নাইকো’র কাছ থেকে প্রাপ্ত ক্ষতিপূরণের অর্থ সুনামগঞ্জের উন্নয়নে ব্যয় করতে হবে

আপলোড সময় : ০৩-০২-২০২৬ ০৭:১৫:০৬ পূর্বাহ্ন , আপডেট সময় : ০৩-০২-২০২৬ ০৭:১৫:০৬ পূর্বাহ্ন
টেংরাটিলা গ্যাসক্ষেত্র বিপর্যয় বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের ইতিহাসে এক গভীর ক্ষত। ২০০৫ সালে ছাতকের টেংরাটিলায় সংঘটিত ভয়াবহ বিস্ফোরণ ও অগ্নিকা- শুধু রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপূরণীয় ক্ষতিই করেনি, ধ্বংস করেছে হাজারো মানুষের জীবিকা, পরিবেশ ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা। দীর্ঘ প্রায় দুই দশকের আইনি লড়াই শেষে আন্তর্জাতিক সালিশি আদালত আইসিএসআইডির রায়ে কানাডিয়ান কো¤পানি নাইকো রিসোর্সেসের কাছ থেকে প্রায় ৪২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ক্ষতিপূরণ আদায়ের সিদ্ধান্ত নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক ও আইনি অর্জন। তবে এই অর্জনের প্রকৃত মূল্য তখনই প্রতিষ্ঠিত হবে, যখন ক্ষতিপূরণের অর্থ যথাযথভাবে ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চল - বিশেষ করে সুনামগঞ্জ জেলার উন্নয়নে ব্যয় করা হবে। কারণ, নাইকোর অপরিণামদর্শী কর্মকা-ের সরাসরি ও দীর্ঘস্থায়ী ভুক্তভোগী ছিল সুনামগঞ্জের মানুষ, তাদের কৃষিজমি, জলাশয়, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য। উল্লেখ্য, সরকার ও বাপেক্স টেংরাটিলা গ্যাসক্ষেত্র ধ্বংস এবং পরিবেশগত ক্ষতির জন্য যে বিপুল অঙ্কের (১০১ কোটি ৪০ লাখ ডলার) ক্ষতিপূরণ দাবি করেছিল, তার তুলনায় আদালতের রায় অনেক কম। তবু এটিকে অবহেলা করার সুযোগ নেই। বরং এই অর্থকে একটি কৌশলগত উন্নয়ন তহবিল হিসেবে বিবেচনা করা জরুরি। সুনামগঞ্জ জেলা আজও দেশের উন্নয়ন সূচকে পিছিয়ে থাকা একটি অঞ্চল। প্রতিবছর হাওরের আগাম বন্যা, নদীভাঙন, অবকাঠামোগত দুর্বলতা ও কর্মসংস্থানের অভাব জেলার মানুষের জীবনকে অনিশ্চয়তার মধ্যে ঠেলে দেয়। টেংরাটিলা ট্র্যাজেডির ক্ষত এখনো পুরোপুরি শুকায়নি। গ্যাসক্ষেত্রসংলগ্ন এলাকার পরিবেশ পুনরুদ্ধার, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পুনর্বাসন এবং দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলায় কার্যকর উদ্যোগ এখনো অপর্যাপ্ত। এই বাস্তবতায় নাইকোর কাছ থেকে প্রাপ্ত ক্ষতিপূরণের অর্থ সুনামগঞ্জের উন্নয়নে ব্যয় করার দাবি কেবল আবেগ নয়, এটি ন্যায্যতা ও সুবিচারের প্রশ্ন। টেংরাটিলা ও আশপাশের এলাকার পুনর্বাসন, উন্নত স্বাস্থ্যসেবা, মানসম্মত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, নিরাপদ সড়ক ও টেকসই অবকাঠামো নির্মাণে এই অর্থ ব্যয় করা যেতে পারে। পাশাপাশি হাওর ব্যবস্থাপনা, নদী-খাল পুনঃখনন, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং স্থানীয় শিল্প ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে বিনিয়োগ করা হলে পুরো উত্তর-পূর্বাঞ্চলের অর্থনৈতিক চিত্র বদলে যেতে পারে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সচেতন নাগরিকদের সোচ্চার অবস্থান এই দাবিকে আরও শক্তিশালী করেছে। উন্নয়নকর্মী, শিক্ষক, গবেষক ও স্থানীয় জনগণের কণ্ঠে একই কথা - টেংরাটিলার ক্ষতিপূরণ সুনামগঞ্জের উন্নয়নে ব্যয় করতে হবে। এটি কোনো দয়া নয়, বরং সুনামগঞ্জবাসীর প্রাপ্য। আমরা মনে করি, সরকার যদি এই ক্ষতিপূরণের অর্থকে জাতীয় কোষাগারের সাধারণ আয়ের অংশ হিসেবে না দেখে, বরং একটি স্বতন্ত্র ও স্বচ্ছ উন্নয়ন তহবিল হিসেবে সুনামগঞ্জের জন্য বরাদ্দ করে, তবে তা হবে রাষ্ট্রীয় ন্যায়বিচারের একটি দৃষ্টান্ত। পরিকল্পিত ও অংশগ্রহণমূলক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এই অর্থ ব্যয় করা গেলে টেংরাটিলার বেদনাদায়ক ইতিহাস একদিন উন্নয়নের গল্পে রূপ নিতে পারে। নাইকো ক্ষতিপূরণ কেবল অতীতের ক্ষতির প্রতিদান নয় - এটি সুনামগঞ্জের ভবিষ্যৎ নির্মাণের এক সুবর্ণ সুযোগ। এই সুযোগ যেন অবহেলায় হারিয়ে না যায়, সেটিই আজ সময়ের দাবি।

সম্পাদকীয় :

  • সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি : মো. জিয়াউল হক
  • সম্পাদক ও প্রকাশক : বিজন সেন রায়
  • বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : মোক্তারপাড়া রোড, সুনামগঞ্জ-৩০০০।

অফিস :

  • ই-মেইল : [email protected]
  • ওয়েবসাইট : www.sunamkantha.com