবকাঠামো, শিক্ষা ও প্রযুক্তিতে উল্লেখযোগ্য সাফল্য এসেছে। কিন্তু টেকসই উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন শক্তিশালী গণতান্ত্রিক ভিত্তি। উন্নয়ন ও গণতন্ত্র একে অপরের পরিপূরক; একটিকে বাদ দিয়ে অন্যটি স্থায়ী হতে পারে না।
আজ সময় এসেছে সব পক্ষের আত্মসমালোচনা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের। বিভাজনের রাজনীতি নয়, ঐক্য ও আস্থার রাজনীতি হোক ভবিষ্যতের পথনির্দেশ। জনগণের ভোটাধিকার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করে, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করে এবং জবাবদিহিমূলক প্রশাসন গড়ে তুলেই দেশকে প্রকৃত অর্থে গণতান্ত্রিক ধারায় ফিরিয়ে আনা সম্ভব।
আমরা মনে করি, গণতন্ত্রের বিকল্প গণতন্ত্রই। তাই দেশের সার্বিক কল্যাণে, স্থিতিশীলতা ও অগ্রগতির স্বার্থে - বাংলাদেশ আবারও পূর্ণাঙ্গ ও কার্যকর গণতান্ত্রিক ধারায় ফিরে আসুক, এটাই আজকের প্রত্যাশা।